হোম > বাণিজ্য > ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান

পুনঃতফসিল ঋণের বড় অংশই শিল্প খাতের

রোহান রাজিব

খেলাপি ঋণ কমাতে পুনঃতফসিলের পথেই বেশি ঝুঁকছে ব্যাংকগুলো। তবে এতে খেলাপি ঋণ কমছে না। বরং পুনঃতফসিল করা ঋণের বড় একটি অংশ আবার খেলাপিতে পরিণত হচ্ছে। বর্তমানে ব্যাংক খাতে পুনঃতফসিল করা ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে চার লাখ ৪৬ হাজার ৮৯৪ কোটি টাকা। এর সবচেয়ে বড় অংশই শিল্প খাতের মেয়াদি ঋণ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ফাইন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি রিপোর্ট ২০২৫ অনুযায়ী, গত বছর পুনঃতফসিল করা ঋণের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ছিল শিল্প খাতের মেয়াদি ঋণ, যার অংশ ২৯ দশমিক ৫৬ শতাংশ। এরপর রয়েছে তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইল খাত, ১৭ দশমিক ৫৬ শতাংশ। শিল্প খাতের চলতি মূলধনের ঋণ ১৩ দশমিক ৫ শতাংশ, আমদানি ঋণ ১০ দশমিক ১৯ শতাংশ, বাণিজ্যিক ঋণ ৯ দশমিক ৯৬ শতাংশ, নির্মাণ খাত ৬ দশমিক ৪৮ শতাংশ, অন্যান্য খাত ৬ দশমিক ১৭ শতাংশ এবং কৃষি খাত ৩ দশমিক ১ শতাংশ।

সংশ্লিষ্টদের মতে, বড় শিল্পগোষ্ঠীর একটি অংশ রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাব খাটিয়ে পর্যাপ্ত জামানত ছাড়াই বিপুল পরিমাণ ঋণ নিয়েছে। এর একটি অংশ সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও ইচ্ছাকৃতভাবে পরিশোধ করা হয়নি। পাশাপাশি অর্থ পাচারের ঘটনাও ঘটেছে। অন্যদিকে গত কয়েক বছরে ডাউন পেমেন্টের হার দুই থেকে চার শতাংশে নামিয়ে এনে দীর্ঘমেয়াদে পুনঃতফসিলের সুযোগ দেওয়ায় অনেক বড় ঋণগ্রহীতার মধ্যে ঋণ পরিশোধে অনীহা তৈরি হয়েছে।

তারা বলেন, অনেক ক্ষেত্রে গ্রাহকের প্রকৃত ব্যবসা, আয় ও জামানতের যথাযথ মূল্যায়ন ছাড়াই ঋণ অনুমোদন করেছে ব্যাংকগুলো। পরে খেলাপি ঋণ কম দেখাতে বারবার পুনঃতফসিলের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এসব পুনঃতফসিল করা ঋণের প্রায় ৪০ শতাংশই আবার খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। এছাড়া রাজনৈতিক অস্থিরতা, গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট এবং ডলারের উচ্চমূল্যের কারণে তৈরি পোশাক ও বস্ত্রসহ উৎপাদনমুখী অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে শিল্প খাতেই সবচেয়ে বেশি ঋণ পুনঃতফসিল করতে হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে পুনঃতফসিল করা খেলাপি ঋণের পরিমাণ আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। গত বছর বিশেষ সুবিধার আওতায় এক লাখ ৭০ হাজার ৫০৩ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল করা হয়। আগের পুনঃতফসিল করা ঋণসহ বর্তমানে মোট পুনঃতফসিল ঋণের স্থিতি চার লাখ ৪৬ হাজার ৮৯৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৩৯ দশমিক ৮৭ শতাংশ ঋণ আবার খেলাপিতে পরিণত হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বছর শেষে পুনঃতফসিল করা ঋণের মধ্যে এক লাখ ৭৮ হাজার ১৬৪ কোটি টাকা আবার খেলাপির খাতায় উঠেছে। অন্যদিকে, নিয়মিত থাকা পুনঃতফসিল ঋণের পরিমাণ দুই লাখ ৬৮ হাজার ৭৩৩ কোটি টাকা, যা মোট পুনঃতফসিল ঋণের ৬০ দশমিক ১৩ শতাংশ।

