লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ উপজেলার কাকিনা ইউনিয়নে অবস্থিত ঐতিহাসিক কাকিনা জমিদার বাড়ি বর্তমানে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। কয়েকশ বছরের পুরোনো এই রাজবাড়িটি একসময় শিক্ষা-সংস্কৃতি ও ঐশ্বর্যের কেন্দ্রবিন্দু ছিল। কিন্তু কালের বিবর্তনে এখন অযত্ন-অবহেলায় হারিয়ে যাচ্ছে ইতিহাসের গৌরবময় অধ্যায়।
স্থানীয় ইতিহাসবিদদের মতে, আজ থেকে প্রায় সাড়ে ৩০০ বছর আগে ১৬৮৭ সালে মোগল সম্রাটের দেওয়া সনদের মাধ্যমে কাকিনায় জমিদারি প্রতিষ্ঠিত হয়। জমিদার কাশীনাথ রায় ছিলেন এ পরিবারের প্রথম প্রভাবশালী নেতা। তিনি কৃষি, বাণিজ্য ও স্থাপত্যে অবদান রাখেন এবং কাকিনা অঞ্চলে একটি সুসংগঠিত প্রশাসন গড়ে তোলেন। পরে জমিদার মহিমা রঞ্জন রায় ও শম্ভুচরণ রায় এই জমিদারির পরিধি বৃদ্ধি করেন।
সময়ের ব্যবধানে রাজবাড়ির অধিকাংশ অংশ এখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। কোথাও ছাদ ধসে পড়েছে, ছাদের চুন-সুরকি খসে পড়ছে, কোথাও দেয়াল ফেটে গেছে। এখন জমিদার বাড়ির সেই প্রাসাদ, অতিথিশালা, রাজদরবার ও গোপন কক্ষগুলো ভগ্নদশায়।
স্থানীয়দের দাবি, সরকারি উদ্যোগে এ বাড়িটি সংস্কার ও সংরক্ষণ করা হোক। এই রাজবাড়িটি সংরক্ষণ করা গেলে লালমনিরহাটে পর্যটনের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে।
সাবেক স্কুলশিক্ষক শহিদার রহমান বলেন, জমিদার মহিমা রঞ্জন রায় চৌধুরী শিক্ষা ও সংস্কৃতির প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। তিনি রংপুরে ‘বঙ্গ বিদ্যালয়’ প্রতিষ্ঠা করেন, যা পরে ‘কৈলাশ রঞ্জন উচ্চ বিদ্যালয়’ নামে পরিচিত হয়। এছাড়া তার সময়ই কাকিনা জমিদারির আওতায় মহিমাগঞ্জ, তিস্তা, মহেন্দ্রনগর, লালমনিরহাট, আদিতমারী, মোগলহাট ও কাকিনা রেলস্টেশন প্রতিষ্ঠিত হয়।
স্থানীয় ব্যবসায়ী আবু তালেব মিলু বলেন, জমিদার বাড়িটির স্থাপত্যশৈলী ছিল অনন্য; ইউরোপীয় নকশা ও মোগল অলংকরণের দৃষ্টিনন্দন সমন্বয়ে নির্মিত। দোতলা বিশাল প্রাসাদ, রাজদরবার, অতিথিশালা, হাওয়াখানা, গোপন পথ ও গোপন কক্ষ—সব মিলিয়ে এটি ছিল একসময়ের রাজকীয় স্থাপত্যের উজ্জ্বল নিদর্শন। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে আজ ঐতিহ্য হারাতে বসেছে তা।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, উত্তরবঙ্গের এই গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক স্থাপনা দ্রুত সংরক্ষণ করা না হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক অমূল্য ঐতিহ্য চিরতরে হারিয়ে যাবে। তাই রাষ্ট্রীয় তত্ত্বাবধানে দ্রুত সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধার কার্যক্রম শুরু করার দাবি জানান তারা
এ ব্যাপারে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর রংপুর বিভাগের মাঠ কর্মকর্তা আবু সাঈদ ইনাম তানভিরুল বলেন, আমরা কাকিনা জমিদার বাড়ি সম্পর্কে সব জানি।
যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সরেজমিনে পরিদর্শন করে এটিকে প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদ হিসেবে সংরক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।