হোম > বাণিজ্য > বাজার বিশ্লেষণ

কোরবানির মসলার বাজারেও জ্বালানি সংকটের অজুহাত

সোহাগ কুমার বিশ্বাস, চট্টগ্রাম

ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদ সামনে রেখে প্রতিবছরের মতো এবারও মসলাজাতীয় পণ্যের চাহিদা বেড়েছে। ব্যবসায়ীরা আগাম প্রস্তুতি হিসেবে বিপুল পরিমাণ মসলা আমদানি করেছেন, পাশাপাশি দেশীয় উৎপাদনও হয়েছে সন্তোষজনক। এতে বাজার স্থিতিশীল থাকবে—এমন প্রত্যাশা ছিল সংশ্লিষ্টদের।

তবে বাস্তবে দেখা যাচ্ছে ভিন্ন চিত্র। দেশের অন্যতম বৃহৎ পাইকারি বাজার চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জে মসলার দাম ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে থাকলেও খুচরা বাজারে হঠাৎ করেই দাম বেড়ে গেছে। খুচরা ব্যবসায়ীদের দাবি, জ্বালানি সংকটের কারণে পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় এ দামের পার্থক্য তৈরি হয়েছে। একই অজুহাতে ঈদের আগে আরেক দফায় বাড়তে পারে মসলার দামÑএমন শঙ্কাও করছেন ব্যবসায়ীরা।

বৃহস্পতিবার খাতুনগঞ্জের একাধিক আড়ত ঘুরে জানা গেছে, গত দুই মাস ধরে অধিকাংশ মসলার দাম স্থিতিশীল রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল, তা এখন অনেকটাই কমেছে। ফলে পাইকারি বাজারে দাম বাড়ার তেমন কোনো যৌক্তিক কারণ নেই।

তবে খুচরা বাজারে পরিস্থিতি ভিন্ন। খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে দেশের বেশ কয়েকটি বাজারে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে পাইকারি ও খুচরা বাজারের মধ্যে দামের ব্যবধান স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি। ব্যবসায়ীরা বলছেন, জ্বালানি সংকটের কারণে পরিবহন খরচ কয়েকগুণ বেড়ে যাওয়ায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, যার চাপ পড়ছে ভোক্তাদের ওপর।

খাতুনগঞ্জের আড়তদাররা বলছেন, ফেব্রুয়ারি মাসের শেষে, এমনকি মার্চের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত রাজশাহী, পাবনা, কুষ্টিয়া থেকে প্রতি ট্রাক পেঁয়াজ চট্টগ্রামে আনতে ২৪ থেকে ২৬ হাজার টাকা লাগত। বর্তমানে এই ভাড়া বেড়ে ৪৫ হাজার টাকায় ঠেকেছে। মূলত জ্বালানি সংকটের কারণে পরিবহনের খরচ বেড়ে যাওয়ায় পণ্যের দামে প্রভাব পড়ছে। আগে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে উৎপাদন এলাকা থেকে চট্টগ্রামে পেঁয়াজ, শুকনো মরিচের মতো পণ্য সরবরাহ দেওয়া সম্ভব হলেও বর্তমানে দেড় থেকে দুদিন পর্যন্ত সময় লাগছে। এ কারণে পরিবহন মালিকরা যানবাহনের ভাড়া বাড়িয়ে দিয়েছেন।

জানা গেছে, গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে পাইকারি বাজারে পেঁয়াজের দাম কেজিতে দু-তিন টাকা করে বেড়েছে। রসুনের দাম কেজিপ্রতি ১০ থেকে ১২ টাকা, আস্ত ধনিয়া কেজিপ্রতি ১০-১৫ টাকা বেড়েছে । তবে অধিকাংশ মসলার দাম বর্তমানে নিম্নমুখী।

যদিও দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলার পাইকারি ও খুচরা বাজারগুলোতে পচনশীল ও শুকনো গরম মসলা বাড়তি দামেই বিক্রি করছেন ব্যবসায়ীরা।

খাতুনগঞ্জের মেসার্স আলমাস ট্রেডিংয়ের মালিক আলমাস উদ্দিন জানান, পেঁয়াজের বাজার আগের মতোই স্থিতিশীল রয়েছে। পরিবহন খরচ দ্বিগুণের কাছাকাছি বেড়ে গেলেও পেঁয়াজের কেজিপ্রতি দাম বেড়েছে দু-তিন টাকা। এটা এত বেশি নয়। অনেক ব্যাপারীই আড়তে পেঁয়াজ পাঠিয়ে লোকসান গুনছেন। উৎপাদন এলাকার আড়ত ও পাইকারি বাজারে দাম না বাড়লেও খুচরা পর্যায়ে দাম বেড়েছে পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ার কারণে। জ্বালানি পরিস্থিতি ও যানবাহনের ভাড়া আরো বাড়তে থাকলে কোরবানির ঈদের আগে মসলার বাজারে অস্থিরতা তৈরি হতে পারে।

বৃহস্পতিবার খাতুনগঞ্জে প্রতি কেজি শুকনো মরিচ (আমদানি করা) বিক্রি হয়েছে ৪০০ টাকায়। ১৫ দিন আগে এই মরিচের দাম ছিল ৮-১০ টাকা কম। পঞ্চগড়ে মরিচের দাম ২৪৫ টাকা আর আমদানিকৃত ঝাল মরিচ বিক্রি হচ্ছে ৩৬০ টাকা কেজি দরে। সব ধরনের মরিচে পাঁচ থেকে আট টাকা পর্যন্ত বেড়েছে জ্বালানি সংকটের অজুহাতে। যদিও দেশি হলুদের দাম ১২ থেকে ১৫ টাকা কমে কেজিপ্রতি বিক্রি হচ্ছে ২১৮ টাকায়। এছাড়া ধনিয়ার দাম কেজিপ্রতি ১০-১৫ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ১৩৮ থেকে ১৫৫ টাকায় (মানভেদে)। জয়ত্রীর দাম কেজিপ্রতি ২০০ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে দুই হাজার ৮০০ থেকে দুই হাজার ৯০০ টাকা দরে।

এদিকে পাইকারি বাজারে আমদানিকৃত গরম মসলার মধ্যে জিরার দাম কেজিপ্রতি ৮-১০ টাকা কমে ৫৫০, দারুচিনি ৩৫০-৩৫৫, লবঙ্গ এক হাজার ৩৩০, গোলমরিচ এক হাজার ২০, এলাচ চার থেকে সাড়ে চার হাজার, জায়ফল ৭০০, কালোজিরা ৩৬০, মেথি ১৩০, সরিষা ৯৪-৯৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

প্রতিকেজি দেশি পেঁয়াজ সর্বনিম্ন ২২ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ২৮ টাকায় লেনদেন হয়েছে। যদিও সদ্য মাঠ থেকে উঠানো পানিযুক্ত ও পচন ধরা পেঁয়াজ পাইকারিতে কেজিপ্রতি সাত টাকা থেকে ১৫ টাকায় বেচাকেনা হতে দেখা গেছে। আমদানি করা রসুন ১৩০ থেকে ১৩২, দেশি রসুন ৬৫ থেকে ৭০, আমদানিকৃত আদা ৯০ থেকে ৯২ টাকা কেজিদরে বিক্রি হয়েছে ।

ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, খুচরা বাজার থেকে চট্টগ্রামের আশপাশের এলাকাগুলোতে কেজিতে প্রকারভেদে পাঁচ থেকে ১০ টাকা, ঢাকা পর্যন্ত ১২ থেকে ১৫ টাকা আর উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোতে খাতুনগঞ্জের চেয়ে কেজিতে ১২ থেকে ১৭ টাকা পর্যন্ত বেশিতে বিক্রি হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু বর্তমানে প্রতিটি পণ্যই চট্টগ্রামের আশপাশের বাজারগুলোতে খাতুনগঞ্জের চেয়ে কেজিতে ১২ থেকে ১৫ টাকা, ঢাকার আশপাশে ২০ টাকা ও দূরের জেলাগুলোতে ২৫ থেকে ৩৫ টাকা পর্যন্ত বেশি দামে বেচাকেনা হচ্ছে, যা অস্বাভাবিক।

খাতুনগঞ্জ ডাল মিল মালিক সমিতির সাবেক সভাপতি সোলায়মান বাদশা জানান, কোরবানি উপলক্ষে আমদানি করা মসলা এরই মধ্যে বাজারে এসে গেছে। কিছু মসলা বন্দরে আটকে থাকতে পারে। সেগুলোও দ্রুত সময়ের মধ্যে গুদামে চলে আসবে। তাই আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে এখন আর দেশের বাজারে দাম বাড়া-কমার কোনো সম্পর্ক নেই। তবে সিন্ডিকেট সক্রিয় হলে যে কোনো সময় বাড়তে পারে। খুচরা বাজারে এত পার্থক্য দীর্ঘায়িত হলে পাইকারি বাজারেও স্বাভাবিকভাবেই দাম বাড়িয়ে দেওয়া হতে পারে। আর সেক্ষেত্রে পুরো বাজারেই অস্থিরতা তৈরি হবে। তাই সরকারের উচিত, বাজার মনিটরিংয়ের মাধ্যমে পাইকারি ও খুচরা বাজারের মধ্যে দামের পার্থক্য কমিয়ে আনা।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, ঢাকার মৌলভীবাজার, শ্যামবাজার, চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ, চাক্তাই, পাহাড়তলী ও রিয়াজউদ্দিন বাজারেই সবচেয়ে বেশি পাইকারি পণ্য লেনদেন হয়। এসব বাজার থেকে সারা দেশের বাজারে দেশি ও আমদানিকৃত মসলা সরবরাহ করেন ব্যবসায়ীরা। পাইকারি বাজারগুলোতে দাম অনেকটা স্থিতিশীল থাকলেও দেশব্যাপী এসব মসলা পণ্য পৌঁছাতে পরিবহন খরচ দ্বিগুণ হয়ে গেছে। যার কারণে কেজিপ্রতি মসলার দামে মানভেদে দুই থেকে ১০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি খরচ করতে হচ্ছে সংগ্রহকারী ব্যবসায়ীদের। এজন্য সারা দেশের খুচরা বাজারগুলোতে এখনই গরম মসলা ও পচনশীল মসলা পণ্যের দাম ঊর্ধ্বমুখী দেখা যাচ্ছে।

আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দামে বড় পতন

রাজধানীর বাজারে প্রচুর ফল, ক্রেতা কম

ঈদের ছুটিতে ক্রেতা নেই, কমেছে পণ্যের চাহিদা

স্বর্ণবাজারে ধস, দুই মাসে সর্বনিম্নে দাম

অকালবন্যায় বোরো বিপর্যয়, চালের বাজারে চাপের শঙ্কা

ঈদ ঘিরে মসলার বাজারে ঝাঁজ, ক্রেতার নাভিশ্বাস

নিত্যপণ্যের দাম ঊর্ধ্বমুখী থাকলেও চালের কেজিতে কমেছে ৫-৭ টাকা

আবারও কমলো স্বর্ণের দাম, কার্যকর আজ থেকেই

হাওয়ায় মিলিয়ে যাচ্ছে ভিটামিন ‘ডি’ ও ‘এ’র পুষ্টিগুণ

অন্য পণ্য না নিলে মিলছে না বোতলজাত তেল