বাইন্যান্সে ডলার চুরির ঘটনায় ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেন প্ল্যাটফর্মগুলোর নিরাপত্তার ওপর বীমা কোম্পানিগুলোর নজরদারি আরো বেড়ে গেছে। গত ২৯ অক্টোবর বিশ্বের বৃহত্তম এই ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেন প্ল্যাটফর্ম থেকে ৬৩০ কোটি ডলার মূল্যের সম্পদ চুরির কোম্পানিগুলো এই নজরদারি বাড়িয়েছে। অপরদিকে, ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জ প্লাটফর্মগুলো দ্রুত তাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করার উদ্যোগ নিয়েছে। খবর রয়টার্সের।
বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, এখন থেকে কোনো প্রতিষ্ঠান নতুন বীমা নিতে বা বিদ্যমান পলিসি নবায়ন করতে গেলে বীমা কোম্পানিগুলো বাইন্যান্সের মতো আক্রমণের ঝুঁকিতে রয়েছে কি না খতিয়ে দেখবে। তবে কোম্পানিগুলো ক্রিপ্টো খাত থেকে পুরোপুরি সরে আসবে বা বীমা সুবিধা কমিয়ে দেবে—এমনটা মনে করার কারণ নেই। ক্রিপ্টো কোম্পানিগুলোর ওপর কঠোর নজরদারির মধ্যে বাইন্যান্সের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক ও দুর্বলতা নিবিড়ভাবে যাচাই করবে তারা।
উল্লেখ্য, শুরু থেকেই ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (এফবিআই) এই আক্রমণের জন্য উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে যুক্ত একটি গোষ্ঠীকে দায়ী করছে।
ক্রিপ্টো সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই আক্রমণ আড়াই ট্রিলিয়ন ডলারেরও বেশি মূল্যের দ্রুত বর্ধনশীল এই শিল্পে বিদ্যমান বীমা সুরক্ষার সীমাবদ্ধতাকে সামনে নিয়ে এসেছে। বাইন্যান্সের মতো বিশাল অঙ্কের ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার মতো কোনো বীমা ব্যবস্থা বর্তমানে নেই। তাছাড়া, অনেক বীমা পলিসিতেই রাষ্ট্র-সমর্থিত সাইবার আক্রমণের ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণ না দেওয়ার শর্ত থাকে।
গ্র্যান্ড ভিউ রিসার্চ-এর পূর্বাভাস অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী ক্রিপ্টো বীমা বাজারের আকার ২০২৬ সালের ১৩.৮ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ২০৩৩ সালে ১৯২.৭ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে।
গ্যালাঘার-এর আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডেভিড রজার্স বলেন, বীমা কোম্পানিগুলো এখন বাইন্যান্সকেন্দ্রিক সুনির্দিষ্ট কিছু প্রশ্ন করবে। তাদের প্রথম প্রশ্নটি হবে খুবই সহজ—বাইন্যান্সের সঙ্গে আপনাদের সম্পর্ক কী এবং সেখানে আপনাদের কোনো অর্থ জমা আছে কি না? আক্রমণের ঘটনায় ভুলগুলো সামনে এলে প্রশ্নগুলো আরো সুনির্দিষ্ট হবে, যা ভবিষ্যতে বীমা কোম্পানিগুলোর ঝুঁকি মূল্যায়নের ধরনেও পরিবর্তন আনতে পারে।
গেল সপ্তাহে প্রকাশিত বাইন্যান্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, হ্যাকাররা একটি ভুয়া চাকরির সাক্ষাৎকার এবং বিজ্ঞাপনের আড়ালে লুকানো সফটওয়্যার ব্যবহার করে বাইন্যান্সের দুজন সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারের কম্পিউটার হ্যাক করে। এরপর তৃতীয় আরেকটি কম্পিউটার ব্যবহার করে তারা ৬৩০ কোটি ডলার মূল্যের ক্রিপ্টো হাতিয়ে নেয়।
