চাঁপাইনবাবগঞ্জের তিন আসন
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জজুড়ে বইছে ভোটের হাওয়া। শহর থেকে গ্রাম সব জায়গায় এখন নির্বাচন নিয়ে জোর আলোচনা হচ্ছে। কোন দলের জনসমর্থন কেমন এবং কে জিতবেন এ নিয়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। জেলার পাঁচটি উপজেলা নিয়ে গঠিত তিনটি সংসদীয় আসনেই প্রার্থী ঘোষণা করেছে বিএনপি এবং জামায়াত। দল দুটির নেতাকর্মীরা বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে ভোটের উৎসবে মেতেছেন। তবে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) কয়েকটি দল প্রার্থী দিলেও তারা এলাকায় তেমন সাড়া জাগাতে পারেননি।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের আসনগুলো অনেক আগে থেকেই বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। তবে দুটি আসনে জামায়াতের দুই নেতা দুবার এমপি হয়েছিলেন। এছাড়া আওয়ামী দুঃশাসনের সময় ছাড়া বরাবরই জাতীয়তাবাদী নেতাকর্মীদের আধিপত্য বজায় ছিল। এবারও জয়ের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে সাবেক সংসদ সদস্যদের ধানের শীষের টিকিট দেওয়া হয়েছে। তবে তাদের কেউই চ্যালেঞ্জের বাইরে নন। দাঁড়িপাল্লার নমিনিদের কাছে তাদের কঠিন পরীক্ষায় অবতীর্ণ হতে হবে। এমনকি একটি আসনে ধানের শীষের প্রার্থীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছেন বিএনপির এক নেতা।
বিএনপির শক্ত প্রতিপক্ষ হলেও রাজনীতিতে জামায়াতের অতীত খুব একটা সুখকর নয়। কিন্তু জুলাই বিপ্লবের পর পাল্টে গেছে সব হিসাব-নিকাশ। এমনকি জামায়াত নেতৃত্বাধীন ইসলামপন্থি জোটের সমন্বিত লড়াইয়ের ফলে নির্বাচনের মাঠে বড় ঝাঁকুনি লেগেছে বলে ভোটাররা মনে করছেন। স্বাধীনতার ৫৪ বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে আছে দলটি। সুশৃঙ্খল সাংগঠনিক শক্তি নিয়ে বেশ স্বাচ্ছন্দ্যে নির্বাচনি প্রস্তুতি সেরে ফেলেছে জামায়াত। ফলাফল যাই হোক, ভোটের অঙ্কে নতুন রেকর্ড গড়তে চান দাঁড়িপাল্লার কান্ডারিরা।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ-১ (শিবগঞ্জ)
এ আসনে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন দলের চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও সাবেক এমপি অধ্যাপক শাহজাহান মিয়া। এলাকায় তার আলাদা ইমেজ আছে। রাজনৈতিক বিচক্ষণতা আর সাংগঠনিক দক্ষতার কারণে ১৯৯১ সাল থেকেই শিবগঞ্জের রাজনীতি তার নিয়ন্ত্রণে। জুলাই বিপ্লবের পর তৃণমূল পর্যায়ে তার তৎপরতা সাধারণ মানুষের মাঝে সাড়া ফেলতে সহায়তা করেছে।
তিনি বলেন, আসনটি বিএনপির ঐতিহ্যবাহী ঘাঁটি। গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠায় মানুষ ধানের শীষে ভোট দেবে। জনগণের ভোটে বিএনপির জয় হবে ইনশাল্লাহ।
জামায়াত এ আসনে প্রার্থী করেছে শিবগঞ্জ উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও রাজশাহী মহানগর জামায়াতের আমির ড. কেরামত আলীকে। দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে এলাকায় দিনরাত প্রচারকাজ চালাচ্ছেন তিনি। জামায়াতের এ প্রার্থী বলেন, মানুষ পরিবর্তন চায়। দাঁড়িপাল্লায় ভোট দিয়ে তারা দুঃশাসনমুক্ত দেশ গড়তে চায়।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ (নাচোল, গোমস্তাপুর ও ভোলাহাট)
