হোম > বাণিজ্য > ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান

ব্যাংকের বিনিয়োগ সরকারমুখী

সৈয়দ মিজানুর রহমান ও রোহান রাজিব

আমার দেশ গ্রাফিক্স

এক সময় দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর আয়ের প্রধান উৎস ছিল শিল্প খাতে বিনিয়োগ। এখন সেই চিত্র পাল্টে গেছে। দেশের ভালো ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগের এখন প্রধান কেন্দ্র হয়ে উঠেছে সরকারের ট্রেজারি বিল ও বন্ড। ব্যাংকগুলো এ খাতে বিনিয়োগ করে বড় অঙ্কের মুনাফা করছে। ফলে ব্যাংকগুলোর অর্থায়নের বড় অংশ এখন উৎপাদনশীল খাতের বদলে সরকারি সিকিউরিটিজে চলে যাচ্ছে। এতে একদিকে যেমন বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমছে। অন্যদিকে নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান নিয়েও শঙ্কা তৈরি হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ব্যাংকগুলোকে নতুন ঋণ বৃদ্ধির নির্দেশন দিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান। সম্প্রতি ব্যাংকগুলোর সঙ্গে বৈঠকে তিনি এ নির্দেশনা দেন।

জানা গেছে, মার্চ শেষে ব্যাংকগুলোর মোট বিনিয়োগের ৯১ দশমিক ৩২ শতাংশ সরকারি সিকিউরিটিজে। যেখানে অন্য খাতে বিনিয়োগের পরিমাণ মাত্র আট দশমিক ৬৮ শতাংশ। মার্চ প্রান্তিকে সরকারি সিকিউরিটিজে ব্যাংকের বিনিয়োগ ১০ শতাংশ বৃদ্ধি পেলেও অন্যান্য খাতে শূন্য দশমিক ৮৩ শতাংশ কমেছে। অন্যদিকে এ সময় ব্যাংকগুলোর ঋণ প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র শূন্য দশমিক ৩৭ শতাংশ।

বাংলাদেশ স্টিল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি শেখ মাসাদুল আলম আমার দেশকে বলেন, বর্তমানে ব্যাংকগুলো নতুন ঋণ বিতরণে খুব একটা আগ্রহী নয়। তারা মূলত সরকারের ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ করছে এবং নতুন ঋণ দেওয়ার পরিবর্তে বিদ্যমান ঋণ আদায়ের দিকেই বেশি মনোযোগ দিচ্ছে। এতে শিল্প ও ব্যবসা খাত প্রয়োজনীয় অর্থায়ন থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

তিনি বলেন, গত পাঁচ থেকে ছয় বছর দেশে উল্লেখযোগ্য কোনো নতুন উন্নয়ন প্রকল্প নেওয়া হয়নি। আগে দেশের ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ উন্নয়ন কার্যক্রম সরকারের উদ্যোগে পরিচালিত হতো, যার ইতিবাচক প্রভাব বেসরকারি খাতেও পড়ত। কিন্তু উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে স্থবিরতা দেখা দেওয়ায় শিল্প ও ব্যবসায় মন্দাভাব সৃষ্টি হয়েছে। আবার ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের সময় ডলারের বিনিময় হার ৮০ টাকা থেকে বেড়ে ১২৫ টাকায় ওঠায় ব্যবসায়ীদের মূলধনের প্রায় ৪০ শতাংশ ক্ষয়ে গেছে।

নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তারা ঋণ নিচ্ছে না। কারণ তাদের বিনিয়োগ গ্যাস-বিদ্যুতের অভাবে ঝুঁকির মধ্যে পড়বে। শিল্পে বিনিয়োগ টানতে হলে আগে জ্বালানির নিশ্চয়তা দিতে হবে। তিতাস গ্যাসের বরাদ্দের ২৫ ভাগও শিল্প মালিকরা পাচ্ছে না। এমন অনিশ্চয়তা নিয়ে কেউ নতুন বিনিয়োগে আসবে না।

২০২৫ সালে ব্যাংকগুলোর মোট বিনিয়োগের ৬৭ দশমিক ৪৬ শতাংশ হয়েছে সরকারি সিকিউরিটিজে। আর বাকি ৩২ দশমিক ৫৩ শতাংশ গেছে অন্যান্য খাতে। গত বছর ব্যাংকগুলো ছয় লাখ কোটি টাকার বিনিয়োগ করেছে। এর মধ্যে সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল চার লাখ চার হাজার ৯৩১ কোটি টাকা, যা তার আগের বছরে ছিল দুই লাখ ৯৯ হাজার এক কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরে এ খাতে বিনিয়োগ বেড়েছে ৩৫ দশমিক ৫ শতাংশ। গত বছর অন্যান্য খাতে বা বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল এক লাখ ৯৫ হাজার ২৮০ কোটি টাকা। ২০২৪ সালে এ খাতে বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল এক লাখ ৮৩ হাজার ৮২ কোটি টাকা। অর্থাৎ এ খাতে বিনিয়োগ ১২ হাজার ১৯৮ কোটি টাকা কমেছে। ফলে বেসরকারি খাতের ‍ঋণ প্রবৃদ্ধি গত মে মাসে চার দশমিক ৯৮ শতাংশে নেমেছে, যা সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন। অন্যদিকে সরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ২০ দশমিক ৭৮ শতাংশ।

