হোম > বাণিজ্য > বাজার বিশ্লেষণ

হাওয়ায় মিলিয়ে যাচ্ছে ভিটামিন ‘ডি’ ও ‘এ’র পুষ্টিগুণ

এমরানা আহমেদ

জনগণের পুষ্টি ঘাটতি মোকাবিলা ও স্বাস্থ্য উন্নয়নে ভিটামিন সমৃদ্ধ ভোজ্যতেলের গুরুত্ব অপরিসীম। সূর্যরশ্মিসহ যেকোনো আলো, বাতাস ও অক্সিজেনের সংস্পর্শে তেলে ভিটামিন ‘এ’ ও ‘ডি’র পুষ্টিগুণ কমে যায়। তেলও ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে এর পুষ্টিগুণ হাওয়ায় মিলিয়ে যায়। অস্বচ্ছ বোতলগুলো এমন উপকরণ দিয়ে তৈরি করা হয়, যা অতিবেগুনী রশ্মিকে বাধাগ্রস্ত করে। ফলে ভোজ্যতেলের অণুপুষ্টি (ভিটামিন) অক্ষত এবং কার্যকর থাকে। এতে ভোক্তারা পুষ্টির সর্বাধিক সুবিধা পান।

বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, স্বচ্ছ বোতলকে লেমিনেট করে বা বোতলকে আলো প্রতিরোধী করে অথবা অস্বচ্ছ প্যাকেজিং ব্যবহার করে ভোজ্যতেল ও এর ভিটামিনকে সুরক্ষা দেওয়া যেতে পারে। ইতোমধ্যে আলো প্রতিরোধী অস্বচ্ছ প্লাস্টিকের বোতল সাশ্রয়ী ও টেকসই বিকল্প হিসেবে প্রমাণ হয়েছে। তাই স্বাস্থ্যসম্মত ভোজ্যতেল ভোক্তার হাতে পৌঁছাতে আলো প্রতিরোধী অস্বচ্ছ মোড়ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বিশ্বের অনেক দেশেই ভোজ্যতেলে ভিটামিন ‘ডি’ সমৃদ্ধকরণ প্রক্রিয়া চালু হয়েছে। বাংলাদেশেও রিফাইনারি বা ভোজ্যতেলের ডিলাররা ভিটামিন ‘এ’র সঙ্গে ‘ডি’ প্রিমিক্স নিয়ে আসবে এবং একই পদ্ধতিতে একই মেশিনে তারা মিশ্রণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করবে। তেলে ভিটামিন ‘ডি’ সঠিক মাত্রায় আছে কি না, তা ৬ মাস থেকে একবছর পরপর মনিটর করবে। বাজারে ৬ মাসের বেশি ভিটামিন ‘ডি’ ফর্টিফিকেশনযুক্ত তেল থাকলে তার মান কমে যাবে।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের টেকনিক্যাল অ্যাডভাইজরি কমিটির সিদ্ধান্ত অনুসারে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে ২০২৫ সালে জাতীয় পর্যায়ে ভিটামিন ‘ডি’-এর ওপর দেশব্যাপী দুই হাজার ৪৮১ জনের ওপর একটি সার্ভে করা হয়।

সার্ভের তথ্যানুযায়ী, ৬-৯ বছর বয়সিদের মধ্যে ভিটামিন ‘ডি’ স্বাভাবিক পাওয়া গেছে ৪.৯%, অপর্যাপ্ত ৩৬.৪% এবং অভাব ৫৮.৬%। আর ১০-১৯ বছর বয়সিদের মধ্যে ভিটামিন ‘ডি’ স্বাভাবিক পাওয়া গেছে ২.৮%, অপর্যাপ্ত ১৯.৪% এবং অভাব ৭.৮%। গর্ভবতীদের ভিটামিন ‘ডি’ স্বাভাবিক পাওয়া গেছে ৪.৬%, অপর্যাপ্ত ১০.৩% এবং অভাব ৮৩.৩%।

