অপেক্ষার ৩ যুগ
প্রায় ৩ যুগ আগে পঞ্চগড়ের মানুষের আশা-নিরাশার দোলাচালে সম্ভাবনার যে স্বপ্ন হতাশায় রুপ নিয়েছিল তা পুনরুজ্জীবিত করতে সকল স্তরের মানুষ আবারও প্রত্যাশার ব্যানারে সমবেত হতে বসেছে।
সীমান্ত জনপদ তেঁতুলিয়ার শালবাহানে উদ্ভাবিত তেল কূপে তেল গ্যাসের সম্ভবনা নিশ্চিত হওয়ার পরেও অদৃশ্য কালো থাবায় হঠাৎ করে তা বন্ধ হয়ে যায়।
দীর্ঘ ৩ যুগ পার হয়ে গেলেও অজানা রহস্য, তেল আছে, নাকি হারিয়ে গেছে ইতিহাসের কোনো ষড়যন্ত্রে ? খনি ঘিরে এই প্রশ্ন দানা বেঁধে উঠেছে মানুষের মাঝে। রহস্য উদঘাটনসহ সম্ভবনার এই ক্ষেত্রটি অনুসন্ধানে বর্তমান সরকারের কাছে দাবি উঠেছে।
দেশের সীমান্তবর্তী জেলা পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ার শালবাহান যুগিগছ গ্রাম ৷ ৩ দশক আগে যেখানে তেল খনির খবরে সরগরম ছিল পুরো দেশ। বিদেশি কোম্পানি, হেলিকপ্টারে বিশেষজ্ঞদের যাতায়াত, কোটি টাকার প্রকল্প, সবকিছুতেই ছিল স্বপ্নের হাতছানি। জমি অধিগ্রহণ, বসতি সরিয়ে কাঁটা তারেরর বেড়া দিয়ে সীমানা নির্ধরণ মহাসমারোহে ভারী খনন উপকরণ নিয়ে কাজ শুরুর সেই দৃশ্যপট অবহেলিত এই জনপদের মানুষের মধ্যে প্রাপ্তি এবং প্রত্যাশার স্বপ্নকে বর্ণিল করে তোলে। বদলে যায় সীমান্ত জনপদের অবয়ব। শুরু হয় খনন কাজ। ধীরে ধীরে খনি সম্ভাব্য সফলতার হাতছানিতে পরিণত হতে থাকে । খনি কেন্দ্রিক আবহ সীমান্তের এই জনপদের মানুষের জীবন-জীবিকায় সম্ভবনার অন্য রকম এক আমেজ তৈরি করে।
তৎকালীন সরকার-প্রধান ঘটা করে তেল প্রাপ্তির বিষয়টি নিশ্চিত করে খনির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। কিন্তু উদ্বোধনের পরেই কিছুদিনের মাথায় হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায় সেই খনি। মানুষের প্রাপ্তি এবং স্বপ্ন অংকুরেই ধ্বংস হয়ে যায়।
কেটে গেছে প্রায় চার দশক। রহস্যের জট খুলেনি আজও। তবে নতুন করে জেগেছে স্বপ্ন। পুনরায় খনির সম্ভাবতা যাচাই ও অনুসন্ধান চালুর দাবি স্থানীয়দের ৷
সবুজে ঘেরা সীমান্তবর্তী উপজেলার তেঁতুলিয়ার শালবাহান এলাকা। শান্ত-নির্জন এই জায়গাটি এক সময় ছিল দেশের আলোচিত তেল খনির কেন্দ্র। ১৯৮৭ সালে ভূকম্পন জরিপে এখানে তেলের সন্ধান পাওয়া যায়। পরের বছর ১৯৮৮ সালের ১০ মে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি হুসাইন মুহম্মদ এরশাদ আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করেন খনন কার্যক্রম।
পরিকল্পনা ছিল প্রায় ৮ হাজার ফুট গভীর থেকে তেল উত্তোলনের। ফ্রান্সের একটি কোম্পানিকে দেওয়া হয় দায়িত্ব। বিদেশি প্রকৌশলী ও বিশেষজ্ঞরা ঢাকার অভিজাত হোটেল থেকে হেলিকপ্টারে করে নিয়মিত আসা-যাওয়া করতেন এখানে।
স্থানীয়দের মতে, এই প্রকল্পে সে সময় ব্যয় হয় ধরা হয় প্রায় শতকোটি টাকা। দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমেও ব্যাপক প্রচার পায় এই খনির খবর।
