দুর্ভোগের রাজধানী
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো সংগঠনের ব্যানারে রাজধানীর সড়কে দাবির নামে আন্দোলন করা যেন নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। কথায় কথায় আন্দোলন আর সড়ক অবরোধ করে কর্মসূচি দেওয়ায় দিনের পর দিন অসহনীয় যানজটে নাকাল নগরবাসী। সড়ক অবরোধ, সমাবেশ আর বিক্ষোভে অচল হয়ে পড়ছে রাজধানীবাসীর স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। এতে করে প্রতিদিন নষ্ট হচ্ছে নগরবাসীর গুরুত্বপূর্ণ কর্মঘণ্টা। এসব কারণে ঢাকার বাসিন্দারা চরম ত্যক্ত-বিরক্ত। জনদুর্ভোগ থেকে নগরবাসীকে স্বস্তি দিতে হিমশিম খাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। আন্দোলন সামাল দিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কঠোর হওয়ার পরামর্শ নগর পরিকল্পনাবিদদের।
নগর উন্নয়ন বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রতিটি দাবি-দাওয়ারই নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া রয়েছে। তা যদি নিয়মতান্ত্রিক ও পরিকল্পিতভাবে উপস্থাপন না করা হয়, তবে তাতে সমস্যার সমাধান তো হয়ই না, বরং সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বাড়ে।
বিশাল জনগোষ্ঠীর এই শহরে নিত্যদিনের বিশৃঙ্খলা থেকে মুক্তি পেতে প্রয়োজন কার্যকর গণপরিবহন, বিকল্প আন্দোলনের সংস্কৃতি এবং দ্রুত সংলাপের ব্যবস্থা। নইলে সাধারণের চাপা ক্ষোভ এক সময় বড় সংকটে রূপ নিতে পারে বলে জানিয়েছেন তারা।
দুই কোটিরও বেশি মানুষের মহানগরী ঢাকা এখন আন্দোলনের মূল কেন্দ্র। ছোট-বড় যে কোনো ইস্যুতে মুহূর্তে উত্তাল হয়ে ওঠে ঢাকার রাজপথ। চলছে অবরোধ, সমাবেশ ও ঘেরাওয়ের মতো কর্মসূচি। প্রায় প্রতিনিয়ত এসব কর্মসূচি ঘিরে ব্যস্ততম নগরী জুড়ে সৃষ্টি হচ্ছে অচলাবস্থা। যানজটের এই মেগাসিটিতে কোনো একটি সড়ক অবরোধ করলে এর প্রভাব পড়ে অন্যান্য সড়কগুলোতেও, বাড়ে জনভোগান্তি। অসহনীয় এ অবস্থা থেকে মুক্তি কবে মিলবে, তা যেন জানা নেই কারোরই।
প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম গত ১১ ডিসেম্বর রাজধানীর বেইলি রোডের ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে আয়োজিত প্রেস ব্রিফিংয়ে বলেছেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গত ১৬ মাসে দুই হাজারের বেশি আন্দোলন হয়েছে। যা দেশের ইতিহাসে বিরল ঘটনা।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের গত দেড় বছরে রাজধানীতে প্রতিদিন গড়ে ২-৩টি করে আন্দোলন হয়েছে। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তথ্য অনুযায়ী, ৫ আগস্টের পর রাজধানীতে ১৩৯টি সংগঠনের ব্যানারে অন্তত এক হাজার ৭৮৬টি আন্দোলন কর্মসূচি পালিত হয়েছে। এর মধ্যে শুধু শাহবাগ, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারসহ আশপাশের এলাকায় হয়েছে এক হাজার ৩৯৮টি ।
অভ্যুত্থান-পরবর্তী সরকারের কাছে দাবি-দাওয়া আদায়ে সরব হয়ে উঠেছে, ছাত্র, শিক্ষক, পেশাজীবীসহ সব শ্রেণি-পেশার মানুষ। দিনে দিনে ঢাকা হয়ে উঠেছে আন্দোলনের নগরী। কথায় কথায় চলে বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ। এর মধ্যে আন্দোলনের প্রধান কেন্দ্র হয়ে উঠেছে শাহবাগ মোড়। এছাড়াও টিএসসি, প্রধান উপদেষ্টার বাসভবনের সামনে, কাকরাইল, সচিবালয়ের গেট, প্রেস ক্লাব, মহাখালী রেলগেট, কাওরানবাজারসহ গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে যখন-তখন সড়ক অবরোধ করছে।
আন্দোলনে নাকাল রাজধানীবাসী
প্রায় প্রতিদিন এসব কর্মসূচি ঘিরে ব্যস্ততম নগরজুড়ে সৃষ্টি হচ্ছে অচলাবস্থা। অসহনীয় এ অবস্থা থেকে কবে মুক্তি মিলবে, তা যেন জানা নেই কারোরই। রাস্তা বন্ধ করে এসব কর্মসূচির ফলে সময়মতো কর্মস্থলে পৌঁছানো ও অসুস্থ রোগী নিয়ে দ্রুত হাসপাতালে যাওয়াসহ নানা ক্ষেত্রে ভোগান্তি বাড়ছে। নগরবাসী বলছেন, তারা এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণ চান। তারা আর সকাল থেকে রাত পর্যন্ত দীর্ঘ যানজটের কবলে পড়তে চান না। সরকার যত দ্রুত এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে ততই ঢাকাবাসীর জন্য মঙ্গল বলে মনে করেন তারা।
