হোম > সারা দেশ > রাজশাহী

রাজশাহীতে গাছে গাছে আমের গুটি, ভালো ফলনের আশা

মঈন উদ্দিন, রাজশাহী

আমের রাজধানীখ্যাত রাজশাহী অঞ্চলের গাছে গাছে এখন শোভা পাচ্ছে মটরশুঁটির মতো ছোট ছোট আমের গুটি। চারিদিকে ছড়িয়ে পড়া মিষ্টি ঘ্রাণ জানান দিচ্ছে আসন্ন আম মৌসুমের বার্তা। বড় ধরনের কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হলে চলতি মৌসুমে রাজশাহী অঞ্চলে আমের বাম্পার ফলনের আশা করছেন কৃষক, ব্যবসায়ী ও কৃষি বিভাগের সংশ্লিষ্টরা।

গত কয়েক সপ্তাহ ধরে আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় আম চাষিরা বেশ আশাবাদী। ফেব্রুয়ারির শেষদিকে ও মার্চের প্রথম সপ্তাহে জেলার বিভিন্ন বাগানে মুকুল আসা শুরু হয়। বর্তমানে আগাম মুকুলে গুটি আসতে শুরু করায় ব্যস্ত সময় পার করছেন চাষিরা। গাছের পরিচর্যা, পোকা-মাকড় দমন ও সেচের মাধ্যমে গুটি যাতে ঝরে না পড়ে সে জন্য নানা পদক্ষেপ নিচ্ছেন তারা।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ ও নাটোর—এই চার জেলায় মোট ৯৩ হাজার ২৬৬ হেক্টর জমিতে আম চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে প্রায় ১২ দশমিক ৫ লাখ মেট্রিক টন। এই অঞ্চলে গাছের সংখ্যা মোট ৩ কোটি ৪৯ লাখ ৬১ হাজার।

রাজশাহী অঞ্চলের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক ড. আজিজুর রহমান জানান, এই অঞ্চলে ৫০ শতাংশেরও বেশি আমের মুকুল শুঁটিতে পরিণত হয়েছে। এর মধ্যে রাজশাহীতে ৭০ শতাংশ মুকুল বর্তমানে মটরশুঁটির আকারের, যেখানে ৩৫ শতাংশ মার্বেল পর্যায়ে বৃদ্ধি পেয়েছে।

তিনি আরো জানান, গত বছর কম উৎপাদনের পর এবার ভালো ফলনের ইঙ্গিত দিচ্ছে প্রকৃতি। কারণ আমের উৎপাদন স্বাভাবিকভাবেই উচ্চ এবং নিম্ন ফলনশীল বছরগুলোর মধ্যে পর্যায়ক্রমে ঘটে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার আমচাষি আব্দুল হান্নান জানান, এ বছর এখন পর্যন্ত আবহাওয়া অনুকূলে রয়েছে। গাছে গাছে প্রচুর মুকুল ও গুটি এসেছে। আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে বেশিরভাগ গাছেই আমের গুটি চলে আসবে বলে আশা করছেন তিনি। তবে বেশি ফলন নিয়ে শঙ্কাও প্রকাশ করেন এই চাষি। তিনি বলেন, এ বছর বেশি ফলন হলেও ক্ষতির আশঙ্কা থেকেই যায়। কারণ আমের দাম কম হওয়ার শঙ্কা থাকে। পাশাপাশি বাইরে আম রপ্তানি না হলে অথবা প্রক্রিয়াজাতকরণ না হলে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন চাষিরা।

উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এ অঞ্চলের নওগাঁ জেলায় আম চাষের জমি দ্রুত বাড়ছে। গত ১০ বছরে নওগাঁয় আম বাগানের জমি দেড়গুণ বেড়েছে, যা চাঁপাইনবাবগঞ্জকেও ছাড়িয়ে গেছে। চাষ পদ্ধতিতেও এসেছে পরিবর্তন। শত বছরের জন্য আম বাগান তৈরির পরিবর্তে কৃষকরা এখন মাত্র ১০ বছরের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে বাগান করছেন। এছাড়া আম্রপালি এবং বারি আম-৩ ও ৪ জাতের আমের চাষ প্রতি বছরই বাড়ছে জেলাগুলোতে।

রাজশাহী জেলার বাঘা ও চারঘাট উপজেলায় সবচেয়ে বেশি আম চাষ হয়। এসব এলাকার বাগানে এখন মুকুলে ঢেকে আছে গাছের পাতা। প্রতিটি গাছে ব্যাপক মুকুল এসেছে এবং আগাম মুকুলগুলোতে গুটি বড় হতে শুরু করেছে।

২০ বিঘা জমিতে ফজলি, লক্ষণভোগ ও হিমসাগরসহ কয়েক জাতের আম চাষ করা দক্ষিণ মিলিক বাঘা গ্রামের চাষি সিদ্দিকুর রহমান বলেন, এ বছর মুকুলের পরিমাণ অনেক বেশি। আম্রপালি ও গুটি জাতের আমের মুকুল বেশি এসেছে। ৪০ শতাংশ মুকুল থেকে গুটি বের হয়েছে। বাকিগুলোতে আগামী কয়েকদিনের মধ্যে গুটি বের হবে।