প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে স্বাভাবিক ভিটামিন ‘ডি’ পাওয়া গেছে ১২.৯%, অপর্যাপ্ত ১৪.৭% এবং অভাব ৭২.৪%। জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে করা সার্ভের খসড়াটি ২০২৫ সালের অক্টোবরে প্রমাণসাপেক্ষে ভিটামিন ‘ডি’ সমৃদ্ধকরণের প্রস্তাব স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে দেওয়া হয়েছে। এখন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে একটি সুপারিশমালা চেয়েছে শিল্প মন্ত্রণালয়। সুপারিশমালাটি এখনো শিল্প মন্ত্রণালয়ের হাতে এসে পৌঁছেনি। জনস্বাস্থ্যের কথা বিবেচনা করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সুপারিশমালাগুলো যাচাই-বাছাই করে দ্রুত শিল্প মন্ত্রণালয়ের কাছে পাঠাবেন সেই প্রত্যাশাই করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বাংলাদেশ ন্যাশনাল মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট স্ট্যাটাস সার্ভে ২০১৯-২০ এর তথ্য অনুযায়ী, পাঁচ বছরের কম বয়সি ২২ শতাংশ শিশু এবং ৭০ শতাংশ গর্ভবতী বা স্তন্যদানকারী নারীর ভিটামিন ডির ঘাটতি রয়েছে।

২০২৫ সালের বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইন অনুযায়ী, যেসব মানুষের ভিটামিন ডির অভাব রয়েছে, সেসব মানুষে ‘ডি’ সাপ্লিমেনটেশন বা ফর্টিফিকেশন কাজ করবে। জনসংখ্যার শতকরা দুই দশমিক পাঁচ ভাগের বেশি ডির অভাব থাকলে এ ফর্টিফিকেশন প্রয়োজন।

একই জরিপের ২০১১-১২ সালের ফলাফল অনুসারে, এ হারগুলো পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশুদের জন্য ৪০ শতাংশ এবং গর্ভবতী বা অস্তন্যদানকারী নারীদের জন্য ৭২ শতাংশ ছিল। এর অর্থ শিশুদের মধ্যে সমস্যাটি মোকাবিলায় কিছু অগ্রগতি হয়েছে, তবে গর্ভবতী বা স্তন্যদানকারী নন এমন নারীদের ক্ষেত্রে পরিবর্তনের হার নগণ্য।

গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ইমপ্রুভড নিউট্রিশনের (গেইন) লার্জ স্কেল ফুড ফর্টিফিকেশন প্রোগ্রামের পোর্টফোলিও লিড আশেক মাহফুজ বলেন, আলো প্রবেশের ফলে তেলের গুণগত মান হ্রাস এবং স্থায়িত্বকাল কমে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকার পরও ভোক্তার প্যাকেটের ভেতরের পণ্যটি দেখার ইচ্ছাকে ‘আলো থেকে পণ্যটিকে রক্ষা’ করার চেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দেন উৎপাদকরা। ভোক্তার পছন্দ ছাড়াও অণুপুষ্টিসমৃদ্ধ ভোজ্যতেলের আলোক সংবেদনশীলতা সম্পর্কে প্রস্তুতকারকদের সম্যক জ্ঞানের অভাব আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ।

ভোজ্যতেলের জন্য অস্বচ্ছ প্যাকেটিং নিশ্চিত করতে করণীয় সম্পর্কে তিনি বলেন, অনুপুষ্টিসমৃদ্ধ ভোজ্যতেলের আলোক সংবেদনশীলতা সম্পর্কে প্রস্তুতকারকদের সচেতন করতে হবে, প্যাকেজিং বিষয়ক সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভোক্তার জ্ঞান ও সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। আলো প্রতিরোধী অস্বচ্ছ প্যাকেজিংয়ের পক্ষে স্টেকহোল্ডারদের যুক্ত করতে হবে। ভোজ্যতেলের প্যাকেজিং নির্বাচনে প্রস্তুতকারকরা যেন আলো-প্রতিরোধী বৈশিষ্ট্যের ওপর আরো বেশি জোর দেন, সেজন্য নতুনভাবে কাজ করতে হবে। এক্ষেত্রে ভোজ্যতেলের মান অক্ষুণ্ণ রাখতে পাউচপ্যাক, লেমিনেটেড পিইটি বোতল, এইচডিপিই জার, ইউভি দ্রব্য মিশ্রিত বোতল ব্যবহারে জোর দিতে হবে।

ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনের লার্জ স্কেল ফুড ফর্টিফিকেশন কান্ট্রি অ্যাডভোকেসি বাংলাদেশের প্রোগ্রাম ম্যানেজার ডা. রীনা রাণী পাল বলেন, বর্তমানে দেশে সব শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে ভিটামিন ‘ডি’ ঘাটতি এবং এ সংক্রান্ত অসুস্থতা বাড়ছে। যেহেতু সব মানুষই কম-বেশি ভোজ্যতেল খেয়ে থাকেন, জনস্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক দিক থেকে ভোজ্যতেলে ভিটামিন ‘ডি’ সমৃদ্ধকরণ একটি সর্বজনীন এবং ব্যয় সাশ্রয়ী পদক্ষেপ হতে পারে। জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার দায়িত্ব সবার। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একার পক্ষে এ দায়িত্ব সঠিকভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব নয়। সব মন্ত্রণালয় যদি জনস্বাস্থ্যকে বিবেচনায় রেখে তাদের কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করে, তবে স্বাস্থ্য খাতের ওপর জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার চাপ স্বয়ংক্রিয়ভাবে কমে যাবে। সম্প্রতি অসংক্রামক রোগ মোকাবিলায় ৩৫টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ যৌথ ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করেছে। এটি দেশের ইতিহাসে অসংক্রামক রোগ (এনসিডি) নিয়ন্ত্রণে সর্ববৃহৎ আন্তঃমন্ত্রণালয় উদ্যোগ। ভোজ্যতেলে ভিটামিন ‘ডি’ সমৃদ্ধকরণ এ উদ্যোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে। ‘সূর্যরশ্মিসহ যেকোনো আলোর সংস্পর্শে অনেক ভিটামিন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আলোক-সংবেদনশীল ভিটামিনের মধ্যে রয়েছে ভিটামিন এ, বি, সি, ডি, ই, কে এবং ফলিক অ্যাসিড। সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মির প্রভাবে ভিটামিন ‘এ’ নষ্ট হতে থাকে এবং একপর্যায়ে অদৃশ্য হয়ে যায়। এছাড়া বাতাস ও অক্সিজেনের সংস্পর্শে ভোজ্যতেল ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যায়। সে কারণে ভোজ্যতেলের প্যাকেজিংয়ের জন্য আলো প্রতিরোধী অস্বচ্ছ উপাদান ব্যবহার করার পরামর্শ দেওয়া হয়।

তিনি আরো বলেন, ‘অস্বচ্ছ বোতলগুলো এমন উপকরণ দিয়ে তৈরি করা হয়, যা অতিবেগুনি রশ্মিকে বাধাগ্রস্ত করে, ফলে ভোজ্যতেলের অণুপুষ্টি অক্ষত এবং কার্যকর থাকে। এতে ভোক্তারা পুষ্টির সর্বাধিক সুবিধা পান। অস্বচ্ছ প্যাকেজিংয়ে ভোজ্যতেলের পুষ্টি ও মান অক্ষুণ্ণ থাকে। তেল দুর্গন্ধ হবে না। রং, স্বাদ ও গন্ধ পরিবর্তনের সমস্যা থেকে মুক্ত রাখবে। তেলের মান অক্ষুণ্ণ ও অটুট রাখার দায়িত্ব উৎপাদক থেকে খুচরা বিক্রেতা সবারই।

জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের কার্যক্রম ও গবেষণাগার বিভাগের পরিচালক (উপসচিব) ফকির মুহাম্মদ মুনাওয়ার হোসেন বলেন, বাংলাদেশে ভিটামিন ‘এ’ জনিত অণুপুষ্টির ঘাটতি মোকাবেলায় ভোজ্যতেলে ভিটামিন ‘এ’ সমৃদ্ধকরণ আইন-২০১৩ প্রণয়ন করা হয়। এ আইনের পূর্ণ সুফল পেতে গুণগত প্যাকেজিংয়ের অভাব একটি বাধা হিসেবে কাজ করছে। বর্তমানে ৬৫ শতাংশ ভোজ্যতেল ড্রামের মাধ্যমে এবং ৩৫ শতাংশ ভোজ্যতেল বোতল/ প্যাকেটের মাধ্যমে বাজারজাত হয়। অস্বাস্থ্যকর নন ফুড-গ্রেডেড ড্রামে সরবরাহকৃত খোলা ভোজ্যতেল অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর। অন্যদিকে, ভোজ্যতেল বাজারজাত হয় যে বোতলে, সেগুলোর অধিকাংশই আলো প্রতিরোধী বা অস্বচ্ছ না হওয়ায় ভোজ্যতেলের গুণগত ও পুষ্টিমান হ্রাস পায়। এটি একটি বড় সমস্যা।

প্রগতির জন্য জ্ঞান (প্রজ্ঞা)-এর নির্বাহী পরিচালক এ বি এম জুবায়ের বলেন, ‘অস্বচ্ছ প্যাকেজিং নিশ্চিতে অণুপুষ্টিসমৃদ্ধ ভোজ্যতেলের আলোক সংবেদনশীলতা সম্পর্কে প্রস্তুতকারকদের সচেতন করতে হবে। প্যাকেজিং বিষয়ক সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভোক্তার জ্ঞান ও সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। আলো প্রতিরোধী অস্বচ্ছ প্যাকেজিংয়ের পক্ষে স্টেকহোল্ডারদের যুক্ত করতে হবে। প্যাকেজিং নির্বাচনে প্রস্তুতকারকরা যেন আলোপ্রতিরোধী বৈশিষ্ট্যের ওপর আরো বেশি জোর দেন, সেজন্য নতুনভাবে কাজ করতে হবে।

তিনি আরো বলেন, ভোজ্যতেলে ভিটামিন ‘ডি’ ফর্টিফিকেশন একটি প্রমাণভিত্তিক, কার্যকর ও সাশ্রয়ী জনস্বাস্থ্য হস্তক্ষেপ হিসাবে অভিহিত করা হবে। বিশ্বের ৪৪টি দেশে ভোজ্যতেল ভিটামিন দ্বারা সমৃদ্ধ করা হয়। বেশিরভাগ দেশেই ভিটামিন ‘এ’-এর সঙ্গে ভিটামিন ‘ডি’ যোগ করে সমৃদ্ধ করা হয়।

কোরবানির মসলার বাজারেও জ্বালানি সংকটের অজুহাত

অন্য পণ্য না নিলে মিলছে না বোতলজাত তেল

জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি, সরকারকে পাম্প মালিকদের সাধুবাদ

দেশে ফের বাড়ল স্বর্ণের দাম, ভরি ছাড়াল আড়াই লাখ

বাজার সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে সরকার

দেশের সব দোকান-শপিং মল রাত ৮টার মধ্যে বন্ধের সিদ্ধান্ত

চাহিদার চাপে বাড়ছে মাংস-মসলার দাম, কমছে সবজি ও ডিমের

শিশুদের পছন্দ বৈচিত্র্যময় নকশার পোশাক

ছুটির দিনে বিপণিবিতানে কেনাকাটায় ধুম

বাজারে সয়াবিন তেলের তীব্র সংকট