রংপুর-ঢাকা মহাসড়কের পাশে দমদমা ব্রিজের কাছে বিশাল খোলা জায়গা। শত শত গরু সারি বাঁধা। দেখে মনে হবে গরুর হাট। তবে এটি কোনো হাটের চিত্র নয়, ‘গরুর আবাসিক হোটেল’। ব্যক্তি উদ্যোগে গড়ে তোলা ব্যতিক্রমী এ হোটেলে একসঙ্গে ৪০০-৫০০ গরু রাখা যায়। প্রতিদিন মাত্র ৫০ টাকা ভাড়ায় এ হোটেলে গরু রাখতে পারছেন পাইকার ও খামারিরা। নগরীর মডার্ন মোড়ে বারো আউলিয়া এলাকায়ও রয়েছে এমন হোটেল।
‘গরুর আবাসিক হোটেল’-এ স্বল্প খরচ ও নিরাপদে গরু রাখার সুবিধা পেয়ে খুশি খামারি ও ব্যবসায়ীরা। এতে যেমন গরুর সঠিক পরিচর্যা নিশ্চিত হচ্ছে, তেমনি স্থানীয়দের কর্মসংস্থানও তৈরি হয়েছে। ইতোমধ্যে গরুর আবাসিক হোটেল সারা দেশে ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছে।
সরেজমিন নগরীর মডার্ন মোড়ে বারো আউলিয়া এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, প্রায় ৫০ শতক জমিতে টিনশেড দিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে গরুর আবাসিক হোটেল। প্রায় ১৫ বছর আগে আসানুর রহমান নামে এক ব্যক্তি গড়ে তোলেন এ হোটেল। সেখানে ৩০০-৪০০ গরু রাখার ব্যবস্থা রয়েছে। দেশের দূর-দূরান্ত থেকে আসা খামারি ও পাইকারি গরু ব্যবসায়ীরা অস্থায়ীভাবে তাদের গরু এই আবাসিক হোটেলে রাখছেন। রয়েছে গরুর থাকা, খাওয়া ও নিরাপত্তাসহ যাবতীয় ব্যবস্থা। এক রাত রাখতে হলে প্রতিটি গরুর জন্য দিতে হয় মাত্র ৫০ টাকা।
মডার্ন মোড় এলাকায় গরুর আবাসিক হোটেলের ম্যানেজার আলমগীর হোসেন বলেন, খামারি ও পাইকারি ব্যবসায়ীদের সুবিধার কথা চিন্তা করেই এ ব্যবস্থা করা হয়েছে। নিরাপদ পরিবেশে গরু রাখাসহ সব ধরনের সুবিধা দেওয়া হচ্ছে।
গরুর এই আবাসিক হোটেলের মালিকপক্ষ বলছে, কোরবানির ঈদ ঘিরে প্রতিদিন দুই শিফটে ২০ জন গরুর দেখাশোনার দায়িত্বে আছেন। সার্বক্ষণিক পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করছেন তারা। দিনে বা রাতে নির্দিষ্ট ভাড়ার বিনিময়ে গরু রাখার সুযোগ পাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। এতে বাজারে গরু কেনাবেচার আগ পর্যন্ত নিরাপদে রাখার চিন্তা কমেছে।
রংপুর অঞ্চলের গরুর মাংসের চাহিদা রয়েছে দেশের দক্ষিণাঞ্চলে। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, শরীয়তপুর, বরিশালসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে পাইকাররা এখানে আসেন গরু কিনতে। তবে কয়েক দিন ধরে গরু কিনে রাখার নিরাপদ জায়গা না থাকায় দীর্ঘদিন ভোগান্তিতে ছিলেন তারা। এখন বিভিন্ন হাট থেকে গরু কিনে এনে এই আবাসিক হোটেলেই রাখছেন ব্যবসায়ীরা। দেশের অন্যান্য জেলায়ও এমন উদ্যোগ ছড়িয়ে পড়লে খামারি ও ব্যবসায়ীরা উপকৃত হবেন।