চারঘাট উপজেলার কালুহাটি গ্রামের আমচাষি মোজাফফর হোসেন বলেন, এবার বাগানে আগেভাগেই মুকুল এসেছে। গাছভর্তি মুকুল দেখে মন ভরে গেছে। যদি কুয়াশা আর ঝড়ে নষ্ট না হয়, তাহলে এ বছর বিপুল আম উৎপাদনের স্বপ্ন দেখছি।

বাগান পরিচর্যায় ব্যস্ত চাষিরা

মুকুল ও গুটি আসার পর এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে পোকামাকড় দমন ও রোগবালাই থেকে ফসল রক্ষা করা। এজন্য বাগানে নিয়মিত কীটনাশক ও ছত্রাকনাশক স্প্রে করছেন চাষিরা।

বাঘা উপজেলার আরেক আম চাষি জয়নাল আবেদিন সক্রিয়ভাবে তার বাগানের পরিচর্যা করছেন। ৯০০টি গাছের মধ্যে ৫০০টিতে গুটি গজিয়েছে। ফসল রক্ষার জন্য তিনি ইতিমধ্যেই দ্বিতীয় দফায় কীটনাশক স্প্রে করেছেন।

চারঘাটের কানজগাড়ির চাষি এনামুল হক বলেন, ইতোমধ্যে প্রায় সব গাছেই মুকুল এসেছে। তবে হপার বা শোষক পোকার আক্রমণ সময়মতো নিয়ন্ত্রণ না করা গেলে ফলন মারাত্মকভাবে কমে যেতে পারে। তাই আমরা সতর্ক আছি।

রাজশাহী চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি মাসুদুর রহমান রিংকু বলেন, বিভাগের আট জেলায় (চাঁপাইনবাবগঞ্জ, জয়পুরহাট, নওগাঁ, নাটোর, বগুড়া, পাবনা, রাজশাহী ও সিরাজগঞ্জ) যে পরিমাণ আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে তার বাজারমূল্য প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা। এই বিপুল অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে আম প্রক্রিয়াজাতকরণ ও রপ্তানি বাড়ানোর ওপর জোর দেন তিনি।

রাজশাহী ফল গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা সুজিত কুমার বিশ্বাস বলেন, খরাতে যেন আমের গুটি ঝরে না পড়ে, সেজন্য বাগানে নিয়মিত সেচ দেওয়ার পাশাপাশি কীটনাশক প্রয়োগের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক নাসির উদ্দিন বলেন, মাঠপর্যায়ে আমের ভালো উৎপাদনের লক্ষ্যে আমরা চাষিদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিচ্ছি। আমাদের সহকারী ও উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা মাঠে কাজ করছেন।

চাষিদের শঙ্কা ও প্রত্যাশা

এ বছর ভালো ফলনের সম্ভাবনা থাকলেও চাষিদের কিছু শঙ্কা রয়েছে। বাজারে আমের দাম কমে যাওয়া, প্রক্রিয়াজাতকরণের অভাবে মৌসুমের শেষদিকে আম নষ্ট হয়ে যাওয়া এবং রপ্তানি ব্যবস্থার অপ্রতুলতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তারা।

বাঘা উপজেলার চাষি শফিকুল ইসলাম ছানা গত বছর ১ কোটি টাকার আম বিক্রি করেছিলেন। তিনি এ বছর আবার ৩০০ বিঘা জমিতে আম চাষ করছেন। একইভাবে, চর বট তলার কৃষক বিপ্লব গত মৌসুমে ২২ লাখ টাকার আম বিক্রি করেন। উভয়ই এ বছরের ফলনের ব্যাপারে আশাবাদী।

চারঘাটের চাষিরা জানান, এবার কীটনাশকের দাম বেশি। এতে উৎপাদন খরচ কিছুটা বাড়বে। তবে ভালো ফলন হলে সেটা পুষিয়ে যাবে বলে মনে করেন তিনি।

সব মিলিয়ে রাজশাহী অঞ্চলে এবার আমের বাম্পার ফলনের সম্ভাবনা উজ্জ্বল। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ না এলে চলতি মৌসুমে লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়ার আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। সেই সঙ্গে বাড়তি ফলন প্রক্রিয়াজাতকরণ ও রপ্তানির মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

সোনামসজিদ স্থলবন্দরে আমদানি-রপ্তানি শুরু

সাপাহারে প্রতারণার ফাঁদে ফেলে ১২ ভরি স্বর্ণ লুট, গ্রেপ্তার ২

বাস-মোটরসাইকেল সংঘর্ষে ভাঙ্গুড়া বিএনপি নেতা নিহত

যমুনা সেতুতে যানবাহনের দীর্ঘসারি, যাত্রীদের দুর্ভোগ

পেট্রোল মজুদ ও বেশি দামে বিক্রি করায় ব্যবসায়ীর কারাদণ্ড

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আঞ্চলিক কার্যালয় স্থাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার

আওয়ামী আমলের হেলমেট বাহিনীই এখন গুপ্ত বাহিনী

আগস্টের আগে-পরে পুলিশসহ সব হত্যার বিচার হবে

‘তেল নেই’ লেখা পাম্পে মিলল ৯৭৮৩ লিটার জ্বালানি

তেলের চাহিদা বেড়ে যাওয়ার মধ্যে দুর্নীতি আছে