বাংলাদেশে বছরে প্রায় ২৫ লাখ টন ভোজ্যতেলের চাহিদার ৯০ শতাংশই মেটাতে হচ্ছে আমদানি করা সয়াবিন ও পাম তেল দিয়ে, যা প্রতিবছর দেশের বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা শুষে নিচ্ছে। দেশে আজ অবধি যতরকমের ভোজ্যতেল ব্যবহার করা হচ্ছে, তার কাঁচামালের কোনোটিতেই বাংলাদেশ স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। তবে দেশে উৎপাদিত ধানের কুঁড়া থেকে বছরে প্রায় সাড়ে সাত লাখ টন স্বাস্থ্যকর ‘রাইস ব্র্যান অয়েল’ উৎপাদনের সুবর্ণ সুযোগ থাকা সত্ত্বেও দেড় দশকেও তা সাধারণ মানুষের রান্নাঘরে স্থায়ী জায়গা করে নিতে পারেনি। এর বিপরীতে সয়াবিন তেল এক অপরিহার্য উপাদান হয়ে উঠেছে। সকালের নাস্তা থেকে শুরু করে রাতের ডিনার—সবকিছুতেই এর অবাধ ব্যবহার।
বাজারে বহুল ব্যবহৃত ডাবল রিফাইনড বা ফর্টিফাইড সয়াবিন তেলের মান ও স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে আছে অনেক ধরনের প্রশ্ন। ফলে দেশি কাঁচামালের বিপুল সম্ভাবনা কাজে না লাগিয়ে প্রতি বছর বড় অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করে আমদানিনির্ভর হয়েই মেটাতে হচ্ছে ভোজ্যতেলের চাহিদা। খাত-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে রাইস ব্র্যান অয়েল উৎপাদনের সক্ষমতা থাকলেও স্থানীয় বাজারে সরবরাহ হচ্ছে খুবই কম। ফলে একদিকে কারখানাগুলোর বড় অংশের সক্ষমতা অব্যবহৃত থাকছে, অন্যদিকে ভোক্তার রান্নাঘরেও পণ্যটি সহজলভ্য হচ্ছে না।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী দেশে বছরে প্রায় ২৫ লাখ টন ভোজ্যতেল প্রয়োজন হয়। এর প্রায় ৯০ শতাংশ আসে আমদানি করা অপরিশোধিত সয়াবিন ও পাম তেল পরিশোধনের মাধ্যমে। রাইস ব্র্যানসহ দেশি উৎসের তেলের অংশ তুলনামূলকভাবে অনেক কম।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) খানা আয়-ব্যয় জরিপের তথ্যমতে, ২০২২ সালে মাথাপিছু ভোজ্যতেল গ্রহণের হার ছিল দিনে প্রায় ৩১ গ্রাম, যা ২০১৬ সালে ছিল প্রায় ২৭ গ্রাম। ফলে দেখা যাচ্ছে, প্রতিবছর মানুষের মধ্যে ভোজ্যতেল গ্রহণ বাড়ছে।
সাম্প্রতিক আমদানি তথ্যও এই চিত্র স্পষ্ট করে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, সদ্যবিদায়ী অর্থবছরে ২২ লাখ ২৩ হাজার টন সয়াবিন ও পাম তেল আমদানিতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৩০ হাজার ৪৪০ কোটি টাকা। শুল্ক, মূল্য সংযোজন কর ও অন্যান্য খরচ যুক্ত করলে মোট আমদানি মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকায়। অন্যদিকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ২৪ লাখ ৫০ হাজার টন সয়াবিন ও পাম তেল আমদানিতে ব্যয় হয়েছিল প্রায় ৩১ হাজার ৯০৪ কোটি টাকা। শুল্ক ও ভ্যাটসহ মোট ব্যয় ছিল প্রায় ৩৪ হাজার ৮৯৬ কোটি টাকা।
গবেষণায় প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, ধানের কুঁড়া থেকে তৈরি রাইস ব্র্যান অয়েল বর্তমান বিশ্বের অন্যতম নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর ভোজ্যতেল। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিওএইচও) এবং আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনের (এএইচএ) নির্ধারিত মানদণ্ড অনুযায়ী এতে স্যাচুরেটেড, মনো-আনস্যাচুরেটেড ও পলি-আনস্যাচুরেটেড ফ্যাটের ভারসাম্য বজায় থাকে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে নিউট্রাসিউটিক্যাল বা ‘ওষুধের বিকল্প খাদ্য’ হিসেবে বিবেচিত এই তেলে ট্রান্সফ্যাট না থাকায় এবং প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন-ই কমপ্লেক্স, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও গামা-ওরিজানল যুক্ত থাকায় এটি রক্তে ক্ষতিকর কোলেস্টেরল কমিয়ে হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়, ফ্রি-রেডিকেলের বিরুদ্ধে লড়াই করে এবং শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা উন্নত করতে সাহায্য করে। বাংলাদেশ শিল্প ও বিজ্ঞান গবেষণা পরিষদের (বিসিএসআইআর) তথ্যমতে, অলিভ অয়েলের পরই এই তেলের পুষ্টিগুণ সবচেয়ে বেশি। এছাড়া নিউ ইয়র্কের রোচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাতেও ক্যানসার প্রতিরোধ ও মেদ নিয়ন্ত্রণে রাইস ব্র্যান অয়েলের বিশেষ ভূমিকার বিষয়টি উঠে এসেছে। অ্যালার্জিমুক্ত ও হালকা স্বাদের এ তেলে রান্নার সময় অন্যান্য তেলের তুলনায় ২০ শতাংশ কম শোষণ ঘটে, যার ফলে খাবার কম ক্যালরিযুক্ত হয়।
সরকারি ক্রয় বাড়ছে
সরকারি পর্যায়ে রাইস ব্র্যান অয়েলের চাহিদা বাড়ছে। চলতি বছর সরকার ও টিসিবির জন্য একাধিক দফায় এ তেল কেনার সিদ্ধান্ত হয়েছে। মে মাসে সরকারি ক্রয় কমিটি এক কোটি লিটার পরিশোধিত রাইস ব্র্যান অয়েল কেনার অনুমোদন দেয়। এর ব্যয় ধরা হয় ১৭৯ কোটি ৫০ লাখ টাকা। এর আগে মার্চে আরো বড় পরিমাণ কেনার অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল।
জুলাইয়ের এক প্রতিবেদনে এক কোটি ৮০ লাখ লিটার রাইস ব্র্যান অয়েল সংগ্রহের সরকারি সিদ্ধান্তের তথ্যও প্রকাশিত হয়েছে। সরকারি ক্রয়ের এই প্রবণতা দেখাচ্ছে পণ্যটির একটি নিশ্চিত বাজার রয়েছে। কিন্তু সাধারণ ভোক্তার দৈনন্দিন বাজারে স্থায়ী চাহিদা তৈরি না হওয়ায় উৎপাদকরা বড় পরিসরে উৎপাদনে ঝুঁকি নিতে পারছেন না।
মানুষ কী খাচ্ছে
বর্তমান খাদ্যাভ্যাসে সয়াবিন তেল রান্নাঘরের নিত্যপ্রয়োজনীয় উপকরণে পরিণত হয়েছে। দিনের শুরুতে নাশতা থেকে শুরু করে দুপুর ও রাতের প্রায় প্রতিটি রান্নাতেই ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে এই তেল। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্যাকেটজাত অধিকাংশ সয়াবিন তেলই ‘ডাবল রিফাইনড’ বা ‘ফর্টিফাইড’। এগুলো দেখতে অনেক বেশি স্বচ্ছ ও পাতলা। তেল যত বেশি স্বচ্ছ হবে, তাতে রাসায়নিক প্রক্রিয়াজাতকরণ তত বেশি হচ্ছে। প্রাকৃতিক তেল সাধারণত একটু গাঢ় ও গন্ধযুক্ত হয়। সম্প্রতি প্রকাশিত আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গবেষণার তথ্যানুযায়ী, সয়াবিন তেলের অতিরিক্ত ও অসচেতন ব্যবহার জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করছে। যার অন্যতম প্রধান কারণ এতে নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে বহুগুণ বেশি ক্ষতিকর ট্রান্সফ্যাটের উপস্থিতি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের ২০২১ সালের গবেষণায় দেখা যায়, বাজারের বিভিন্ন কোম্পানির বোতলজাত সয়াবিন তেলের প্রায় ৬৭ শতাংশ নমুনায় সহনীয় মাত্রার চেয়ে বেশি ট্রান্সফ্যাটি অ্যাসিড আছে। এ বিষয়ে গবেষণা দলের প্রধান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক নাজমা শাহিন (এলপিআর) আমার দেশকে বলেন, গবেষণায় দেশের বাজারে পাওয়া সয়াবিন তেলের মান নিয়ে উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে, যা দীর্ঘমেয়াদে জনস্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) নির্দেশনার আলোকে সরকার ভোজ্যতেলে ক্ষতিকর ট্রান্সফ্যাটের সর্বোচ্চ সহনীয় মাত্রা নির্ধারণ করেছে। উৎপাদনের সময় নজরদারি ও তদারকি জোরদার করলে ভোজ্যতেলে ট্রান্সফ্যাটের মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ ২০২১ সালে খাদ্যদ্রব্যে ‘ট্রান্সফ্যাটি অ্যাসিড নিয়ন্ত্রণ প্রবিধানমালা’ প্রণয়ন করে, যা ২০২২ সালের ৩১ ডিসেম্বর থেকে কার্যকর হয়। এই প্রবিধানমালা অনুযায়ী খাদ্যে ট্রান্সফ্যাটের সর্বোচ্চ সীমা দুই শতাংশ নির্ধারণ করা হলেও সাম্প্রতিক গবেষণায় সয়াবিন তেলের নমুনায় এ মাত্রার চেয়ে দুই থেকে চারগুণ বেশি ট্রান্সফ্যাট পাওয়া গেছে। এছাড়া সয়াবিন তেল শোধনের প্রক্রিয়াগত ত্রুটি এবং বাসাবাড়ি বা রেস্তোরাঁয় বারবার একই তেল গরম করে ভাজাপোড়ার কাজে (পোড়া তেল) ব্যবহারের ফলে এই ক্ষতিকর উপাদানের মাত্রা আরো আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যায়।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ট্রান্সফ্যাট হলো চর্বির এমন এক ক্ষতিকর রূপÑযা রক্তের উপকারী বা ভালো কোলেস্টেরলের (এইচডিএল) মাত্রা আশঙ্কাজনকভাবে কমিয়ে দেয় এবং একইসঙ্গে ক্ষতিকর বা খারাপ কোলেস্টেরলের (এলডিএল) মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। রক্তে এই খারাপ কোলেস্টেরল জমা হয়ে রক্তনালীকে ব্লক করে দেয়, যা সরাসরি কার্ডিওভাসকুলার জটিলতা সৃষ্টি করে।
হৃদরোগের পরিসংখ্যান ও মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) এক জরিপের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালে দেশে প্রায় দুই লাখ ২৪ হাজার মানুষ হৃদরোগে (হার্ট অ্যাটাক ও অন্যান্য হার্ট ডিজিজ) আক্রান্ত হয়ে মারা যান। বর্তমানে দেশে অকাল মৃত্যুর সবচেয়ে বড় একক কারণ হলো হৃদরোগ, আর সয়াবিন তেলে অতিরিক্ত ট্রান্সফ্যাটের উপস্থিতি এর অন্যতম প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে। যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব হেলথ ম্যাট্রিক্স অ্যান্ড ইভালুয়েশন তাদের হিসাবে বাংলাদেশে প্রতিবছর দুই লাখ পাঁচ হাজারের বেশি মানুষ হৃদরোগে মারা যান। অর্থাৎ, দৈনিক ৫৬২ জনের মৃত্যু হচ্ছে হৃদরোগে। সয়াবিন তেল পরিশোধন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং একাধিকবার একই তেল ব্যবহারের প্রবণতা বন্ধ করা না গেলে হৃদরোগের এ মারাত্মক ঝুঁকি কমানো সম্ভব নয় বলে গবেষকরা সতর্ক করেছেন।
আমদানিনির্ভরতা কমানোর সুযোগ
দেশের ভোজ্যতেলের বাজারে আমদানির পরিমাণ কমাতে রাইস ব্র্যান অয়েল গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প হতে পারে। কারণ, এর প্রধান কাঁচামাল দেশেই উৎপাদিত ধানের উপজাত। ফলে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ কমানোর পাশাপাশি চালকল, কৃষক ও স্থানীয় শিল্পের জন্যও অতিরিক্ত মূল্য সংযোজনের সুযোগ তৈরি হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রাইস ব্র্যান অয়েলের সম্ভাবনা বাস্তবে কাজে লাগাতে হলে প্রথমে কাঁচামাল সংগ্রহের কার্যকর নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে হবে। এরপর কারখানার সক্ষমতা ব্যবহার, উৎপাদন ব্যয় কমানো, ছোট প্যাকের সরবরাহ বাড়ানো এবং খুচরো বাজারে সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা দরকার। তাদের মতে, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ভোক্তার আস্থা অর্জন।
রাইস ব্র্যান অয়েল স্বাস্থ্যকর—এমন প্রচারের পাশাপাশি বৈজ্ঞানিক ও যাচাইযোগ্য তথ্য দিতে হবে। কোনো তেলকে অযথা ‘সবচেয়ে ভালো’ কিংবা অন্যটিকে ‘ক্ষতিকর’ হিসেবে উপস্থাপন না করে পুষ্টি ও ব্যবহারের সঠিক তথ্য পরিষ্কারভাবে তুলে ধরতে হবে। কারণ, দেশের কয়েক কোটি মানুষের রান্নাঘরের তেলের প্রশ্নটি শুধু একটি শিল্পের বাজার তৈরির বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িত খাদ্যনিরাপত্তা, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়, কৃষি উপজাতের ব্যবহার; সর্বোপরি ভোক্তার আস্থা।