রংপুরে ১১ দলীয় ঐক্যের মহাসমাবেশে ডা. শফিকুর
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, বৈষম্যহীন নতুন বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যেই জুলাই গণঅভ্যুত্থানে তরুণরা জীবন দিয়েছেন। সেই নতুন বাংলাদেশ গড়ার জন্যেই সংস্কারের উদ্দেশ্যে গণভোট হয়েছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রতিটি অঙ্গীকার অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করা হবে। সীমান্ত ইস্যুতে সরকারের নিষ্ক্রিয়তারও অভিযোগ করেন তিনি।
গতকাল শনিবার বিকালে রংপুর জেলা স্কুল মাঠে ১১ দলীয় জোট আয়োজিত বিভাগীয় মহাসমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উদ্দেশে তিনি বলেন, রংপুরের এক সমাবেশে তিনি জনগণকে দলীয় ভোটের পাশাপাশি সংস্কারের পক্ষে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। তিনি প্রথমটা রক্ষা করেছেন, দ্বিতীয়টা করেননি। গণভোটের রায় বাস্তবায়ন থেকে আমাদের সরিয়ে নিতে নানা চেষ্টা হচ্ছে। কিন্তু জাতির সঙ্গে আমরা বেঈমানি করব না। এই দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আমাদের আন্দোলন চলবে।
তিনি অভিযোগ করেন, তিস্তা নিয়ে বর্তমান সরকারি দল অনেক ভালো ভালো কথা বলছে। নির্বাচনের আগে জাগো বাহে তিস্তা বাঁচাও- এই আন্দোলন করেছে। কিন্তু বাজেটে এ প্রকল্পের জন্য কার্যকর কোনো বরাদ্দ রাখা হয়নি। আমরা আর কথার ফুলঝুরি চাই না। বাস্তব পদক্ষেপ দেখতে চাই। সুযোগ পেলে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের পাশাপাশি তিস্তাপাড়ের মানুষের সব ন্যায্য দাবি পূরণ করা হবে এবং রংপুর বিভাগকে কৃষির রাজধানীতে পরিণত করা হবে।
ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে জামায়াত আমির বলেন, সীমান্তের বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে নানান সুড়সুড়ি দিচ্ছে প্রতিবেশী ভারত। সরকার সব জেনে শুনে মুখে কুলুপ এঁটে বসে আছে। সরকারের পক্ষ থেকে এখনো এ বিষয়ে স্পষ্ট কোনো বক্তব্য আসেনি। জনগণের আকাঙ্ক্ষার বিরুদ্ধে অবস্থান নিলে তার পরিণতি ইতিহাস থেকেই শিক্ষা নেওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি বলেন, আমরা প্রতিবাদ করছি, জনগণ প্রতিবাদ করছে। শুধু প্রতিবাদ করছে না, প্রতিরোধ করার জন্য বিজিবির সৈনিকদের সঙ্গে সমান তালে জনগণ লড়াই করে যাচ্ছে। আমরা এই সংগ্রামী বীরদের অভিনন্দন জানাই। আমরা যতদিন বেঁচে থাকব দেশের এক ইঞ্চি জমি তো দূরের কথা, একটা বালুর উপরেও কাউকে কর্তৃত্ব করতে দেব না।
কৃষকদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, রংপুরে বিপুল পরিমাণ আলু উৎপাদিত হলেও হিমাগারে সংরক্ষণের জন্য কৃষকদের বস্তাপ্রতি অতিরিক্ত অর্থ গুনতে হচ্ছে, যা অন্যায়। এটা বন্ধ করতে হবে এবং ন্যায্য দামেই সেখানে আলু রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। শুধু আলু নয়, এ অঞ্চলের সব কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে হবে।
দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির সমালোচনা করে তিনি অভিযোগ করেন, চাঁদাবাজি ও দুর্নীতিতে জড়িত ব্যক্তিরা সাধারণ মানুষের কষ্ট বোঝেন না। ভবিষ্যতে তাদের জোট সরকার গঠন করতে পারলে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রয়োগ করা হবে।
গত জাতীয় নির্বাচনে দুর্নীতিবাজরা এক হয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং করে ১১ দলীয় জোটকে হারিয়ে দিয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আগামীতে এই সুযোগ আর দিবে না জনগণ। তখন ন্যায় ইনসাফের ভিত্তিতে সরকার গঠন করা হবে। যেখানে দুর্নীতি করার প্রয়োজন হবে না। সম্মানজনকভাবে সবাই বাঁচতে পারবে। কেউ দুর্নীতি করলে তাকে ছেড়ে কথা বলা হবে না। প্রধানমন্ত্রী হলেও না। তাকেও বিচারের মুখোমুখি করা হবে।