বাইন্যান্সে জানিয়েছে, হ্যাকিংয়ের এই প্রক্রিয়াটি ছিল বহু-পর্যায়ের। জুন মাসে শুরু হওয়া এই প্রক্রিয়ায় একের পর এক নিরাপত্তা লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটে, যার চূড়ান্ত পরিণতি ছিল এই বিশাল চুরি।
নির্বাহীরা জানিয়েছেন, তাদের বীমার প্রভাবগুলো সম্ভবত পরবর্তী নবায়নের সময় স্পষ্ট হয়ে উঠবে। পলিসিগুলো সাধারণত এক বছরের জন্য কার্যকর থাকে, যা বীমা প্রদানকারীদের মেয়াদ বাড়ানোর আগে ঝুঁকিগুলো পুনরায় মূল্যায়ন, হালনাগাদ তথ্য চাওয়া এবং নতুন নিরাপত্তা শর্ত আরোপ করার সুযোগ করে দেয়।
মার্শ-এর আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের প্রধান জ্যাকলিন কুইন্টাল জানান, বিমার সক্ষমতা, মূল্য নির্ধারণ বা কভারেজের ক্ষেত্রে বড় কোনো পরিবর্তনের সম্ভাবনা নেই। তবে ভবিষ্যতে একই ধরনের সাইবার আক্রমণের ঝুঁকিতে আছে কি নাÑএমন প্রশ্ন বিমা কোম্পানিগুলো গ্রাহকদের কাছে করতে পারে। কারণ কেউ নিশ্চয়ই কোনো ক্রিপ্টো ঝুঁকির বীমা নবায়ন বা নতুন বীমা করার এক সপ্তাহের মধ্যেই একই ধরনের ঘটনার মুখোমুখি হতে চাইবে না।
এই যাচাই-বাছাই কেবল সাধারণ সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থার মূল্যায়নের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং বাইন্যান্স তদন্তে বেরিয়ে আসা সুনির্দিষ্ট দুর্বলতাগুলোর দিকেও নজর দেওয়া হবে। বিমা নবায়নের সময় বিমা কোম্পানিগুলো অন্য কোথাও একই ধরনের দুর্বলতার বিষয়টি নিশ্চিত হতে চাইবে।
লন্ডনভিত্তিক রিড স্মিথ ‘ল’ ফার্মের বীমাবিষয়ক আইনজীবী পিটার হার্ডি বলেন, যদি বাইন্যান্স হ্যাকিংয়ের তদন্তে তাদের নিরাপত্তায় কোনো সুনির্দিষ্ট দুর্বলতা ধরা পড়লে অন্যান্য বিমী গ্রহীতাদের ক্ষেত্রেও বিমা কোম্পানিগুলো সেই দুর্বলতা বা ত্রুটি দূর করার শর্ত জুড়ে দিতে পারে।
মার্কিন ও দক্ষিণ কোরিয়ার কর্তৃপক্ষ এবং সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, উত্তর কোরিয়া বহু বছর ধরে রাষ্ট্রীয় মদতপুষ্ট সাইবার ইউনিটগুলোকে গুপ্তচরবৃত্তি ও অর্থ চুরির কাজে ব্যবহার করে আসছে। অবশ্য পিয়ংইয়ং এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
মর্নিংস্টার ডিবিআরএস-এর গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইনস্টিটিউশন রেটিং বিভাগের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মার্কোস আলভারেজ জানান, উত্তর কোরিয়ার সম্পৃক্ততা থাকলে বীমা দাবি নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া জটিল হয়ে পড়তে পারে। কারণ, ২০২৩ সাল থেকে লয়েডস-এর সাইবার বিমা পলিসিগুলোতে সাধারণত রাষ্ট্রীয় মদতপুষ্ট সাইবার আক্রমণকে বীমার আওতামুক্ত রাখা হয়েছে। এছাড়া বাইন্যান্সের ক্ষতির পরিমাণ বর্তমানে বাজারে বিদ্যমান যেকোনো বিমা পলিসির সর্বোচ্চ কভারেজ সীমার চেয়েও বেশি।
তিনি বলেন, যদি কোনো রাষ্ট্রের দ্বারা আক্রমণ পরিচালিত বলে গণ্য হয়, তবে বীমা কোম্পানিগুলো দাবিকৃত ক্ষতিপূরণ নিয়ে আপত্তি জানাতে পারে। ভূ-রাজনৈতিক কারণে সৃষ্ট বড় ধরনের ক্ষতির ক্ষেত্রে এই ধরনের শর্তাবলি কতটা কার্যকর হবে, তা এখনো পরীক্ষিত নয়।