বিশ্ববিদ্যালয়ের খাতা-কলম, ক্লাস-অ্যাসাইনমেন্ট আর ভবিষ্যৎ গড়ার ব্যস্ততার মধ্যেই হঠাৎ থেমে গেল দুটি তরুণ জীবন। রাজধানীতে মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে পৃথক ঘটনায় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ও ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির দুই শিক্ষার্থীর ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার হয়েছে। একজনের শেষ ঠিকানা হয়েছে কায়েতটুলীর ছাত্র মেসের ছোট্ট একটি কক্ষ, অন্যজনের জীবন থেমেছে নিজের বাসার ডাইনিং রুমে। স্বজন-সহপাঠীদের চোখে এখন শুধু শূন্যতা—আর প্রশ্ন, কী এমন অসহ্য হয়ে উঠেছিল তাদের কাছে, যার সামনে জীবনের সব সম্ভাবনাও ম্লান হয়ে গেল? বুধবার এ দুটি ঘটনার তথ্য পাওয়া যায়।
হাসপাতাল ও পুলিশ সূত্র জানায়, মঙ্গলবার দিবাগত রাতে বংশালের কায়েতটুলীতে অনিক পাল (২১) নামে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীকে তার মেসের কক্ষে ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া যায়। অনিক বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের পেইন্টিং বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। কয়েকজন সহপাঠীর সঙ্গে ওই মেসে থাকতেন তিনি।
রাতে মেসের অন্য সদস্যরা অনিকের কক্ষের দরজা বন্ধ দেখতে পান। ডাকাডাকি করেও কোনো সাড়া মিলছিল না। একপর্যায়ে সন্দেহ হলে দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে তারা দেখতে পান, ঘরের রেলিংয়ের সঙ্গে গামছা দিয়ে গলায় ফাঁস লাগানো অবস্থায় ঝুলছেন অনিক।
সেই দৃশ্য যেন মুহূর্তেই স্তব্ধ করে দেয় পুরো মেসকে। যে তরুণ কিছুক্ষণ আগেও হয়ত নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবছিলেন, সহপাঠীদের সঙ্গে কথা বলছিলেন, সেই তরুণকেই নিথর অবস্থায় দেখতে হলো বন্ধুদের। রাত সাড়ে ১২টার দিকে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
অনিকের মৃত্যুর পর তার কক্ষ থেকে একটি চিরকুট পাওয়ার কথাও জানিয়েছে পুলিশ। সেখানে চোখের গুরুতর সমস্যার আশঙ্কা নিয়ে তার উদ্বেগের কথা ছিল বলে জানা গেছে। সহপাঠীদের ভাষ্য, এর আগে একটি প্রেমের সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার বিষয়টিও তাকে কষ্ট দিয়েছিল। পারিবারিক কিছু বিষয় নিয়েও তিনি চাপে ছিলেন বলে তাদের ধারণা। তবে এসব কারণের কোনটি তার মৃত্যুর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিল, তা এখনো নিশ্চিত নয়। পুলিশ বিষয়টি তদন্ত করছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ পরিদর্শক মো. হাবিবুর রহমান জানান, অনিকের লাশ হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট থানাকে জানানো হয়েছে। অনিকের বাড়ি সিলেটে। তার বাবার নাম অরবিন্দু পাল। পরিবারের জন্য যে ছেলেটি ছিল স্বপ্ন ও আশার জায়গা, রাতারাতি সেই ছেলের পরিচয় এখন হাসপাতালের মর্গের একটি লাশ।
এর কয়েক ঘণ্টা পরই রাজধানীর হাজারীবাগের ঝিগাতলায় আরেক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর জীবনের করুণ পরিণতি সামনে আসে। বুধবার দুপুরে জাহানারা ম্যানশনের পঞ্চম তলার একটি বাসার ডাইনিং রুম থেকে রাফসাদ মোস্তফা রুহিন (২২) নামে ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির এক শিক্ষার্থীর ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।
রাফসাদ কম্পিউটার সায়েন্স বিভাগের অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ঝিগাতলায় থাকতেন তিনি। ৯৯৯-এ খবর পেয়ে হাজারীবাগ থানা-পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে ডাইনিং রুমের ফ্যানের সঙ্গে প্লাস্টিকের রশি দিয়ে ঝুলন্ত অবস্থায় তাকে দেখতে পায়। পরে পরিবারের সহযোগিতায় লাশ নামিয়ে আইনি প্রক্রিয়া শেষে ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়।
পরিবারের বরাতে পুলিশ জানিয়েছে, প্রেমঘটিত কোনো বিষয় নিয়ে অভিমান থেকে রাফসাদ এমন সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকতে পারেন বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। তবে এর বাইরে অন্য কোনো কারণ ছিল কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। রাফসাদ দুই ভাইয়ের মধ্যে ছোট। বড় ভাই থাকেন দেশের বাইরে। একজন স্বজন অসুস্থ থাকায় তার মা-ও ওই সময় বাসায় ছিলেন না বলে পরিবার জানিয়েছে। রাতে বাসায় একা থাকার সময় থেকে সকাল পর্যন্ত কোনো এক সময়ে ঘটনাটি ঘটেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। হাজারীবাগ থানার এসআই মো. শামীম মিয়া জানান, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে।