সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি ঘোষণা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের
মূল্যস্ফীতি কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় না আসায় এবারের মুদ্রানীতিও সংকোচনমূলক রেখেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ফলে নীতি সুদহার ১০ শতাংশে অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। তবে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানো হয়েছে। সেই সঙ্গে বাজারে অর্থের জোগানও বাড়ানো হয়েছে, যা সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি বাস্তবায়ন নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন ও বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
গতকাল সোমবার বাংলাদেশ ব্যাংকের সভাকক্ষে গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর চলতি অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধের (জানুয়ারি-জুন) মুদ্রানীতি ঘোষণা করেন। সভাকক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে উদ্বোধনী বক্তব্য দেন ডেপুটি গভর্নর ড. মো. হাবিবুর রহমান। মুদ্রানীতির ওপর একটি উপস্থাপনা তুলে ধরেন তিনি। এ সময় তিন ডেপুটি গভর্নর, প্রধান অর্থনীতিবিদসহ বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
মুদ্রানীতি বিবৃতিতে বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমার লক্ষণ দেখা গেলেও চাপ এখনো পুরোপুরি কমেনি। বিদেশি পণ্যের দাম বাড়ার প্রভাব ঠেকাতে ডলারের বিপরীতে টাকার স্থিতিশীলতা বজায় রাখা খুব জরুরি। এখনই যদি তাড়াহুড়া করে সুদ কমানো হয়, তাহলে টাকার ওপর আবার চাপ তৈরি হতে পারে। এছাড়া সামনে আরো কিছু কারণে মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি রয়েছে। যেমন- আসন্ন সংসদ নির্বাচন, রমজান মাস এবং নতুন জাতীয় বেতন কাঠামো চালু হলে মানুষের ব্যয় বৃদ্ধি। এসব কারণ বিবেচনায় নিয়ে সতর্ক ও ভারসাম্যপূর্ণ মুদ্রানীতি বজায় রাখা জরুরি বলে জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
গভর্নর বলেন, মূল্যস্ফীতি সাত শতাংশে নামিয়ে আনা ছাড়া বাকি সূচকগুলোতে মুদ্রানীতি সফল হয়েছে। আমরা খুব ভালো করেছি, শুধু মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়েছি। আমরা আশাবাদী, এটাও কমবে। আমাদের অর্থনীতি সামনের দিনগুলোতে আরো ভালো করবে। তবে একটি লক্ষ্য পূরণ হয়নি বলে সব অর্জন অস্বীকার করা ঠিক নয়। তাই এই মুহূর্তে নীতি সুদহার কমানো হবে না।
নীতি সুদহার বেশি রাখার কারণে বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা সম্ভব হয়েছে দাবি করে তিনি বলেন, এর সুফল এখন পাওয়া যাচ্ছে। রেমিটেন্স ও বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ বাড়ছে।
নীতি সুদ অপরিবর্তিত
মূল্যস্ফীতি কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় না আসা পর্যন্ত নীতি সুদহার না কমানোর আভাস আগে থেকেই ছিল। সর্বশেষ জানুয়ারি মাসে পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট ভিত্তিতে সার্বিক মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে আট দশমিক ৫৮ শতাংশে, যা ডিসেম্বরে আট দশমিক ২৯ শতাংশ। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রভাব ও রোজার কারণে ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মাসে মূল্যস্ফীতি আরো বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ বিষয়টি মাথায় রেখেই নতুন মুদ্রানীতিতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। সে কারণে নীতি সুদহার ১০ শতাংশে অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে নীতি সুদহার ১০ শতাংশে অপরিবর্তিত রয়েছে। অন্যদিকে, স্ট্যান্ডিং ডিপোজিট ফ্যাসিলিটি (এসডিএফ) আট শতাংশ থেকে কমিয়ে সাড়ে সাত শতাংশ করেছে।
গভর্নর বলেন, মার্কেট বুস্ট করার জন্য এসডিএফ কমানো হয়েছে। মার্কেটে টাকার প্রবাহ বাড়বে। ভবিষ্যতে আরো কমানো হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক টাকা রাখার জায়গা না।
বেসরকারি ঋণ বাড়ানোর লক্ষ্য বাস্তবতা ভিন্ন