জুলাই আন্দোলনে ছাত্র-জনতা হত্যার ঘটনায় জড়িতদের বিচার দাবি করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, পুলিশ সদস্যসহ যারা ফ্যাসিস্টদের নির্দেশে গুলি চালিয়ে মানুষ হত্যা করেছে, তাদের অবশ্যই বিচারের আওতায় আনতে হবে।
তিনি আরো বলেন, ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর থেকে শুরু করে পিলখানা হত্যাকাণ্ড, শাপলা চত্বরের ঘটনা, গুম-খুন, জুলাই গণহত্যা, এমনকি বিপ্লবের প্রতীক শরীফ ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ডসহ সব ঘটনার নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত করতে হবে। বর্তমান সরকার যদি তা করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে দায় স্বীকার করে সরে দাঁড়ানো উচিত।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম এমপি বলেন, এবারের বাজেটে রংপুর বিভাগের সঙ্গে বৈষম্য করা হয়েছে। বিরোধী দলের সংসদ সদস্য বেশি থাকায় রংপুরে বরাদ্দ কম দেওয়া হয়েছে এবং সরকারের প্রতি এ অঞ্চলের জন্য বিশেষ বরাদ্দ দেওয়ার আহ্বান জানান।
চীন সফর প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সরকারের সফরের দৃশ্যমান কোনো সাফল্য এখন পর্যন্ত দেখা যায়নি। গণঅভ্যুত্থান ও গণভোট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এসবের অঙ্গীকার থেকে সরে গেলে বিএনপিকে চরম মূল্য দিতে হবে।
লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীর বিক্রম ভারতকে উদ্দেশ করে বলেন, আপনারা যখন বলবেন রংপুর দখল করব তখন আমরা কলকাতা দখল করব। আগের দিন শেষ। এখন নতুন জামানা।
জনগণের ক্ষমতা জনগণের হাতেই ফিরিয়ে দেওয়াই তাদের আন্দোলনের মূল লক্ষ্য উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমাদের আন্দোলন কোনো পদ-পদবি বা ব্যক্তিগত স্বার্থের জন্য নয়। আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চাই, যেখানে সুশাসন, ন্যায়বিচার ও মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠিত হবে এবং চাঁদাবাজি ও দুর্নীতির কোনো স্থান থাকবে না।
তিনি আরো বলেন, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়োগের ক্ষেত্রে দলীয় বিবেচনার পরিবর্তে একটি স্বাধীন যাচাই-বাছাই কমিটির মাধ্যমে পদায়ন নিশ্চিত করা উচিত।
সমাবেশে আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ বলেন, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান দেশের মানুষের রাজনৈতিক চেতনা বদলে দিয়েছে। যারা জুলাই সনদ থেকে সরিয়ে নতুন করে পুরাতন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত করতে চায়, যারা আজকে দিল্লির কথামতো চলতে চায়, তাদেরকে আমরা মনে করিয়ে দিতে চাই, বাংলাদেশের লক্ষ কোটি শহীদসহ ওসমান হাদিরা পাড়ায় মহল্লায় লাল-সবুজের পতাকা হাতে নিয়ে আজাদীর জন্য স্বাধীনতার জন্য সবার হাতে বিজয়ের পতাকা তুলে দেবে।
সমাবেশে আরো বক্তব্য দেন জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য মাওলানা মমতাজ উদ্দিন, এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মাওলানা জালাল উদ্দীন, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মাওলানা আবদুল কাইয়ুম সোবহানী, লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান, জাগপা সহসভাপতি রাশেদ প্রধান, ডেভেলপমেন্ট পার্টির চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট এ কে এম আনোয়ারুল ইসলাম চাঁন, রংপুর-৫ আসনের সংসদ সদস্য গোলাম রব্বানীসহ ১১ দলীয় জোটের নেতারা।