শরীয়তপুরের জাজিরা থেকে গরু কিনতে রংপুরে আসেন মোহাম্মদ ইবরাহীম। চারদিন রংপুরে থেকে গরু কিনেছেন ২২টি। তিনি বলেন, রংপুরে এসেছি এক সাইজের গরু কেনার জন্য। অন্য জেলার চেয়ে রংপুর জেলায় গরু কেনায় মজা আছে। এক দিনেই এতগুলো গরু কেনা সম্ভব নয়। তার জন্য আমরা এই আবাসিক হোটেলে গরু রেখে দুই-তিনটি হাট ঘুরে ২০-২২টি গরু কিনে এক গাড়ি হওয়ামাত্রই নিয়ে যাই।
শরীয়তপুর থেকে গরু কিনতে আসা যুবক আল আমিন বলেন, প্রতি হাটে পাঁচ-ছয়টি করে গরু কিনে নগরীর মডার্ন মোড় এলাকায় গরুর আবাসিক হোটেলে রেস্টের জন্য রাখা হয়। যখন ২০-২৫টি গরু হয়, তখন একটি বড় গাড়ি লোড দিয়ে একবারে নিয়ে যাই। এই গরুর আবাসিক হোটেলে একটি সুবিধা আছে, এক রাত প্রতিটি গরুর জন্য ৫০ টাকা দিতে হয়। গরুর খাবার এখানেই কিনতে পাওয়া যায়। আমাদের আর বাইরে যেতে হয় না। গরুর আবাসিক হোটেলের পাশেই আমাদের থাকার ব্যবস্থা আছে। সেখানে আমরা নিরাপদে থাকতে পারি। এখানে মানুষের সেফটি আছে।
দমদমা ব্রিজ এলাকায় আরেকটি গরুর আবাসিক হোটেলে কথা হয় চট্টগ্রামের হাটহাজারী থেকে গরু কিনতে আসা তাজুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি বলেন, গরুর আবাসিক হোটেল দেশের কোথাও নেই। আমার ৬১ বছর জীবনে এই প্রথম রংপুরেই দেখলাম গরুর আবাসিক হোটেল।
তিনি বলেন, এই হোটেলে এক রাতের জন্য ছোট গরু ৫০ টাকা এবং বড় গরুর জন্য ৬০ টাকা নিচ্ছে। তাতে আমাদের উপকার হয়েছে। সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা দিয়েছে আমাদের। এ ধরনের সুযোগ-সুবিধা দেশের কোথাও পাইনি আমরা।
চারদিন আগে রংপুরে গরু কিনতে এসেছেন মোহাম্মদ আরাফাত। তিনি বলেন, গরুর আবাসিক হোটেলে গরুগুলো রেখে নিশ্চিন্তে থাকা যায়। এখানেই গরুর খাবার পাওয়া যায়, বাইরে থেকে কিনতে হয় না। গরুর আবাসিক হোটেলের পাশেই আমাদের থাকার ব্যবস্থা আছে। তিনি আরো বলেন, হোটেলের মালিকপক্ষ আমাদের জন্য থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থাও করে দিয়েছে। এখানে গরুগুলো সুস্থভাবে থাকছে। গরুর শরীরে কোনো ময়লা থাকছে না।
দমদমা এলাকার গরুর আবাসিক হোটেলের ম্যানেজার মোবারক আলী ভুট্টো বলেন, প্রতিদিন মাত্র ৫০ টাকা ভাড়ায় এখানে গরু রাখতে পারছেন পাইকার ও খামারিরা। রংপুর বিভাগীয় প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের পরিচালক আব্দুল হাই সরকার বলেন, গরুর আবাসিক হোটেল নিঃসন্দেহে ভালো উদ্যোগ। এ অঞ্চলের দেশি জাতের গরুর ব্যাপক চাহিদা আছে দক্ষিণাঞ্চলে। ফলে অনেক পাইকার আর গৃহস্থ আসেন গরু ক্রয়-বিক্রয় করতে। আবাসিক হোটেলে গরু রাখায় তাদের অনেক সমস্যার সমাধান হচ্ছে। এছাড়া কিছু মানুষের কর্মসংস্থানও হয়েছে।
ঈদের সময় প্রতিদিন ২০০-২৫০ গরু থাকছে এই আবাসিক হোটেলে। পাশেই রয়েছে খাবারের ব্যবস্থা। কোরবানির ঈদ সামনে রেখে গরু পরিবহন ও রাখার ঝামেলা কমাতে রংপুরের এই দুই ‘গরুর আবাসিক হোটেল’ এখন খামারি ও ব্যবসায়ীদের কাছে হয়ে উঠেছে আস্থার জায়গা।