প্রার্থীদের হলফনামা
প্রবাসী অধ্যুষিত সিলেটের রাজনীতিতে এবারও অর্থনৈতিক প্রভাব স্পষ্ট। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে সিলেট জেলার ছয়টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থাকা ৪০ প্রার্থীর মধ্যে অর্ধেকের বেশিÑ২২ জনই কোটিপতি। নির্বাচন কমিশনে দাখিল করা হলফনামা বিশ্লেষণে বিএনপি-জামায়াতসহ বিভিন্ন দলের প্রার্থীর বিপুল সম্পদের চিত্র উঠে এসেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি সম্পদের মালিক গণঅধিকার পরিষদের প্রার্থী জাহিদুর রহমান।
সিলেট জেলার ছয়টি সংসদীয় আসনে ৪৭ জন মনোনয়ন দাখিল করলেও যাচাই-বাছাই শেষে ৩৫ জনের মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করা হয়। পরে অপেক্ষমাণ চারজন মনোনয়ন জমা দিলে এ সংখ্যা দাঁড়ায় ৩৯ জনে। আপিলে সিলেট-৩ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী মোস্তাকিম রাজা চৌধুরী মনোনয়ন ফিরে পাওয়ায় চূড়ান্তভাবে প্রার্থী সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪০ জনে।
নির্বাচন কমিশনে দাখিল করা হলফনামা বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সিলেটের প্রার্থীদের মধ্যে ২২ জনই কোটিপতি। এদের মধ্যে বিএনপি ও জোটের আটজন এবং জামায়াতে ইসলামীর পাঁচ প্রার্থী রয়েছেন। বাকিরা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিত্ব করছেন। প্রার্থীদের পেশার তালিকায় রয়েছে ব্যবসায়ী, প্রবাসী, অবসরপ্রাপ্ত চাকরিজীবী, আইনজীবী ও শিক্ষক।
হলফনামার তথ্যানুযায়ী, সবচেয়ে বেশি সম্পদ সিলেট-৬ আসনের গণঅধিকার পরিষদের প্রার্থী জাহিদুর রহমানের। তার সম্পদের পরিমাণ ৫২ কোটি ৭৪ লাখ টাকা। ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশের প্রার্থী শামীম মিয়ার সম্পদের পরিমাণ দুই কোটি ৩৪ লাখ ৮৭০ টাকা। এছাড়া প্রার্থীদের মধ্যে অন্তত পাঁচজনের স্ত্রীও কোটি টাকার বেশি সম্পদের মালিক।
বিএনপির প্রার্থী
সিলেট-১ আসনে খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, সিলেট-২ আসনে তাহসিনা রুশদীর, সিলেট-৩ আসনে এমএ মালিক (প্রবাসী) এবং সিলেট-৪ আসনে সাবেক সিটি মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী দলীয় প্রার্থী। চারজনই দলের চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা। অন্যদিকে সিলেট-৫ আসনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের প্রার্থী করা হয়েছে জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের কেন্দ্রীয় সভাপতি মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুককে। এ আসনে বিএনপির প্রার্থী না থাকলেও স্বতন্ত্র হিসেবে রয়েছেন জেলা বিএনপির সহসভাপতি মামুনুর রশিদ (চাকসু মামুন)। এছাড়া সিলেট-৬ আসনে কৌশলগত কারণে বিএনপির দুজন মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। তারা হলেন এমরান আহমদ চৌধুরী এবং ফয়সল আহমদ চৌধুরী। শেষ পর্যন্ত তাদের মধ্যে একজনকে চূড়ান্ত করা হবে।
