ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে গত বছরের ৫ আগস্ট দেশজুড়ে ভেঙে পড়ে ক্ষমতার দাম্ভিক দেয়াল। পুড়ে ছারখার হয়ে যায় বহু দলীয় কার্যালয়, অভিজাত ভবন থেকে শুরু করে ইউনিয়ন পর্যায়ের অফিস। সেই ধারাবাহিকতায় দিনাজপুরের খানসামা উপজেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়টিও পরিণত হয়েছে এক নির্মম নিদর্শনে। এক সময়ের ক্ষমতার ভরকেন্দ্রটি এখন ঘৃণার বস্তু। ভবনটির সামনে বসেছে পান, চা, বিড়ি-সিগারেটের দোকান। আবার বেহাল ভবনটি এখন সাধারণ মানুষের গণশৌচাগার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, পাকেরহাটে অবস্থিত উপজেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়টির দেয়ালে আগুনের পোড়া দাগ এখনো স্পষ্ট। ছাইভস্ম হয়ে যাওয়া কাঠ, ভাঙা কাচ আর স্যাঁতসেঁতে মেঝে জুড়ে পড়ে আছে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা পোড়া কাগজপত্র। ভবনের স্টিলের নামফলক ইতোমধ্যেই খুলে নিয়েছে বিক্ষুব্ধ জনতা। মুছে ফেলা হয়েছে 'আওয়ামী লীগ' নামের চিহ্ন। ভবনটির দক্ষিণে সামনের একাংশ দখল করে বসানো হয়েছে একটি অস্থায়ী দোকান, যেখানে বিক্রি হচ্ছে চা, পান, বিড়ি, সিগারেট। কার্যালয়ের নিচতলাকে এখন ব্যবহার করা হচ্ছে পাবলিক টয়লেটের মতো। যেই ভবনেই চলত নানা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, বৈঠক, দলীয় সভা, তদবির ও ক্ষমতার লেনদেন। এখন সেই ভবন দাঁড়িয়ে আছে ইতিহাসের এক নির্মম পরিহাস হয়ে।
স্থানীয় পথচারীদের অনেকে ভবনটি দেখিয়ে বলেন, এই ভবনে বসেই মানুষ মারার সিদ্ধান্ত হতো। পুলিশ কাকে ধরে, কার ওপর মামলা হয়, সেসব এখান থেকেই ঠিক হতো।
কেউ কেউ বলেন, আওয়ামী লীগ যেভাবে দেশের মানুষকে শোষণ করেছে, এখন তারই ফল ভোগ করছে। এই ভবন থেকেই নির্যাতনের নকশা তৈরি হতো।
স্থানীয়রা বলেন, আওয়ামী লীগের দীর্ঘ সময়ের শাসনামলে দলীয় কার্যালয়গুলো হয়ে উঠেছিল সিদ্ধান্ত কেন্দ্র, কিন্তু সে সিদ্ধান্ত ছিল অনেকাংশেই জনস্বার্থবিরোধী। যেখানে দলীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়া হতো, সেখানে জনগণের কণ্ঠ রুদ্ধ হতো। এখন সেই কার্যালয়, সেই কাঠামোই ভেঙে পড়েছে জনগণের হাতে। ভবনটি দেখে মনে হয়, সময় যেন এক নির্মম প্রতিশোধ নিয়েছে। এতদিন যে ভবন ছিল দম্ভের চূড়া, এখন তা সবার চোখে উপহাসের প্রতীক।
গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকার ক্ষমতাচ্যুত হলে ছাত্র-জনতার বিক্ষোভের মুখে সারা দেশে আওয়ামী লীগের কার্যালয়গুলোতে হামলার ঢেউ আছড়ে পড়ে। অনেকটা একই সময়ে খানসামার এই কার্যালয়টিতেও চালানো হয় ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ। ভবনের আসবাবপত্র রাস্তায় বের করে আগুন ধরিয়ে দেয় জনতা। ভবনের স্টিলের নামফলক উপড়ে ফেলা হয়। এর পর থেকেই কার্যালয়টি বন্ধ, জনশূন্য, অরক্ষিত। সেই থেকে আর কোনো নেতাকর্মী সেখানে যায়নি।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় পতনের পর থেকেই উপজেলার স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরাও অনেকেই এখন আত্মগোপনে, অনেকে এলাকা ছেড়ে গেছেন। কেউ কেউ বিদেশ চলে গেছেন। অনেকে জায়গা বদল করে গা ঢাকা দিয়ে থাকছেন। তবে কেউ কেউ আবার অভ্যুত্থানেপন্থি দলগুলোর সুবিধাবাদী নেতাদের ‘ম্যানেজ’ করে ঠিকই এলাকায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন।
স্থানীয় রাজনীতিবিদরা বলেন, দল যখন জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, তখন তার অফিসগুলোও জনরোষের কেন্দ্র হয়ে ওঠে। আজকের গণশৌচাগার ও চায়ের দোকানে পরিণত হওয়া ভবনগুলো সেই বাস্তবতারই প্রমাণ।
নির্মম পরিণতির বিষয়ে জানতে উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সফিউল আযম চৌধুরীর সঙ্গে একাধিক বার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেও সম্ভব হয়নি। তিনি কোথায় আছেন তাও জানা যায়নি।