হোম > বাণিজ্য

রাজস্ব আদায়ে বড় লক্ষ্যমাত্রার পথে হাঁটছে এনবিআর

কাওসার আলম

অর্থনৈতিক বিভিন্ন সংকটের মধ্যেও রাজস্ব আহরণে বড় লক্ষ্যমাত্রার পথে হাঁটছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নে ধীরগতি, বিনিয়োগ মন্দা, রপ্তানিতে ভাটা এবং তীব্র কর্মসংস্থান সংকটের মধ্যে নতুন করে যুক্ত হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতিতে সৃষ্ট বিভিন্ন অনিশ্চয়তা। এর মধ্যেই আগামী অর্থবছরে (২০২৬-২৭) জিডিপির তুলনায় রাজস্ব আহরণ ৮ শতাংশে উন্নীত করতে চায় এনবিআর। রাজস্ব আদায়ে এমন লক্ষ্য সামনে রেখে কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করেছে সংস্থাটি। প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীরের কাছে পরিকল্পনাটি উপস্থাপন করেছে এনবিআর।

বর্তমানে জিডিপির অনুপাতে রাজস্ব আহরণের এ হার ৬ দশমিক ৬ শতাংশ। জিডিপির তুলনায় রাজস্ব আহরণে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় তলানিতে রয়েছে। রাজস্ব আহরণের হার বাড়াতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলেরও (আইএমএফ) চাপ রয়েছে। ঋণদাতা সংস্থাটির সঙ্গে ৪ দশমিক ৭০ বিলিয়ন ডলারের যে ঋণচুক্তি করেছিল সরকার, তার অন্যতম শর্ত রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি। বর্তমানে ঋণচুক্তির পরিমাণ সাড়ে পাঁচ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। এ পর্যন্ত পাঁচ কিস্তিতে ঋণের ৩ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার পেয়েছে বাংলাদেশ। ঋণ পাওয়ার শর্ত হিসেবে রিজার্ভ বৃদ্ধি ও বকেয়া পরিশোধে শর্তপূরণে সক্ষম হলেও রাজস্ব আহরণে সে লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে বাংলাদেশ। পরবর্তী কিস্তি ছাড়ে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা পূরণের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

এনবিআর কর্মকর্তারা বলছেন, আইএমএফের শর্তপূরণের জন্য নয়; আমাদের নিজস্ব প্রয়োজনে রাজস্ব আহরণ বাড়াতে হবে। দেশের উন্নয়নে রাজস্ব বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। বর্তমান নির্বাচিত সরকারের যেসব প্রতিশ্রুতি রয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়নে রাজস্বের জোগান বাড়াতে হবে এবং সে লক্ষ্যেই কাজ করছে এনবিআর।

এনবিআরের এক সদস্য আমার দেশকে বলেন, রাজস্ব বাড়ানোর জন্য প্রয়োজন একটি গতিশীল অর্থনীতির। কিন্তু বিভিন্ন কারণে সেটি কিছুটা স্থবির অবস্থায় রয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অর্থনৈতিক কাঠামোয়ও পরিবর্তন ঘটে। এডিপি বাস্তবায়নেও বড় ধরনের ধীরগতি তৈরি হয়েছে।

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এডিপি বাস্তবায়নের হার ছিল ৬৮ শতাংশের মতো, যা গত ২০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। চলতি অর্থবছরেও (২০২৫-২৬) এডিপি বাস্তবায়নে ধীরগতি বজায় রয়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে এডিপি বাস্তবায়ন হয়েছে মাত্র ২১ দশমিক ১৮ শতাংশ, যা গত ৯ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।

এনবিআর কর্মকর্তারা বলছেন, অর্থনীতির গতিশীলতার ওপর রাজস্ব আহরণের বিষয়টি নির্ভরশীল। ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ আক্রমণের শিকার হওয়ার পর ইরান মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা চালায়। এ যুদ্ধ পরিস্থিতিতে বিশ্ব নতুন এক অর্থনৈতিক সংকটের মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশেষ করে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি ও সরবরাহ সংকটের কারণে উৎপাদনব্যবস্থায় বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটতে পারে বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা। এ অবস্থায় রাজস্ব আহরণ কতটা বাস্তবায়ন হবে, তা নিয়ে শঙ্কা রয়েছে। তারপরও রাজস্ব আহরণে বড় লক্ষ্যমাত্রার দিকেই হাঁটছে এনবিআর।

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে জ্বালানি তেলের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ও সরবরাহ ঘাটতির কারণে অর্থনীতিতে বড় ধরনের সংকট তৈরি হলে সরকার রাজস্ব আহরণে বড় ধরনের হোঁচট খেতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