জামায়াতের প্রার্থী
সিলেট-১ আসনে জেলা আমির মাওলানা হাবিবুর রহমান, সিলেট-২ আসনে জেলা নায়েবে আমির আবদুল হান্নান, সিলেট-৩ আসনে দক্ষিণ সুরমা উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান লোকমান আহমদ, সিলেট-৪ আসনে জেলা সেক্রেটারি জয়নাল আবেদীন, সিলেট-৫ আসনে জেলা নায়েবে আমির আনওয়ার হোসাইন খান এবং সিলেট-৬ আসনে ঢাকা মহানগর উত্তরের আমির মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন জামায়াতের মনোনয়ন পেয়েছেন। তবে জোটের আসন বণ্টন চূড়ান্ত হলে জামায়াতের আসনের হিসাব পাল্টাতে পারে।
হলফনামায় দেওয়া তথ্যানুযায়ী বিএনপি, জামায়াত ও জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের ১৩ প্রার্থীর মধ্যে ৯ জন ব্যবসায়ী। বাকিদের মধ্যে তাহসিনা রুশদীর অবসরপ্রাপ্ত চাকরিজীবী, উবায়দুল্লাহ ফারুক শিক্ষক, এমরান আহমদ চৌধুরী আইনজীবী এবং এমএ মালিকের বর্তমানে কোনো পেশা নেই।
বিএনপির প্রার্থীদের মধ্যে সম্পদের দিক দিয়ে এগিয়ে আছেন খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। তার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ ৩৪ কোটি ৩৫ লাখ টাকা আর তার স্ত্রীর সম্পদ ১৪ কোটি ৫২ লাখ টাকা। গার্মেন্টসহ ৯টি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মালিক তার পরিবার। বিভিন্ন ব্যাংকে তাদের ৮৪০ কোটি টাকা ঋণ থাকলেও তারা খেলপি নন। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছেন সিলেট সিটির দুবারের সাবেক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী। তার ১৫ কোটি ২৬ লাখ ৬৭ হাজার ৮৮২ টাকার স্থাবর সম্পদ রয়েছে।
নির্বাচন কমিশনে দাখিল করা হলফনামা বিশ্লেষণে সিলেটের ছয়টি আসনে জামায়াতে ইসলামী মনোনীত সব প্রার্থীর পেশা ব্যবসা। তাদের মধ্যে পাঁচজন কোটিপতি।
আসনভিত্তিক হিসাব
সিলেট-১
এ আসনে সম্পদের দিক দিয়ে এগিয়ে আছেন বিএনপির প্রার্থী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। তার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ ৩৪ কোটি ৩৫ লাখ টাকা আর স্ত্রীর সম্পদের পরিমাণ ১৪ কোটি ৫২ লাখ ৩০ হাজার ৯০৩ টাকা। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির প্রার্থী আনোয়ার হোসেনের রয়েছে তিন কোটি ৮০ লাখ টাকা ও স্ত্রীর রয়েছে দুই কোটি ৮৬ লাখ টাকার সম্পদ। জামায়াতের প্রার্থী মাওলানা হাবিবুর রহমানের সম্পদের পরিমাণ এক কোটি ৭৪ লাখ টাকা। ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশের প্রার্থী শামীম মিয়ার সম্পদের পরিমাণ দুই কোটি ৩৪ লাখ টাকা। কোটি টাকার নিচে সম্পদ রয়েছে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (মার্কসবাদী) সঞ্জয় কান্ত দাস, গণঅধিকার পরিষদের আকমল হোসেন, খেলাফত মজলিসের তাজুল ইসলাম হাসান, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) প্রণব জ্যোতি পালের।
সিলেট-২