সংকোচনমূলক নীতি বজায় রেখেও নতুন মুদ্রানীতিতে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানো হয়েছে। আগামী জুন পর্যন্ত এ খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির প্রাক্কলন ধরা হয়েছে সাড়ে আট শতাংশ, যা আগের মুদ্রানীতিতে ছিল আট শতাংশ। তবে বাস্তব চিত্র ভিন্ন। গত ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ছয় দশমিক ১০ শতাংশ, যেখানে লক্ষ্যমাত্রা ছিল সাত দশমিক ২০ শতাংশ। উচ্চ সুদহার, পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধি এবং রাজনৈতিক ও নীতিগত অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের বড় একটি অংশ এখনো নতুন বিনিয়োগে সতর্ক।
তবে জাতীয় নির্বাচনের পর ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগে গতি আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। এই বিবেচনায় বেসরকারি ঋণপ্রবাহের লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানো হয়েছে। যদিও উচ্চ সুদের হার ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি একে অপরের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
এ বিষয়ে মুদ্রানীতি ঘোষণার শুরুতে ডেপুটি গভর্নর ড. হাবিবুর রহমান বলেন, রাজনৈতিকভাবে স্থিতিশীল সরকার গঠিত হলে বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা বাড়বে—এই প্রত্যাশা থেকেই ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য বাড়ানো হয়েছে।
সরকারি ঋণে লাগাম
সরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রেও লক্ষ্য ও বাস্তবতার মধ্যে বড় ব্যবধান দেখা যাচ্ছে। গত মুদ্রানীতিতে ডিসেম্বর পর্যন্ত সরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ছিল ২০ দশমিক ৫০ শতাংশ। কিন্তু বাস্তবে তা দাঁড়িয়েছে ২৮ দশমিক ৯০ শতাংশে। নতুন মুদ্রানীতিতে আগামী জুন পর্যন্ত এই প্রবৃদ্ধি ২১ দশমিক ৬০ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
গভর্নর বলেন, সরকার বেশি ঋণ নিলে বেসরকারি খাতে ঋণ কম যাবে, স্বাভাবিক। এখানে বণ্টনে সমস্যা রয়েছে। সরকারেও কিছু করার নেই, কারণ রাজস্ব আদায় সেভাবে বাড়ছে না।
অর্থের প্রবাহ আরো বাড়বে
গত ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাপক মুদ্রা সরবরাহের লক্ষ্যমাত্রা ছিল সাত দশমিক ৮০ শতাংশ, কিন্তু বাস্তবে তা বেড়ে ৯ দশমিক ৬০ শতাংশে পৌঁছায়। নতুন মুদ্রানীতিতে আগামী জুনে মুদ্রা সরবরাহ সাড়ে ১১ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এর অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে এসেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডলার কেনা। বাজার থেকে ৪৩০ কোটি ডলার কিনে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা বাজারে ছাড়তে হয়েছে, যা মুদ্রা সরবরাহ বাড়িয়েছে। এতে একদিকে রিজার্ভ শক্তিশালী হলেও অন্যদিকে মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি পুরোপুরি কাটেনি।
সংস্কার নিয়ে গভর্নরের আক্ষেপ
গভর্নর সংস্কার ইস্যুতে নিজের আক্ষেপের কথা তুলে ধরে জানান, গভর্নর হিসেবে এই সরকারের সময়ে তিনি পরিচালনাগত স্বাধীনতা ভোগ করেছেন এবং কোনো ধরনের চাপ অনুভব করেননি। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার, ব্যাংক কোম্পানি আইন ও অর্থঋণ আদালত আইন সংশোধনের প্রস্তাব বাস্তবায়ন না হওয়ায় হতাশা রয়ে গেছে।
তিনি বলেন, আমরা পরবর্তী সরকারের কাছে এ বিষয়টি উপস্থাপন করব। জাতির স্বার্থে হলেও এটি করা উচিত। এটি বাস্তবায়ন করতে না পারলে অতীতে যেভাবে ব্যাংক খাত অপব্যবহার ও লুটপাটের শিকার হয়েছিল, তা আবার ফিরে আসতে পারে। ব্যাংক কোম্পানি অর্ডার বাস্তবায়িত হলে রাজনৈতিক চাপ প্রতিহত করা সম্ভব হবে। রাজনীতিবিদরা স্বল্প মেয়াদে দ্রুত অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে চান, আর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়িত্ব হলো টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করা—যা আমরা যুক্তরাষ্ট্রের উদাহরণে দেখি। তাই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর কোনো ধরনের রাজনৈতিক চাপ যেন না আসে এবং অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা যেন নষ্ট না হয়।
তিনি আরো বলেন, শৃঙ্খলা এখনো পুরোপুরি আসেনি। কিন্তু সেটি ফিরে পাওয়ার পর যদি আবার হারিয়ে ফেলি, তাহলে তা হবে দুর্ভাগ্যজনক।
পরবর্তী সরকারের সময়ে সংস্কারকাজ এগিয়ে নিতে না পারলে তিনি দায়িত্বে থাকবেন কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে গভর্নর বলেন, সেটা তখন বোঝা যাবে। সেতুর কাছে গিয়ে বলা যাবে, সেতু পার হব কি না। তবে যে সরকারই আসুক, আর্থিক খাতের শৃঙ্খলা রক্ষায় রেখে কাজ করতে হবে।