এ বিষয়ে এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল মজিদ আমার দেশকে বলেন, যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে শুধু বাংলাদেশেরই নয়, বিশ্ব অর্থনীতিতেই এর একটি প্রভাব পড়বে। বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেলের সংকট তৈরি হচ্ছে। এটি শুধু তেলের সংকটই নয়, এর সঙ্গে বিদ্যুৎ ও শিল্প উৎপাদন জড়িত। এ অবস্থা যদি বিরাজমান থাকে, তাহলে অর্থনীতির গতি কমে যাবে। ভোক্তার চাহিদা কমবে। এতে সরকারের রাজস্ব আহরণ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এ অবস্থায় সরকারকে ব্যয় সংকোচন নীতি গ্রহণ করতে হবে। তবে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য ফ্যামিলি কার্ডসহ যেসব বিশেষ সহায়তা রয়েছে, সেগুলো অব্যাহত রাখা জরুরি বলে মত দেন তিনি।

এনবিআর সদস্য (ভ্যাট বাস্তবায়ন ও নীতি) আজিজুর রহমান আমার দেশকে বলেন, সরকার বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক কাজ করছে। এ অবস্থায় সরকারের বড় ধরনের রাজস্ব প্রয়োজন। রাজস্ব বাড়ানোর জন্য করের আওতা বৃদ্ধি, মনিটরিং, বকেয়া আদায়, ফাঁকি রোধ, কমপ্লায়েন্স ঘাটতির মতো বিষয়গুলোর ওপর গুরুত্বারোপ করা হচ্ছে।

প্রশাসনিক ব্যবস্থার মাধ্যমে রাজস্ব বাড়ানোর এ প্রক্রিয়া কার্যকর করতে হলে অর্থনীতিতে চাহিদা তৈরি করতে হবে। এজন্য বিনিয়োগ বৃদ্ধির মাধ্যমে কর্মসংস্থান তৈরি করতে হবে বলে এনবিআর কর্মকর্তারা জানান।

এদিকে, বিভিন্ন খাতে কর অব্যাহতি সুবিধার কারণেও সরকারের রাজস্ব আয়ে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয় বলে এনবিআর কর্মকর্তারা জানান। আগামী বাজেটে কর অব্যাহতির ঢালাও সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে একটি যৌক্তিক কাঠামো তৈরি করার কথা বলছে রাজস্ব আহরণকারী সংস্থাটি। এজন্য বেশকিছু প্রস্তাবনাও তৈরি করেছে তারা। এরমধ্যে রয়েছে—নতুন করছাড়ের আগে অর্থনৈতিক প্রভাব বিশ্লেষণ, কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ বা রপ্তানি বৃদ্ধি না পেলে ছাড় বাতিল, বেইস ইরোশান অ্যান্ড প্রফিট শিফটিং (বিইপিএস) কাঠামো অনুযায়ী করছাড় পর্যালোচনা, স্থায়ী কর অব্যাহতির পরিবর্তে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য কর্মসংস্থান বা রপ্তানিভিত্তিক ছাড়।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে করছাড় সুবিধার পরিমাণ ছিল এক লাখ ৬০ হাজার কোটি টাকার বেশি। কোনো ধরনের যাচাই-বাছাই ছাড়াই করছাড়ের একটি রেওয়াজ চালু ছিল। বছরের পর বছর করছাড় সুবিধা ভোগ করলেও এর ফলে অর্থনীতিতে কী ধরনের প্রভাব কাজ করছে, তা নিয়ে তেমন কোনো পর্যালোচনা নেই। তবে বর্তমানে করছাড়ের বিষয়টি সংসদের ওপর ছেড়ে দিয়েছে এনবিআর।

কর্মকর্তারা জানান, আয়কর রিটার্ন, ভ্যাট রিটার্ন, আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমসহ বিভিন্ন সেবা এখন অনলাইনের মাধ্যমে সম্পন্ন করা যাচ্ছে। এতে হয়রানি ছাড়া সহজেই এসব সেবা গ্রহণ করছেন করদাতাসহ সংশ্লিষ্টরা। এর ফলে আগের তুলনায় করভীতি দূর হয়েছে। কিন্তু সব ধরনের আর্থিক লেনদেন ডিজিটাইজেশন না হওয়ার কারণে রাজস্ব আদায়ে একটি বড় ফাঁক রয়ে গেছে। এ সমস্যা সমাধানে বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় প্রায় এক হাজার কোটি টাকার একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে এনবিআর। এটি বাস্তবায়ন হলে কর ফাঁকির পরিমাণ অনেক কমে যাবে বলে আশা করছেন এনবিআর কর্মকর্তারা।