এ আসনের সাত প্রার্থীর মধ্যে চারজন কোটিপতি। এর মধ্যে সর্বোচ্চ সম্পদ বিএনপির প্রার্থী তাহসিনা রুশদীর। তার সম্পদের পরিমাণ দুই কোটি ৪০ লাখ টাকা। খেলাফত মজলিসের মুনতাসির আলীর দুই কোটি ১৫ লাখ টাকা, জামায়াতের আব্দুল হান্নানের এক কোটি ৬০ লাখ টাকা ও জাতীয় পার্টির মাহবুবুর রহমান চৌধুরীর রয়েছে এক কোটি পাঁচ লাখ টাকার সম্পদ। কোটি টাকার নিচে সম্পদ রয়েছে গণফোরামের মুজিবুল হক, ইসলামী আন্দোলনের আমির উদ্দিন এবং গণঅধিকার পরিষদের জামান আহমদ সিদ্দিকীর।
সিলেট-৩
এ আসনে সাত প্রার্থীর মধ্যে পাঁচজনই কোটিপতি। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি সম্পদ বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মুছলেহ উদ্দিন রাজুর। স্থাবর ও অস্থাবর মিলিয়ে তার সম্পদের পরিমাণ পাঁচ কোটি ৭৯ লাখ টাকা। বিএনপির আবদুল মালিকের (এমএ মালিক) চেয়ে তার যুক্তরাজ্য প্রবাসী স্ত্রীর সম্পদ বেশি। আবদুল মালিকের তিন কোটি ৪০ লাখ টাকা ও স্ত্রীর প্রায় ১০ কোটি ৬৫ লাখ টাকার সম্পদ রয়েছে। জামায়াতের লোকমান আহমদের সম্পদের পরিমাণ এক কোটি ৫৭ লাখ টাকা। খেলাফত মজলিসের দিলওয়ার হোসাইনের তিন কোটি ছয় লাখ টাকা ও স্ত্রীর নামে দেড় কোটি টাকার সম্পদ রয়েছে এবং জাতীয় পার্টির আতিকুর রহমানের চার কোটি ৬৬ লাখ টাকা ও স্ত্রীর নামে এক কোটি ৩৩ লাখ টাকার সম্পদ রয়েছে। কোটি টাকার নিচে সম্পদ রয়েছে যুক্তরাজ্য প্রবাসী এনসিপির নুরুল হুদা জুনেদ ও ইসলামী আন্দোলনের রেদওয়ানুল হক চৌধুরীর।
সিলেট-৪
এ আসনে ছয় প্রার্থীর মধ্যে অর্ধেকই কোটিপতি। এর মধ্যে বিএনপির প্রার্থী আরিফুল হক চৌধুরীর ১৯ কোটি ৬০ লাখ টাকা ও তার স্ত্রীর আট কোটি ৪৩ লাখ টাকার সম্পদ রয়েছে। জামায়াতের জয়নাল আবেদীনের এক কোটি ১৯ লাখ টাকার সম্পদ রয়েছে। এনসিপির রাশেদ উল আলম দুই কোটি ৭৫ লাখ টাকার মালিক। খেলাফত মজলিসের মুফতি আলী হাসান উসামার সম্পদ কোটি টাকার নিচে। জাতীয় পার্টির মুজিবুর রহমান ও গণঅধিকার পরিষদের জহিরুল ইসলামের সম্পদের হিসাব অংশ নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটে পাওয়া যায়নি।
সিলেট-৫
এ আসনের পাঁচ প্রার্থীর মধ্যে কোটিপতি দুজন। এর মধ্যে স্বতন্ত্র প্রার্থী (বিএনপির বিদ্রোহী) মামুনুর রশিদের এক কোটি ২২ লাখ টাকা ও জমিয়তের মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুকের এক কোটি টাকার সম্পদ রয়েছে। কোটি টাকার নিচে সম্পদ রয়েছে জামায়াতের হাফেজ মাওলানা আনওয়ার হোসেন খান, খেলাফত মজলিসের মুফতি আবুল হাসান ও মুসলিম লীগের বিল্লাল উদ্দিনের।
সিলেট-৬
আসনটিতে গণঅধিকার পরিষদের জাহিদুর রহমানের মোট সম্পদের পরিমাণ ৫২ কোটি ৭৪ লাখ টাকা। বিএনপির প্রার্থী এমরান আহমদ চৌধুরীর এক কোটি পাঁচ লাখ টাকা এবং বিএনপির ফয়সল আহমদ চৌধুরীর ১১ কোটি ১৬ লাখ টাকার সম্পদ রয়েছে। একই আসনে জামায়াতের সেলিম উদ্দিনের সম্পদের পরিমাণ এক কোটি ২৫ লাখ টাকা। পাঁচ প্রার্থীর মধ্যে একমাত্র জাতীয় পার্টির প্রার্থী আব্দুন নূরের সম্পদ কোটি টাকার নিচে।