সিলেটের ওসমানীনগর উপজেলায় সালিশ বৈঠকে সংঘটিত আব্দুল সামাদ হত্যা মামলার দুই মাস পেরিয়ে গেলেও প্রধান আসামি এখনো গ্রেপ্তার হয়নি। একই সঙ্গে হত্যাকাণ্ডে মদতদাতা হিসেবে অভিযুক্ত ৬ জনের নাম এজাহারে অন্তর্ভুক্ত না করায় বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে চরম উদ্বেগ ও শঙ্কা প্রকাশ করেছে নিহতের পরিবার।
মামলার এজাহার ও পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, নিহত সামাদ মিয়ার পরিবারের সঙ্গে প্রতিবেশী দুই বাড়ির লোকজনের দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলে আসছিল। সামান্য বিষয়কে কেন্দ্র করে তারা যৌথভাবে সামাদদের পরিবারের চলাচলের একমাত্র রাস্তা বন্ধ করে দিত। গত ৫ মার্চ সন্ধ্যায় সামাদরা বাড়ি মেরামতের জন্য পিকআপ ভ্যানে নির্মাণসামগ্রী নিয়ে আসতে চাইলে রাস্তা বন্ধকারী প্রতিবেশী দুই বাড়ির একপক্ষ বাধা দেয়। এ নিয়ে উভয়পক্ষের মধ্যে তর্ক-বিতর্ক সৃষ্টি হয়।
পরদিন ৬ মার্চ রাত সাড়ে ১০টার দিকে উপজেলার উসমানপুর ইউনিয়নের কিত্তে কমরপুর (সিকন্দরপুর) গ্রামের মাশুক মিয়ার বাড়িতে রাস্তা সংক্রান্ত একটি সালিশ বৈঠক আহ্বান করা হয়। বৈঠক চলাকালে প্রতিপক্ষের শাকিল মিয়ার ছুরিকাঘাতে নিহত হন মৃত আব্দুল খালিকের ছেলে সামাদ মিয়া (২৪)।
এ ঘটনায় গত ৮ মে সামাদের স্ত্রী ডলি বেগম বাদী হয়ে হত্যাকাণ্ডে পরিকল্পনাকারী ও হত্যাকারীসহ মোট ১৯ জনকে আসামি করে ওসমানীনগর থানায় মামলা করতে গেলে পুলিশ হত্যাকাণ্ডে পরিকল্পনাকারী ৬ জনের নাম বাদ দিয়ে হত্যাকারী ১৩ জনের নাম এবং অজ্ঞাতনামা আরও ৪-৫ জনকে আসামি করে এজাহার দিতে বলে।
পরবর্তীতে বাদী ডলি বেগম পুলিশের কথামতো ১৩ জনকে আসামি করে মামলা করতে বাধ্য হন। এতে পরিকল্পনাকারী হিসেবে অভিযুক্ত মূল ৬ জন আসামির নাম বাদ পড়ে যায়। (মামলা নং-৫)।
বাদ পড়া ব্যক্তিরা হলেন, একই গ্রামের প্রভাবশালী আব্দুল মানিকের ছেলে সাজু আহমেদ, মৃত মসদ্দর আলীর ছেলে আব্দুল হান্নান, বাবুল মিয়া, মৃত ইসকন্দর আলীর ছেলে টুনু মিয়া, সেবুল মিয়া ও রাহাদ মিয়া। হত্যাকাণ্ডের পর থেকে তারা পলাতক থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে রাতের আঁধারে বাড়িতে আসা-যাওয়া করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
ডলি বেগম আরও অভিযোগ করে বলেন, বাদ পড়া ৬ জনই আমাদের চলাচলের একমাত্র রাস্তা বন্ধ করে রেখেছিল। একইভাবে হত্যাকারীদেরও আমাদের চলাচলের বিকল্প রাস্তা বন্ধ করে দিতে প্ররোচনা দিত। এর জেরেই তারা আমার স্বামীকে হত্যা করেছে। এ ঘটনায় আমার দেবর-ভাসুরসহ আরও ৮ থেকে ১০ জন আহত হয়েছেন। দুইজনের অবস্থা এখনও গুরুতর। এজাহারে তাদের নাম অন্তর্ভুক্ত করতে পুলিশকে বারবার অনুরোধ করেও কোনো লাভ হয়নি। শেষ পর্যন্ত পুলিশের কথামতো মামলা দিতে বাধ্য হই।
মামলায় নাম বাদ পড়া ব্যক্তিদের বক্তব্য জানতে কিত্তে কমরপুর (সিকন্দরপুর) গ্রামে তাদের বাড়িতে গেলে কোনো পুরুষ সদস্যকে পাওয়া যায়নি। হত্যাকাণ্ডের পর থেকে তারা বাড়িতে নেই। আত্মগোপনে থাকায় তাদের ব্যবহৃত মুঠোফোনও বন্ধ পাওয়া যায়।
হত্যাকাণ্ডের পর গ্রামবাসীর সহায়তায় পুলিশ এ পর্যন্ত ৬ জনকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হলেও প্রধান আসামি শাকিল মিয়াকে দুই মাসেও গ্রেপ্তার করতে পারেনি।
ওসমানীনগর থানার ওসি মুরশেদুল আলম ভূইয়া বলেন, বাদীর লিখিত অভিযোগের আলোকে মামলা নেওয়া হয়েছে। প্রধান আসামিসহ অন্যদের গ্রেপ্তারে পুলিশের অভিযান ও তদন্ত চলমান রয়েছে। অন্য কারও সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সিলেটের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ওসমানীনগর সার্কেল) মানছুরা আক্তার বলেন, মামলায় বাদ পড়া ব্যক্তিরা ঘটনার দিন বাড়িতে ছিলেন না। এমনকি ঘটনার আগে ও পরে মোবাইল ট্র্যাকিংয়ের মাধ্যমে তাদের কোনো সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়নি।
উল্লেখ, গত ৬ মার্চ রাত সাড়ে ১০টার দিকে উসমানপুর ইউনিয়নের কিত্তে কমরপুর (সিকন্দরপুর) গ্রামের মাশুক মিয়ার বাড়িতে রাস্তা সংক্রান্ত সালিশ বৈঠকে সামাদ মিয়া নিহত হন। দীর্ঘদিন ধরে বাড়ির সামনের একমাত্র রাস্তাটি দেয়াল নির্মাণ করে বন্ধ করা এবং বিকল্প পথও বন্ধ করে দেওয়াকে কেন্দ্র করেই ওই বৈঠক ডাকা হয়েছিল।
পরিবারের দাবি সামাদ হত্যাকাণ্ডের পর তার লাশ বের করার জন্য গ্রামের পঞ্চায়েত জানাজার দিন অবৈধভাবে নির্মিত দেয়াল খুলে দেয়। তবে যাদের সঙ্গে রাস্তা নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধ ছিল, তারাই হত্যা মামলার এজাহার থেকে বাদ পড়ায় ন্যায়বিচার নিয়ে শঙ্কায় রয়েছে নিহত সামাদের পরিবার।
এএস