শাহবাগ মোড়ে যখন অবরোধ হয়, তার প্রধান ভিকটিম হন শাহবাগ মোড়ে দেশের একমাত্র মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় এবং বারডেম হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে যাওয়া প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ। অনেক সময় চিকিৎসক ও হাসপাতালের অন্য কর্মীরাও সঠিক সময়ে হাসপাতালে পৌঁছাতে পারেন না। এতে রোগীদের সেবা ব্যাহত হয়। মিছিল, সমাবেশ ও অবরোধে ব্যবহার করা মাইকের উচ্চশব্দে হাসপাতালে থাকা রোগীদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলে। এছাড়া মানুষের শরীর ও মনে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ে।
রাজধানীর বাসিন্দাদের অভিমত, গত ১৫ বছরের বেশি সময় যারা চুপ ছিলেন তারা নতুন সরকার আসার পর নিজেদের স্বার্থ আদায়ে বেপরোয়া হয়ে উঠছেন। অন্যদিকে সরকারও কিছুসংখ্যক আন্দোলনকারীকে ছাড় দেওয়ায় কিংবা দ্রুত দাবি পূরণ করায় অন্যরাও উৎসাহিত হচ্ছেন।
ক্লান্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী
রাজধানীতে রাস্তা অবরোধ করে একের পর এক বিক্ষোভ কর্মসূচি ঘিরে সৃষ্ট বিশৃঙ্খলা ঠেকাতে হিমশিম খাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। দাবি আদায়ের নামে এসব বিক্ষোভের অনেকই ‘উদ্দেশ্যমূলক’ বলে মনে করছে তারা। তাই সড়ক অবরোধ করে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি না করতে সংশ্লিষ্টদের প্রতি অনুরোধ জানানো হয়েছে পুলিশের পক্ষ থেকে।
গত ১০ ডিসম্বর ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) পক্ষ থেকে এ সংক্রান্ত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে রাস্তা অবরোধ করে যানচলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি না করার জন্য অনুরোধ জানানো হয়। বেআইনি ও অনুমোদনহীন সমাবেশ হতে বিরত থাকার অনুরোধ জানিয়েছেন ডিএমপি কমিশনার। নির্দেশনা লঙ্ঘনকারীর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করবে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর সব ধরনের বেআইনি ও অনুমোদনহীন জনসমাবেশ এবং আন্দোলন পরিচালনা থেকে বিরত থাকতে সবাইকে আহ্বান জানিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। এছাড়া নগরবাসীর বৃহত্তর স্বার্থে এবং সুষ্ঠু ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার জন্য অহেতুক সড়ক অবরোধ করা থেকে বিরত থাকার জন্য সংশ্লিষ্ট সবাইকে ডিএমপির পক্ষ থেকে বিশেষ অনুরোধ জানানো হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে ডিএমপির মুখপাত্র উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মুহাম্মদ তালেবুর রহমান আমার দেশকে বলেন, রাজধানীর ব্যস্ততম সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করলে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি হয়, যা সঙ্গত কারণেই কারও কাম্য নয়। তাই যানচলাচল স্বাভাবিক রাখতে এবং জনদুর্ভোগ সৃষ্টি হতে পারে এমন সব কর্মসূচি থেকে বিরত থাকতে সবাইকে অনুরোধ জানানো হয়েছে।
প্ল্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও নগর পরিকল্পনাবিদ আদিল মুহাম্মদ খান আমার দেশকে বলেন, বর্তমান সরকারের সময়ে দাবি-দাওয়ার পরিমাণ অনেক বেড়ে গেছে। সবাই যে যৌক্তিক দাবি করছে বিষয়টি এমন নয়। কিন্তু সরকার যদি দাবি মেনে নেয়, তাহলে তো এটা বাড়তেই থাকবে। এই সরকার হয়তো রাজনৈতিক সরকারের মতো শক্ত হতে পারবে না, কিন্তু কিছুটা শক্ত তো হতে হবে।
তিনি বলেন, ছাত্র-জনতার আন্দোলনেই তো এই সরকার হয়েছে, ফলে সরকারকে এলাকাভিত্তিক মানুষকে সম্পৃক্ত করে কিছু কমিটি করতে হবে। যারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাজে সহযোগিতা করবে। পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে যত দ্রুত সম্ভব একটা কাঠামোর মধ্যে দাঁড় করাতে হবে।