বিশেষ করে কয়েকটি বড় বেসরকারি ব্যাংক সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে। ব্র্যাক ব্যাংকের বিনিয়োগ এক বছরে ২০ হাজার ৪৩৫ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ৩২ হাজার ৬২৫ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। একই সময়ে সিটি ব্যাংকের বিনিয়োগ ১৩ হাজার ৪৩৫ কোটি টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ২০ হাজার ১২১ কোটি টাকা। এছাড়া পূবালী ব্যাংক, ইস্টার্ন ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক ও ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকও সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্য হারে বাড়িয়েছে।

ঋণ কার্যক্রম থেকে ব্যাংকগুলোর আয়ও কমেছে। ২০২৫ সালে ব্যাংকগুলো নিট সুদ আয়ে ১২ হাজার ৫৩৭ কোটি টাকার লোকসানে পড়েছে, যেখানে আগের বছর ২৯ হাজার ৩৯১ কোটি টাকা মুনাফা হয়েছিল। বিপরীতে ট্রেজারি কার্যক্রম ও বিনিয়োগ থেকে সুদবহির্ভূত আয় বেড়ে ৮৩ হাজার ১৭১ কোটি টাকায় উঠেছে, যা এক বছর আগে ছিল ৬৩ হাজার ৮৬১ কোটি টাকা। ফলে ঋণের পরিবর্তে বিনিয়োগনির্ভর আয়েই বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে ব্যাংকগুলো।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তফা কে মুজেরী বলেন, ব্যাংকের মৌলিক দায়িত্ব হলো জনগণের কাছ থেকে আমানত সংগ্রহ করে তা উৎপাদনশীল বেসরকারি খাতে ঋণ হিসেবে বিতরণ করা। এর মাধ্যমে শিল্প, ব্যবসা ও কর্মসংস্থান বাড়ে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত হয়। ব্যাংক মূলত স্বল্পমেয়াদি অর্থায়নের প্রতিষ্ঠান। দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের প্রধান উৎস হওয়া উচিত পুঁজিবাজার ও বন্ড মার্কেট। কারণ ব্যাংকের আমানতের বড় অংশই স্বল্পমেয়াদি হওয়ায় দীর্ঘ সময়ের জন্য অর্থ আটকে রাখা তাদের জন্য উপযুক্ত নয়।

তিনি বলেন, বর্তমানে সরকারের ঋণগ্রহণ বেড়ে যাওয়া এবং বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের চাহিদা কমে যাওয়ায় ব্যাংকগুলো সরকারি ট্রেজারি বিল ও ট্রেজারি বন্ডে বেশি বিনিয়োগ করছে। সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগে ঝুঁকি প্রায় নেই বললেই চলে এবং প্রায় আট শতাংশ হারে নিশ্চিত মুনাফা পাওয়া যায়। ফলে যেসব ব্যাংকের হাতে অতিরিক্ত তারল্য রয়েছে, তারা তুলনামূলক নিরাপদ এই খাতেই অর্থ বিনিয়োগ করছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) প্রকাশিত সাময়িক উপাত্ত অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিকে শিল্প উৎপাদন শূন্য দশমিক ২৮ শতাংশ কমেছে। অথচ এক বছর আগে একই সময়ে এই খাতে তিন দশমিক ৩৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছিল। ২০১৯-২০ অর্থবছরের এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে দেশব্যাপী কোভিড লকডাউনের সময় উৎপাদন ১৪ দশমিক ৯৪ শতাংশ কমে গিয়েছিল। এরপর সাম্প্রতিক এই সংকোচনের আগ পর্যন্ত পরবর্তী প্রান্তিকগুলোয় প্রবৃদ্ধি ইতিবাচক ছিল। মূলত জ্বালানি সংকট, দুর্বল রপ্তানি চাহিদা ও উচ্চ ব্যাংক ঋণের খরচের চাপে ধুঁকছে দেশের শিল্প খাত।

অন্যদিকে চলতি অর্থবছরে বাজেট ঘাটতি মেটাতে সরকার ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে এক লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করেছে। এ পরিস্থিতিতে ব্যাংকগুলোর সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগের প্রবণতা আরো বাড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

আশুলিয়ায় পোশাক কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে থাকবে বিজিএমইএ

চেয়ারম্যান বদলেছে, বদলায়নি ন্যাশনাল ব্যাংক

১১ খাতে অনলাইন ভ্যাট বাধ্যতামূলক করে এনবিআরের নতুন আদেশ

উৎসবমুখর পরিবেশে ‘বিজিএমইএ কাপ ২০২৬’-এর ট্রফি উন্মোচন

‘নতুন করে শিল্পে সরাসরি বিনিয়োগ নয়, বেসরকারি খাতকে আরো সক্রিয় করা হবে’

জ্বালানি সংকটে কোনো পোশাক কারখানা বন্ধ হয়নি: বিজিএমইএ সভাপতি

অবৈধ ঋণদাতা অ্যাপের পেমেন্ট সেবা বন্ধের নির্দেশ

সোনালীর প্রভাবে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের ঋণ প্রবৃদ্ধি ঋণাত্মক

১৪ মাস পর রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের

সঞ্চয়পত্রে চালু হলো অ্যাকাউন্ট ভেরিফিকেশন সিস্টেম