তিনটি উপজেলা নিয়ে গঠিত চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ আসন বিএনপির ‘রিজার্ভ আসন’ হিসেবে পরিচিত। জুলাই বিপ্লবের পর এখানে সবচেয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে আছে দলটি। এখানে ধানের শীষের প্রার্থী হয়েছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির শিল্প ও বাণিজ্যবিষয়ক সহসম্পাদক এবং সাবেক সংসদ সদস্য আমিনুল ইসলাম। তবে তার সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ নিজ দলের বিদ্রোহী প্রার্থী। এখানে মনোনয়ন ফরম তুলেছেন ধানের শীষের মনোনয়নবঞ্চিত জেলা বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক আবদুস সালাম তুহিন, জেলা মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক মাসউদা আফরোজ হক শুচি ও বুয়েটের আহসানুল্লাহ হল সংসদের সাবেক ভিপি ইমদাদুল হক মাসুদ। তাদের মধ্যে শুচি মনোনয়ন ফরম নির্বাচন কমিশনে জমা দেবেন বলে নিশ্চিত করেছেন।
বিএনপির প্রার্থী আমিনুল ইসলাম বলেন, ২০১৮ সালের ‘চ্যালেঞ্জিং নির্বাচনেও’ মানুষ ধানের শীষ প্রতীকে ভোট দিয়েছিলেন। নির্বাচিত হওয়ার পর কঠিন সময়েও এলাকার উন্নয়নে ভূমিকা রেখেছি। আগামী দিনে মানুষ বিএনপিকে ভোট দেবে দেশে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য। জনগণের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য বিএনপির নেতৃত্বের বিকল্প নেই।
জামায়াতের প্রার্থী দলটির জেলা শাখার নায়েবে আমির ড. মিজানুর রহমান। তিনি বিএনপির প্রার্থীকে চ্যালেঞ্জ জানাতে দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে ঐক্যবদ্ধ প্রচার চালাচ্ছেন। বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে চষে বেড়াচ্ছেন ভোটের মাঠ।
ড. মিজানুর রহমান বলেন, দুর্নীতিমুক্ত সমাজ ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় জামায়াতের বিকল্প নেই। তাই জনগণ আসন্ন নির্বাচনে দাঁড়িপাল্লা মার্কায়ই ভোট দেবেন।
এছাড়া এনসিপির নেতা নাজমুল হুদা খান রুবেলও মাঠে প্রচার চালাচ্ছেন।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ (সদর)
আসনটিতে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন দলটির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও সাবেক সংসদ সদস্য হারুনুর রশীদ। তিনি এ আসনে চারবার এমপি ছিলেন। তিনি বলেন, আমি ষষ্ঠবারের মতো এ আসনে নির্বাচন করছি। বিপুল ভোটের ব্যবধানে ধানের শীষ জয়লাভ করবে ইনশাল্লাহ।
এ আসনে জাময়াতের মনোনয়ন পেয়েছেন দলটির কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আমির নূরুল ইসলাম বুলবুল। বিএনপিকে চ্যালেঞ্জ জানানোর মতো শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী তিনি। এক বছর ধরে তিনি যুবসমাজ ও অসহায় নারীদের উন্নয়নে কাজ করছেন। এলাকায় তার আলাদা ইমেজ রয়েছে।
বুলবুল বলেন, এ এলাকা আজও বঞ্চিত, অনুন্নত ও অবহেলিত। শান্তি, নিরাপত্তা ও ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার নিয়ে আমরা মাঠে আছি। জামায়াতের হাতেই আগামীর বাংলাদেশ নিরাপদ। দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য জামায়াত সবসময় কাজ করেছে, আগামী দিনেও তা অব্যাহত থাকবে।