মৌলভীবাজারের পর্যটন সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে ও ব্যবসাকে চাঙা করতে কমলগঞ্জ উপজেলার শমশেরনগরে বেসামরিক বিমানবন্দর স্থাপনের দাবি দীর্ঘদিনেও বাস্তবায়ন করা হচ্ছে না। সম্প্রতি শমশেরনগরে বিমানবন্দর স্থাপনের বিষয়টি নিয়ে জাতীয় সংসদেও আলোচনা হয়। এ ব্যাপারে সংসদে জরুরি নোটিস উত্থাপন করেন মৌলভীবাজার-৩ (সদর-রাজনগর) আসনের সংসদ সদস্য এম নাসের রহমান। গত রোববার বিকালে অনুষ্ঠিত সংসদের বৈঠকের কার্যসূচিতে বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত ছিল।
জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের লেজিসলেটিভ সাপোর্ট উইংয়ের আইন শাখা থেকে প্রকাশিত কার্যসূচি অনুযায়ী, জরুরি জনগুরুত্বসম্পন্ন বিষয়ে মনোযোগ আকর্ষণ (বিধি-৭১)-এর আওতায় নোটিসটি প্রদান করা হয়েছিল।
নোটিসে উল্লেখ করা হয়, মৌলভীবাজার জেলার পর্যটক এবং প্রবাসী ও ব্যবসায়ীদের সুবিধার্থে শমশেরনগরে অবস্থিত বিমান বাহিনীর ঘাঁটির একটি অংশ ব্যবহার করে একটি ছোট বেসামরিক বিমানবন্দর স্থাপন করা যেতে পারে। এ বিষয়ে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়।
জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সচিব ব্যারিস্টার গোলাম সরওয়ার ভূঁইয়া স্বাক্ষরিত কার্যসূচিতে বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছিল।
শমশেরনগর বিমানবন্দরটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ আমলে প্রায় ৮০০ একর জায়গাজুড়ে নির্মিত হয়। এর রানওয়ে প্রায় ছয় হাজার ফুট দীর্ঘ এবং প্রায় ৭৫ ফুট প্রস্থ । এটি বর্তমানে বিমান বাহিনী দ্বারা পরিচালিত এবং এখানে একটি রিক্রুট ট্রেনিং স্কুল রয়েছে। প্রবাসী ও স্থানীয়দের দাবি, কিছু অসাধু কর্মকর্তা ব্যক্তিস্বার্থে বিমানবন্দরটি চালু না করার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছেন। কারণ, চাকরির সুবাদে এসে এখানে তারা জমি কিনে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেছেন। এমনকি পারিবারিক সম্পর্কও তৈরি করেছেন। এখানকার চারদিকে ও পাশে রয়েছে প্রচুরে নার্সারি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, আনারস ও কাঁঠাল বাগান এবং ফিশারি। এগুলো লিজ দিয়ে প্রচুর পরিমাণে টাকা আয় হলেও সেগুলো বিমান বাহিনী বা সরকারের কাজে লাগে কি না সেটা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। তারা মনে করেন, দেশের অর্থনীতি এবং ওই এলাকার ব্যবসা-বাণিজ্য ও প্রবাসীদের
স্বার্থে শিগগির বিমানবন্দরটি চালু করা প্রয়োজন। এ বিষয়ে সামাজিকমাধ্যমেও জোর দাবি ও আলোচনা চলছে।
বিমান উড্ডয়নে ভারতের সীমানায় চলে যাওয়ার বিষয়ে অনেকেই বলেন, এটি একটি অজুহাত। ভারতীয় সীমানা শমশেরনগর থেকে ১৫ থেকে ১৮ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। কোনোভাবেই বিমানের সরাসরি ভারতীয় আকাশ সীমায় প্রবেশ করতে হয় না। বিমানবন্দরটির রানওয়ে উত্তর-দক্ষিণমুখী এবং সাধারণ বিমান দক্ষিণ দিক দিয়েই ওঠানামা করে। উড্ডয়নের পর বিমান শ্রীমঙ্গলের আকাশের দিকে অগ্রসর হয়, ভারতের দিকে নয়। সুতরাং ভারতের আকাশসীমার অজুহাত দেখিয়ে এ বিমানবন্দর অচল রাখা সম্পূর্ণ অযৌতিক বলেও জানান অনেকে।
মৌলভীবাজার-৩ আসনের সংসদ সদস্য এম নাসের রহমান পর্যটন জেলা মৌলভীবাজার এবং কমলগঞ্জ উপজেলার ঐতিহাসিক শমশেরনগর বিমানবন্দর নিয়ে আঞ্চলিক ও জাতীয় স্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য রাখায় তাকে আন্তরিক অভিনন্দন ও কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন প্রবাসীসহ জেলাবাসী।
সাবেক অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমানের ছেলে এম নাসের রহমান এমপি বিমানবন্দরের সঠিক তথ্য সংসদে তুলে ধরে এলাকাবাসীর দীর্ঘদিনের দাবি নতুনভাবে সামনে এনেছেন।
অন্যদিকে কয়েক দিন আগে সংসদ অধিবেশনে মৌলভীবাজার-৪ (শ্রীমঙ্গল-কমলগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য মুজিবুর রহমান চৌধুরী (হাজী মুজিব) শমশেরনগর বিমানবন্দর দ্রুত চালুর বিষয়ে জোরালো বক্তব্য দেন। সংসদে আলোচনায় অংশ নিয়ে সংসদ সদস্য এম নাসের রহমান কমলগঞ্জ উপজেলার শমশেরনগরে অবস্থিত বিমান বাহিনীর নিয়ন্ত্রণাধীন রানওয়েকে সীমিতভাবে বেসামরিক ব্যবহারের উপযোগী করার দাবি জানান। তার মতে, হাকালুকি হাওর, লাউয়াছড়া, মাধবকুণ্ড, চা-বাগান, মাধবপুর লেকসহ বিভিন্ন পর্যটন এলাকায় যাতায়াত সহজ করতে বিমানবন্দর চালু জরুরি।তিনি আরে বলেন, পাকিস্তান আমল থেকে ব্যবহৃত এ বিমানঘাঁটির অবকাঠামো থাকলেও স্বাধীনতার পর তা বেসামরিক ব্যবহারে আনা হয়নি। এতে এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক ও পর্যটন সম্ভাবনা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
জবাবে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম রিতা সংসদকে জানান, শমশেরনগর বিমানঘাঁটি বর্তমানে বিমান বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং সেখানে একাধিক সামরিক স্থাপনা ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চলমান। তিনি বলেন, বিমানবন্দরটির বাণিজ্যিক ব্যবহারযোগ্যতা যাচাইয়ে ফিজিবিলিটি স্টাডি চলছে।
মৌলভীবাজার চেম্বার অ্যান্ড কমার্স ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি হাসান আহমেদ জাবেদ জানান, মৌলভীবাজার জেলা হচ্ছে চায়ের রাজধানী ও পর্যটন জেলা। যাতায়াতের সমস্যার কারণে এখানকার ব্যবসা-বাণিজ্য থমকে দাঁড়িয়েছে। তিনি সংসদ সদস্যদের ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, বিমানবন্দরটি চালু হলে এখানকার ব্যবসা-বাণিজ্য চাঙা হবে।