রংপুর বিভাগের ছয় জেলার ইউনিয়ন পরিষদের গ্রাম আদালতের প্রতি আস্থা বাড়ছে সাধারণ মানুষের। ন্যায়বিচার পাওয়ার আশায় প্রান্তিক মানুষের ভরসাস্থল এ আদালতগুলোয় দিন দিন মামলার সংখ্যা বেড়ে চলেছে । চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত জেলাগুলোয় মোট ১৩ হাজার ১০১টি মামলা দায়ের হয়েছে। এর মধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে ১১ হাজার ৫০৬টি।
তবে পর্যাপ্ত মনিটরিংয়ের অভাব এবং প্রশিক্ষণ ও এজলাস কক্ষ না থাকায় বিচারকাজ পরিচালনায় সমস্যা পোহাতে হচ্ছে বলে জানিয়েছেন ইউপি চেয়ারম্যানরা। তাদের দাবি, বিচার পরিচালনায় সরকারিভাবে অনুদানসহ পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হলে বিচারকদের এতে যেমন আগ্রহ থাকবে, পাশাপাশি বিচারপ্রার্থীর সংখ্যাও বাড়বে।
স্থানীয় সরকার বিভাগের অফিস সূত্রে জানা গেছে, গ্রাম আদালতে ১০ টাকার বিনিময়ে ফৌজদারি অভিযোগ যেমন—চুরি, দাঙ্গা, প্রতারণা, ঝগড়া-বিবাদ, মূল্যবান সম্পত্তি আত্মসাৎ, অন্যায় আটক, পারিবারিক কলহ ইত্যাদি করতে পারেন ভুক্তভোগীরা। এছাড়া ২০ টাকার বিনিময়ে দেওয়ানি মামলা করতে পারেন যেমন—পাওনা টাকা আদায়, সম্পত্তি পুনরুদ্ধার বা মূল্য আদায় করে দেওয়া, জোর করে দখল থেকে উদ্ধার করা, গবাদিপশুর কারণে ক্ষতি, শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি ও ক্ষতিপূরণ আদায় ইত্যাদি।
সূত্রটি জানায়, গত পাঁচ মাসে রংপুর বিভাগের ছয় জেলায় ইউনিয়ন পরিষদের গ্রাম আদালতে মোট মামলা দায়ের হয়েছে ১৩ হাজার ১০১টি। এর মধ্যে পুরুষরা করেছেন ৯ হাজার ৯৮৩টি এবং নারীরা করেছেন তিন হাজার ১১৮টি। নিষ্পত্তি হয়েছে ১১ হাজার ৫০৬টি।
রংপুর জেলার আট উপজেলার ইউনিয়ন পরিষদের গ্রাম আদালতগুলোয় গত পাঁচ মাসে ৯৯৩টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে পুরুষ ৬১৮ জন এবং নারী ৩৭৫ জন বিভিন্ন অভিযোগে মামলা করেছেন। নীলফামারীতে তিন হাজার ৫২৬টি মামলা দায়ের হয়েছে। এর মধ্যে পুরুষ দুই হাজার ৭৪৪ এবং নারী ৭৪২ জন। লালমনিরহাট জেলায় দুই হাজার ১৯০টি মামলা দায়ের হয়েছে। এর মধ্যে পুরুষ এক হাজার ৬৯২ এবং নারী ৪৯৮ জন।
পঞ্চগড় জেলার গ্রাম আদালতে মামলা দায়ের করেছেন ৯০৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ৬৫৩ এবং নারী ২৫০ জন। গাইবান্ধায় দুই হাজার ৮৬০টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে পুরুষ দুই হাজার ১৯২ এবং নারী ৬৬৮ জন। কুড়িগ্রাম জেলার ইউনিয়ন পরিষদের গ্রাম আদালতগুলোয় দুই হাজার ৬২৯টি মামলা দায়ের হয়েছে। এর মধ্যে পুরুষ দুই হাজার ৪৪ জন এবং নারী ৫৮৫ জন।
সূত্রটি জানায়, ‘অল্প সময়ে স্বল্প খরচে সঠিক বিচার পেতে চলে যাই গ্রাম আদালতে’ স্লোগান নিয়ে স্থানীয় সরকার বিভাগ ইউএনডিপির সহায়তায় সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে গ্রাম আদালত পর্যবেক্ষণ ও সহায়তার জন্য মাঠে কাজ করে যাচ্ছে। ইউপি চেয়ারম্যান ও সংশ্লিষ্টদের প্রশিক্ষণের পাশাপাশি মামলা পরিচালনা এবং বিচার নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এ কারণে গ্রাম আদালতগুলোয় মামলা ও বিচারপ্রার্থীর সংখ্যা বাড়ছে।
লালমনিরহাটের মহেন্দ্রনগর ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল মজিদ মণ্ডল বলেন, খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ তার ন্যায্য অধিকারের জন্য ইউনিয়ন পরিষদের গ্রাম আদালতগুলোয় অভিযোগ দিয়ে থাকেন। আমরা উভয়পক্ষকে ডেকে পরিষদে তাদের আবেদনগুলো উপস্থাপন করে নিষ্পত্তি করার ব্যবস্থা করি। অনেক সময় প্রভাবশালীরা এ বিচারগুলো মানতে চান না। সেক্ষেত্রে বিচারের রায় কার্যকর করতে আমাদের হিমশিম খেতে হয়।
তিনি বলেন, বিচারের রায় কার্যকর এবং বাস্তবায়ন করতে সরকারের পক্ষ থেকে যদি কোনো ব্যবস্থা করা হতো, সেক্ষেত্রে গ্রাম আদালতের বিচারপতির ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা আরো বাড়ত ।