গত পাঁচ বছরের মধ্যে ২০২৫ সালেই সবচেয়ে বেশি খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে পুনঃতফসিল করা হয় ২৬ হাজার ৮১০ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ। ২০২২ সালে ৬৩ হাজার ৭১৯ কোটি টাকা, ২০২৩ সালে ৯১ হাজার ২২১ কোটি টাকা, ২০২৪ সালে ৮৫ হাজার ৬৮৯ কোটি টাকা এবং ২০২৫ সালে এক লাখ ৭০ হাজার ৫০৩ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল করা হয়।

ব্যাংকভেদে পুনঃতফসিলের হিসাবেও বেসরকারি ব্যাংকের অংশ সবচেয়ে বেশি। গত বছর মোট পুনঃতফসিল করা ঋণের ৭৪ দশমিক ১৬ শতাংশ ছিল বেসরকারি ব্যাংকের। সরকারি ব্যাংকের অংশ ২৩ দশমিক ২৭ শতাংশ, বিশেষায়িত ব্যাংকের দুই দশমিক ২১ শতাংশ এবং বিদেশি ব্যাংকের মাত্র শূন্য দশমিক ৩৬ শতাংশ।

প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, বড় অঙ্কের ঋণই সবচেয়ে বেশি পুনঃতফসিল করা হয়েছে। মোট পুনঃতফসিল ঋণের ৭২ দশমিক ৩৮ শতাংশই বড় ঋণ। মাঝারি ঋণের অংশ আট দশমিক ৭৮ শতাংশ, ছোট ঋণ ছয় দশমিক ৭৬ শতাংশ, অতি ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের ঋণ এক দশমিক ৬ শতাংশ এবং অন্যান্য খাতের ঋণ ১০ দশমিক ৪৯ শতাংশ।

ব্যাংকাররা বলেন, পুনঃতফসিল অনেক প্রতিষ্ঠানকে সাময়িকভাবে চাপ থেকে বের হওয়ার সুযোগ দিলেও ঋণ নিয়মিত আদায় নিশ্চিত করা না গেলে খেলাপি ঋণের ঝুঁকি থেকেই যাবে। তাই পুনঃতফসিলের পাশাপাশি ব্যবসা পুনরুদ্ধার, উৎপাদন বৃদ্ধি এবং রপ্তানি সম্প্রসারণেও গুরুত্ব দিতে হবে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, পুনঃতফসিল ঋণের বড় অংশ বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের হাতে কেন্দ্রীভূত হওয়ায় ঋণ ব্যবস্থাপনায় আরো কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। একইসঙ্গে পুনঃতফসিলের সুবিধা যেন প্রকৃত সংকটে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যেই সীমিত থাকে, সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি।

ব্যাংক থেকে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৩৩ হাজার কোটি টাকা বেশি ঋণ সরকারের

ইসলামী ব্যাংকের ‘গ্রাহকসেবা মাস’ শুরু

ঋণখেলাপি থেকে বাঁচাতে সিটি গ্রুপকে বিশেষ সুবিধা

আজ বন্ধ থাকবে ব্যাংকের লেনদেন

বেসরকারি ঋণে লাগাম নতুন মুদ্রানীতিতে

সরকারি রাজস্ব ও অন্যান্য প্রাপ্তি জমায় বুধবার থেকে ‘এ-চালান’ বাধ্যতামূলক

নীতি সুদহার অপরিবর্তিত রেখে মুদ্রানীতি ঘোষণা

সুদ বাড়িয়েও মূল্যস্ফীতি পুরোপুরি কমানো যায়নি

ব্যাংক নোট কখন, কেন বাতিল করা হয়

খেলাপি ঋণ কমাতে বিশেষ এক্সিট সুবিধা, সুদ মওকুফে বড় ছাড়