এনবিআর সূত্র জানায়, সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে আয়কর, ভ্যাট ও আমদানি শুল্ক বাবদ বিপুল অর্থ বকেয়া রয়েছে। এর মধ্যে পেট্রোবাংলার কাছে ২৫ হাজার কোটি টাকা, বিপিসির কাছে চার হাজার কোটি টাকা, সিভিল অ্যাভিয়েশনে চার হাজার কোটি টাকা বকেয়া রয়েছে। বিভিন্ন মামলার কারণেও আটকে আছে কয়েক হাজার কোটি টাকা। সব মিলিয়ে ৫০ হাজার কোটি টাকারও বেশি অর্থ আদায় করতে পারছে না এনবিআর।

বকেয়া রাজস্ব পরিশোধে সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে এনবিআরের পক্ষ থেকে বারবার তাগাদা দেওয়া হলেও তাতে সাড়া মিলছে না। ফলে বছরের পর বছর অনাদায়ী থাকছে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব। এদিকে মামলার কারণে যে পরিমাণ রাজস্ব আটকে রয়েছে, সেগুলো নিষ্পত্তিতে নতুন করে উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন এনবিআর কর্মকর্তারা।

রাজস্ব আহরণে লক্ষ্যপূরণে ব্যর্থ এনবিআর

রাজস্ব আহরণে প্রবৃদ্ধি হলেও লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যর্থ হচ্ছে এনবিআর। গত এক যুগেও লক্ষ্যমাত্রা ছুঁতে পারেনি রাজস্ব আদায়কারী সংস্থাটি। রাজস্ব আদায় করতে না পারায় লক্ষ্যমাত্রা সংশোধন করে কমিয়ে আনার পর সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের নজিরও খুব একটা নেই।

তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, বিগত অর্থবছরের শুরুতে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছিল চার লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু অর্থবছরের মাঝপথে কাটছাঁট করে সে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয় চার লাখ ৬৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। কিন্তু আদায় হয় তিন লাখ ৭০ হাজার ৮৭৪ কোটি টাকা। সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় আদায় কম হয়েছে ৯২ হাজার ৬২৬ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের (২০২৫-২৬) প্রথম সাত মাসে রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি ৬০ হাজার কোটি টাকারও বেশি। দুই লাখ ৮৩ হাজার ৭৫১ কোটি টাকার বিপরীতে আদায় হয়েছে দুই লাখ ২৩ হাজার ৬৩৮ কোটি টাকা। আদায় বাড়িয়ে লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে আয়কর, ভ্যাট ও কাস্টমস—তিনটি খাতে পৃথক টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে।

ভ্যাট আদায়ের টাস্কফোর্স ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছে জানিয়ে এনবিআরের এক সদস্য আমার দেশকে বলেন, প্রত্যেক কমিশনারেটে ৫০টি পণ্য ও ৫০টি সেবাকে গুরুত্ব দিয়ে ওই সব খাত থেকে ভ্যাট আদায়ে বিভিন্ন কৌশল নির্ধারণ করা হয়েছে।

কাস্টমসের উপকমিশনার পদমর্যাদার একজন প্রথম সচিব জানান, রাজস্ব আদায় বাড়াতে বকেয়া, নিরঙ্কুশ বকেয়া আদায়, ব্যাংক গ্যারান্টির নগদায়নসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গে বিশ্বব্যাংকের প্রতিনিধিদলের সৌজন্য সাক্ষাৎ

ব্যবসায়িক পরিবেশ উন্নয়নে কাজ করছে সরকার: বাণিজ্যমন্ত্রী

মুক্তিযুদ্ধে ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজের অসামান্য অবদান, পাচ্ছে স্বাধীনতা পুরস্কার

ক্রেডিট কার্ডের ঋণসীমা বাড়াল কেন্দ্রীয় ব্যাংক

জুলাই থেকে ১৪ মার্চ পর্যন্ত প্রবাসী আয় এলো ২৪৬৫ কোটি ডলার

৩৭৮ কনটেইনার পণ্য নিলামে তুলেছে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস

ই-ভ্যাট রিটার্ন জমার সময়সীমা বাড়াল এনবিআর

চলতি হিসাবে ঘাটতি কমেছে

‘শনিবারের অঙ্গীকার’ ক্যাম্পেইনে ডিএনসিসির পরিচ্ছন্নতা ও মশক নিধন অভিযান

নগদে রেমিটেন্স নিয়ে স্বর্ণের হার জিতলেন ফরিদপুরের বন্যা খাতুন