গাইবান্ধার সাঘাটা এলাকার ইউপি চেয়ারম্যান সেলিম আহমেদ তুলিপ বলেন, গ্রাম আদালতে দিন দিন বিচারপ্রার্থীর সংখ্যা বাড়ছে। তবে সরকারি সহায়তা না থাকায় বিচারকাজ পরিচালনায় আগ্রহ থাকে না সংশ্লিষ্ট আদালতের বিচারকদের। অনেক ইউনিয়ন পরিষদের এজলাস কক্ষ না থাকায় বিচারকাজ পরিচালনায় ব্যাঘাত সৃষ্টি হয়।
নীলফামারীর পঞ্চপুকুর ইউপি চেয়ারম্যান ওহেদুল ইসলাম বলেন, গ্রাম আদালতে বিচারের আবেদন করতে বেশি টাকা খরচ করতে হয় না। ফৌজদারি মামলার জন্য ১০ টাকা এবং দেওয়ানি মামলার আবেদনের জন্য ২০ টাকা জমা দিতে হয়। তবে মামলা নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে উভয়পক্ষকে রায় মেনে নিতে কঠিন ভূমিকা পালন করতে হয়। সেক্ষেত্রে অনেকে চেয়ারম্যানদের প্রতি নাখোশ হয়ে বিরূপ মন্তব্য করে থাকেন।
সংরক্ষিত নারী ওয়ার্ডের সদস্য মোছা. মিতু বেগম ও লাবনী বেগম আমার দেশকে বলেন, ইউনিয়ন পরিষদের গ্রাম আদালতে সাধারণত খেটে খাওয়া মানুষ অভিযোগ করে থাকেন। বিশেষ করে নির্যাতিত নারী এবং যারা অসহায় তারাই বেশি ইউনিয়ন পরিষদে আসেন। এছাড়া সরকারি অর্থ সহায়তা এবং পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হলে এ আদালতগুলো আরো সক্রিয় হয়ে উঠবে বলে তারা জানান।
স্থানীয় সরকার বিভাগের গ্রাম আদালত প্রকল্পের ম্যানেজার মাসুদ রানা আমার দেশকে বলেন, গ্রাম আদালতকে আরো বেশি সক্রিয় করতে আমরা প্রতিটি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান এবং সংশ্লিষ্ট ইউপি সদস্যদের নিয়ে বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করার পাশাপাশি আদালতগুলোয় মামলা করতে সাধারণ মানুষের আগ্রহ বাড়াতে নানাভাবে উদ্বুদ্ধ করে যাচ্ছি। বর্তমান সরকার গ্রাম আদালতকে অনেক বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। এ কারণে আমরা যারা এ প্রকল্পে কাজ করছি, তারা আরো বেশি উৎসাহ পাচ্ছি। দ্রুত সমাধান পাওয়ায় গ্রাম আদালতগুলোয় এখন বিচারপ্রার্থীর সংখ্যা বাড়ছে।
ইউএনডিপির জেন্ডার অ্যানালিস্ট শামীমা আক্তার শাম্মী বলেন, স্থানীয় মানুষের জীবনমান উন্নয়নে এবং তাদের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশ সরকারকে ইউএনডিপি সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে যারা বেশি অবহেলিত তাদের প্রাধান্য দিয়ে গ্রাম আদালতগুলোকে শক্তিশালী করতে ইউএনডিপি সব সময় সরকারের পাশে আছে।
সহকারী জেলা দায়রা জজ এবং চিফ লিগ্যাল এইড অফিসার শবনম মোস্তারী বলেন, নারীদের এমন কিছু মামলা রয়েছে, যা বিনা খরচে লিগ্যাল এইডের মাধ্যমে করা হয়ে থাকে। সেখানে নারীদের ন্যায্য অধিকার আদায় করে দেওয়া হয়। বিশেষ করে গ্রাম আদালত থেকে নারীদের মামলার বিষয়ে ইউপি চেয়ারম্যানরা আমাদের কাছে নোট দিয়ে পাঠান, আমরা সেগুলো গুরুত্বসহকারে দেখি।
তিনি বলেন, আমরা বিচারকরাও চাই গ্রাম আদালতগুলো আরো বেশি শক্তিশালীভাবে পরিচালিত হোক। ফৌজদারি ও দেওয়ানি মামলাগুলো নিষ্পত্তি করলে জেলা আদালতে বিচারপ্রাপ্তির সংখ্যা কমার পাশাপাশি মামলার জটও অনেকটা কমে যাবে।
এ বিষয়ে রংপুর বিভাগীয় কমিশনার শহিদুল ইসলাম আমার দেশকে বলেন, গ্রাম আদালত আইন, ২০০৬ অনুযায়ী স্থানীয়ভাবে কতিপয় ফৌজদারি ও দেওয়ানি বিরোধের সহজ ও দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য ইউনিয়ন পরিষদে গ্রাম আদালত গঠিত হয়েছে। এই আদালত তিন লাখ টাকা মূল্যমানের ফৌজদারি ও দেওয়ানি বিরোধ নিষ্পত্তি করতে পারে।
তিনি বলে, গ্রাম আদালতের বিচারের ওপর দিন দিন মানুষের আস্থা বাড়ছে। ইউপি চেয়ারম্যানদের দাবিগুলো আমাদের জানানো হয়েছে, আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। মানুষের আস্থা আরো বাড়াতে এবং গ্রাম আদালতকে শক্তিশালী করতে বর্তমান সরকার বিভন্ন ধরনের কাজ করছে।