বর্ষা পুরোপুরি আসার আগেই লালমনিরহাটে দেখা দিয়েছে তিস্তা ও ধরলা নদীর তীব্র ভাঙন। পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নদী হয়ে উঠেছে আরো আগ্রাসী। ফসলি জমি, বসতভিটা, ঘরবাড়ি যাচ্ছে নদীগর্ভে। আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে নদীপাড়ের হাজারো পরিবার। এরই মধ্যে কয়েকদিন পর ভারী বৃষ্টিপাত শুরুর সম্ভাবনার কথা জানিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বন্যা পূর্বাভাস সতর্কীকরণ কেন্দ্রের।
পাউবো সূত্রে জানা যায়, তিস্তায় ভাঙন ঠেকাতে সরকার ১২০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে, যা দিয়ে আপাতত ৪২টি স্থানে বালুভর্তি জিও ব্যাগ ফেলা হচ্ছে। কিন্তু ধরলাপাড়ে এখনো বরাদ্দ না পাওয়ায় সেখানে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব হয়নি। এতে আতঙ্কে দিনাতিপাত করছেন নদীপাড়ের বাসিন্দারা।
ক্ষতিগ্রস্তরা জানান, এক সপ্তাহ ধরে টানা বৃষ্টি ও উজানের ঢলের কারণে নদীর পানি বেড়েই চলেছে, আর তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে নদীভাঙন। কেউ হারিয়েছেন বসতভিটা, কেউ ফসলি জমি।
লালমনিরহাট সদর উপজেলার মোগলহাট সেনপাড়া গ্রামের কৃষক গোলাম মিয়া বলেন, গত এক সপ্তাহেই এক বিঘা ফসলি জমি নদীতে চলে গেছে তার। হুমকিতে রয়েছে আরো কয়েক বিঘা জমি। প্রতিদিনই ভাঙনের তীব্রতা বাড়ছে। লালমনিরহাট সদর উপজেলার মোগলহাট সেনপাড়া গ্রামের মুসর উদ্দিন বলেন, এক সপ্তাহের ব্যবধানে তার ২৫ শতক জমি নদীতে চলে গেছে। হুমকিতে রয়েছে আরো দুই বিঘা জমি। দিনদিন ভাঙন বাড়ছে। একই গ্রামের মালেকা বেগম বলেন, আগে গোলা ভরা ধান আর গোয়াল ভরা গরুর বিশাল সংসার ছিল তাদের। গত সাতদিন হলো বাড়ি অন্যত্র সরিয়ে নিয়েছেন তারা। এর আগে আরো ১১ বার তাদের বাড়িঘর সরাতে হয়েছে।
তিনি আরো বলেন, ‘চড়াসুদে ৬০ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছি। সেই টাকায় চার শতাংশ জমি বন্ধক নিয়ে সেখানে বাড়ি করছি। এখানে না খেয়ে মরলেও কেউ খবর নিতে আসে না। গরিবের খবর কেউ রাখে না।’
সদর উপজেলার হরিণ চওড়া গ্রামের দবিয়ার রহমান বলেন, ‘পরিশ্রম করে আয় করা অর্থে সারা বছর যা সঞ্চয় করি। তা প্রতি বছর বন্যা আর ভাঙনে নষ্ট হচ্ছে। নিয়মিত বাড়ি সরাতে হচ্ছে। বন্যায় ডুবছে ফসল। আমরা চাই স্থায়ীভাবে বসতি গড়তে। এজন্য তিস্তা মহাপরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়ন হতে হবে। এটা বাস্তবায়ন হলে হাজার হাজার একর জমি চাষাবাদের আওতায় আসবে এবং প্রতি বছর বন্যা ও ভাঙনে যে ক্ষতি হয় আর ত্রাণের জন্য যে খরচ হয়, সব বেঁচে যাবে। একই সঙ্গে চাঙা হবে দেশের অর্থনীতি।’
লালমনিরহাটের নির্বাহী প্রকৌশলী সুনীল কুমার বলেন, তিস্তাপাড়ে ৫০-৫৫টি পয়েন্টে ভাঙছে, যার মধ্যে ১৩টি পয়েন্টে কাজ শুরু হয়েছে। তবে ধরলাপাড়ের জন্য বরাদ্দ না আসা পর্যন্ত কিছু করা যাচ্ছে না।
জানা গেছে, খনন না করায় তিস্তার তলদেশ ভরাট হয়েছে। এ কারণে বর্ষাকালে সামান্য পানিতে নদীর পানি দুই কূল উপচে লোকালয়ে বন্যা তৈরি করে। ভেসে যায় ঘরবাড়ি, আসবাবপত্র ও পানিতে ডুবে নষ্ট হয় কোটি কোটি টাকার ফসল। বন্যার পানি কমলে ভাঙনের তীব্রতা বাড়ে। প্রতি মুহূর্তে ভাঙনের শিকার হচ্ছে তিস্তাপাড়ের মানুষ। প্রতি বছর নদীর গতিপথ পরিবর্তন হয়ে লোকালয়ে প্রবেশ করছে তিস্তা নদী। একই সঙ্গে অসংখ্য বালুচর জেগে উঠছে। ফলে অনাবাদি জমির পরিমাণও বাড়ছে তিস্তাপাড়ে।
জেলা প্রশাসক এইচএম রকিব হায়দার বলেন, বন্যা আর ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা করা হচ্ছে। মূলত ভাঙন রোধে স্থায়ী বাঁধের বিকল্প নেই। পানি উন্নয়ন বোর্ড ভাঙন প্রতিরোধে কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছে। জেলা ও উপজেলা প্রশাসনও ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়াচ্ছে।