রপ্তানির উদ্দেশ্যে বন্ড সুবিধায় আনা শুল্কমুক্ত কাঁচামাল অবৈধভাবে খোলাবাজারে বিক্রি, কম মূল্যে রপ্তানি দেখানো এবং মূসক (ভ্যাট) ফাঁকিসহ বিভিন্ন অনিয়মের মাধ্যমে ১০২ কোটি ৫৭ লাখ ১৩ হাজার ১২৮ টাকা ফাঁকি দিয়েছে রপ্তানিমুখী দুটি পোশাক প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান।
প্রতিষ্ঠান দুটি হলো—রিয়াজ নিটওয়্যার লিমিটেড এবং লিশা টেক্স (প্রা.) লিমিটেড। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল (সিআইসি) পৃথক অনুসন্ধান ও সরেজমিন অভিযানের মাধ্যমে এ বিশাল রাজস্ব ফাঁকির প্রমাণ পেয়েছে।
আজ সোমবার এনবিআর থেকে পাঠানো এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
রিয়াজ নিটওয়্যারে ৯৪ কোটি ৭৩ লাখ টাকার ফাঁকি
রিয়াজ নিটওয়্যার লিমিটেড ৪১টি ইউটিলাইজেশন ডিক্লারেশনের (ইউডি) মাধ্যমে বন্ড সুবিধায় ২ হাজার ৮৬২ টন ওভেন পলিয়েস্টার কাপড় আমদানি করেছিল। তবে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, আমদানি করা কাপড়ের প্রায় ৭৮ শতাংশ অর্থাৎ ২ হাজার ২৩৭ টন কাপড়ই কারখানার গুদামে নেই এবং রপ্তানির হিসাবেও তা পাওয়া যায়নি। বন্ডেড ওয়্যারহাউস থেকে এসব কাপড় অবৈধভাবে সরিয়ে খোলাবাজারে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে।
মজুত প্রায় শূন্য: সরেজমিন পরিদর্শনের সময় পুরো কারখানা প্রাঙ্গণে মাত্র ২৫,৫৩৩.৫০ কেজি ওভেন পলিয়েস্টার কাপড় পাওয়া গেছে, যা আমদানি করা মোট কাপড়ের ১ শতাংশেরও কম (মাত্র ০.৮৯ শতাংশ)। অথচ একই সময়ে কারখানায় ৬৯,৩৮২ কেজি সুতা এবং ৮ লাখ ৪৫ হাজার ৩৯৭ পিস তৈরি পোশাক মজুত ছিল।
রপ্তানির তথ্যে চরম গরমিল: প্রতিষ্ঠানটির ৩১টি ইউডিতে কোনো রপ্তানিই হয়নি, যার মধ্যে ৩০টিতেই আমদানি করা কাপড়ের পুরোটা অবৈধভাবে সরিয়ে ফেলা হয়েছে। এ ছাড়া আংশিক রপ্তানি দেখানো ১০টি এন্ট্রিতেও আমদানির প্রায় ৫৩ শতাংশ কাপড়ের কোনো হিসাব মেলেনি।
মিথ্যা দাবি ও আমদানির তথ্য: প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি লিখিত বিবৃতিতে দাবি করেছিলেন, বিগত এক মাসে এই ধরনের কাপড়ে কোনো পোশাক উৎপাদন বা রপ্তানি হয়নি। কিন্তু বিল অব এন্ট্রি পর্যালোচনায় দেখা যায়, কেবল সেপ্টেম্বর মাসেই এসব ইউডিতে প্রায় ৩৯০ টন কাপড় আমদানি করা হয়েছে। এ ছাড়া ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে অক্টোবরের শুরুর মধ্যেই মোট কাপড়ের প্রায় ৮২ শতাংশ আমদানি করা হয়।
ফাঁকির চূড়ান্ত হিসাব: রিয়াজ নিটওয়্যার লিমিটেডের অবৈধভাবে অপসারিত কাপড়ের শুল্কায়নযোগ্য মূল্য ছিল ১৩৪ কোটি ২৯ লাখ টাকা, যার বিপরীতে ৯৪ কোটি ৭৩ লাখ ৮৭ হাজার ৭২০ টাকা শুল্ক-কর ফাঁকি উদ্ঘাটন করা হয়েছে।
লিশা টেক্সের অনিয়ম ও ৭.৮৩ কোটি টাকার ফাঁকি
অপর প্রতিষ্ঠান লিশা টেক্স (প্রা.) লিমিটেডের ওয়্যারহাউস, কাটিং, সুইং ও ফিনিশিং সেকশনে পরিদর্শনের পর বাংলাদেশ ব্যাংক, অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড, বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর ডেটাবেজের তথ্য মিলিয়ে একাধিক অনিয়ম চিহ্নিত করেছে সিআইসি।
খোলাবাজারে কাপড় বিক্রি: বন্ড সুবিধায় আনা প্রায় ১ লাখ ৭৪ হাজার কেজি পলিয়েস্টার কাপড় কারখানায় না রেখে অবৈধভাবে খোলাবাজারে বিক্রি করা হয়, যার মাধ্যমে প্রায় ৬ কোটি ৯০ লাখ টাকা শুল্ক-কর ফাঁকি দেওয়া হয়েছে।
আন্ডার ইনভয়েসিং ও শর্তভঙ্গ: প্রতিষ্ঠানটি অনুমোদনের চেয়ে বেশি পোশাক রপ্তানি দেখালেও রপ্তানিমূল্য প্রদর্শন করেছে চুক্তিমূল্যের চেয়ে কম। পাশাপাশি ইউডির বাইরে স্থানীয় এলসির মাধ্যমে কাঁচামাল সংগ্রহ করা হয়েছে এবং বাধ্যতামূলক ২০ শতাংশ মূল্য সংযোজনের শর্ত পূরণ করা হয়নি।
কাঁচামাল ও সরবরাহে মূসক ফাঁকি: অনুমোদন ও মূসক দেওয়া ছাড়াই স্থানীয় বাজার থেকে ৪ লাখের বেশি পিস পোশাকের আনুষঙ্গিক কাঁচামাল কেনা হয়েছে। এ ছাড়া লাইসেন্সবিহীন একটি প্রতিষ্ঠানের কাছে ৩ কোটি ২৩ লাখ টাকার কিট ব্যাগ সরবরাহ করে মূসক ফাঁকি দেওয়া হয়েছে।
মোট ফাঁকি: এসব অনিয়মের মাধ্যমে লিশা টেক্স মোট ৭ কোটি ৮৩ লাখ ২৫ হাজার ৪০৮ টাকার রাজস্ব ফাঁকি দিয়েছে।