কিন্তু আশার আলো জ্বালিয়ে মাত্র ৮ মাসের মধ্যেই থেমে যায় সবকিছু। হঠাৎ করেই বন্ধ হয়ে যায় তেল খনির কার্যক্রম । সংশ্লিষ্ট কোম্পানিও রাতারাতি গুটিয়ে নেয় তাদের কার্যক্রম। কেন বন্ধ হলো এর সঠিক কারণ আজও অজানা।
খনন কাজের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলেন এমন অনেকেই এখন বয়সের ভারে ন্যুব্জ। তাদের স্মৃতিতে এখনও স্পষ্ট সেই সময়ের কর্মচাঞ্চল্য।
শুধু শ্রমিক নয়, তখন এই খনি দেখতে ভিড় করতেন আশপাশের হাজারো মানুষ। অনেকেই জীবনে প্রথমবার কাছ থেকে দেখেছিলেন একজন রাষ্ট্রপতিকে। যুবক বয়সে কেউ পায়ে হেঁটে, কেউ সাইকেল চালিয়ে দেখতে গেছিলেন তারা৷
এদিকে স্থানীয়দের মধ্যে রয়েছে নানা আলোচনা ও সন্দেহ। কেউ কেউ বলছেন, একই কোম্পানি ভারতের জলপাইগুড়ি এলাকায় গিয়ে খনন চালায়। এমনও ধারণা আছে, সেখান থেকেই তেল উত্তোলন চলছে।
দীর্ঘদিন পরিত্যক্ত পড়ে থাকা খনির জায়গায় এখন গড়ে উঠেছে বসতবাড়ি। তবে ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে এখনও রয়ে গেছে সিমেন্ট দিয়ে ঢেকে দেওয়া সেই তেল কূপের মুখ। প্রায় প্রতিদিনই দেশের নানা প্রান্ত থেকে দেখতে আসেন মানুষ৷
এদিকে খনি পুনরায় চালুর দাবিতে কয়েক মাস ধরে মানববন্ধনসহ বিভিন্ন কর্মসূচিও পালন করছেন স্থানীয়রা।
তেল খনি চালুর দাবিতে আন্দোলনকারী ও সংগঠক নাগরিক কমিটির সভাপতি মনোয়ার হোসেন হানিফ বলেন, জাতীয় অর্থ বাণিজ্য সম্প্রসারণ করতে শালবাহানের সম্ভবনাময় তেলক্ষেত্রের রহশ্য উন্মোচন এখন সময়ের দাবি। এই জনপদের মানুষের আর্থ-সামাজিক পট পরিবর্তনে খনি চালুর দাবি স্বোচ্চার হচ্ছে।
এই খনি পুনরায় চালু করা গেলে দেশের জ্বালানি খাতে বড় ধরনের অবদান রাখতে পারে বলে মনে করছেন এ্যাড. আহসান হাবীব সরকার, লিগ্যাল এইড সম্পাদক, পঞ্চগড় জেলা আইনজীবি সমিতি।
জেলার সামাজিক সংগঠনগুলো সরকারের পদক্ষেপ আশা করছে। উপজেলা প্রশাসন বলছে, বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা হচ্ছে। সম্ভাব্য যাচাইয়ের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে ইতিমধ্যে চিঠি প্রেরণ করা হয়েছে ৷
পর্যটন নগরী হিসেবে পরিচিত এই পঞ্চগড়ে সমতলের চা, নদনদীসহ ভূগর্ভস্থ নুড়িপাথর ছাড়া এই জেলায় নেই কোনো ভারী শিল্প। ভৌগোলিক কারণে মাটিতে বালি এবং পাথরের আধিক্য থাকায় সেচের অভাবে অর্থকরী ফসল তেমন হয় না। তার পরেও আধুনিক প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে মাল্টা, পেয়ারা, আম, কলা, বাদামসহ বিভিন্ন জাতের সব্জি আবাদে এগিয়ে যাচ্ছে পঞ্চগড়।
দীর্ঘ ৩৭ বছর ধরে রহস্যে ঘেরা শালবাহান তেলের খনির রহস্য উদঘাটন দরকার। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, শুধু রহস্য উন্মোচন নয়, পুনরায় চালু হোক এই খনি। চালু হলে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও তেলের ঘাটতি পূরণসহ বদলে যাবে এই জেলার কৃষি অর্থনীতি।