সাত বছর আগে রাজধানীর ধানমন্ডির নিজ ফ্ল্যাটে গৃহকর্ত্রী আফরোজা বেগম ও তার গৃহকর্মী দিতিকে গলা কেটে হত্যার ঘটনায় করা মামলার রায় আগামীকাল রোববার। ঢাকার সপ্তম অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ তাওহীদা আক্তারের আদালতে এ রায় ঘোষণা করার কথা রয়েছে।
২০১৯ সালের ১ নভেম্বর রাতে ধানমন্ডির ২৮ নম্বর (নতুন ১৫) রোডে ‘লোবেলিয়া হাউজ’ নামের একটি ভবনের পঞ্চম তলা থেকে টিমটেক্স ও ক্রিয়েটিভ গ্রুপের ডিএমডি কাজী মনির উদ্দিন তারিমের শাশুড়ি আফরোজা বেগম ও তার গৃহকর্মী দিতির রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তাদের দুজনকেই গলা কেটে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় ওই বছরের ৩ নভেম্বর মামলা দায়ের করেন আফরোজা বেগমের মেয়ে দিলরুবা সুলতানা রুবা। চাঞ্চল্যকর এই মামলা থানার পুলিশ ও ডিবি পুলিশের হাত ঘুরে তদন্তভার পায় পিবিআই। ঘটনার প্রায় ২৭ মাস পর ২০২২ সালের ১ ফেব্রুয়ারি দুজনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র জমা দেন তদন্ত কর্মকর্তা মজিবুর রহমান।
অভিযুক্ত দুই আসামি হলেন— আফরোজা বেগমের বাসার কর্মী বাচ্চু মিয়া এবং বাসাটিতে তখন সদ্য কাজে যোগ দেওয়া সুরভী আক্তার নাহিদ। তবে ইলেকট্রিশিয়ান বেলায়েত হোসেন, বাড়ির ব্যবস্থাপক গাউসুল আজম প্রিন্স, নুরুজ্জামানদের বিরুদ্ধে অভিযোগ না পাওয়ায় অব্যাহতির আবেদন করা হয়।
মামলার তদন্তে উঠে আসে, ঘটনার দিন বিকেলে আফরোজা বেগমের বেডরুমে গিয়ে আলমারির চাবি চায় বাচ্চু। চাবি দিতে অস্বীকৃতি জানালে সুরভীর সহযোগিতায় ধারালো ছুরি দিয়ে আফরোজা বেগমকে খুন করে বাচ্চু। আর ওই দৃশ্য দেখে ফেলায় দিতিকেও খুন করা হয়।
বাদীপক্ষের আইনজীবী খলিলুর রহমান (আসাদ) বলেন, আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছি। আশা করছি, আসামিদের সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড হবে।
তিনি আরো জানান, দিলরুবা সুলতানা রুবার পরিবার চিকিৎসার জন্য লন্ডনে অবস্থান করছেন। শনিবার রাতে তারা ঢাকায় ফিরবেন। আশা করছি, রোববার রায় শুনতে আদালতে উপস্থিত থাকবেন তারা।
অভিযোগপত্র থেকে জানা যায়, আফরোজা বেগমের স্বামী শাহ আশরাফ উল্লাহ ময়মনসিংহের পাগলা থানার মুখী গ্রামের স্বনামধন্য ব্যক্তি। এ দম্পতি স্থানীয়ভাবে সমাজসেবক হিসেবে পরিচিত। অভিযুক্ত বাচ্চু মিয়া আফরোজা বেগমের গ্রামের বাসিন্দা। ওই দম্পতিকে অভিভাবক হিসেবে মানতেন বাচ্চুর বাবা আ. হেকিম। সেই সুবাধে বাচ্চু ওই বাসায় দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে আসছিলেন।
এতে আরো বলা হয়, ‘ঢাকায় দীর্ঘদিন বসবাসকালে কিছু বখাটে প্রকৃতির লোকের সাথে পরিচয় হয় বাচ্চুর এবং তাদের সাথে চলাফেরা করতো। তবে আফরোজা বেগমের পরিবারের কেউ তা জানতো না। মাঝে মাঝে বখাটে প্রকৃতির লোকদের সাথে বিভিন্ন স্থানে নেশা জাতীয় মাদকদ্রব্য সেবন করতো। যার কারণে বাচ্চুর মধ্যে বিলাসী জীবন-যাপন করার মানসিকতা জন্ম নেয়। যার ফলে আফরোজা বেগমের অর্থ সম্পদের উপর বাচ্চুর লোভ জন্মে।’
বাচ্চু নিজেকে দায়মুক্ত রাখার পরিকল্পনা করে পূর্ব পরিচিত সুরভীকে দিয়ে চাকু কেনে জানিয়ে অভিযোগপত্রে বলা হয়, তিনি কাজের লোক সাজিয়ে সুরভীকে অত্যন্ত কৌশলে ও পরিকল্পতিভাবে ওই বাসায় প্রবেশ করায়। ঘটনার দিন বিকেল ৪টা থেকে সাড়ে ৫টার মধ্যে আফরোজা বেগমের বেডরুমে গিয়ে বাচ্চু আলমারির চাবি চায়। চাবি দিতে অস্বীকৃতি জানালে বাচ্চু রাগে-ক্ষোভে সুরভীর সহযোগিতায় ধারালো ছুরি দিয়ে আফরোজা বেগমের গলায় ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে একাধিক আঘাত করে। এতে রক্তাক্ত অবস্থায় মেঝেতে লুটিয়ে পড়ে মারা যান আফরোজা।
এ দৃশ্য গৃহকর্মী দিতি দেখে ফেলায় সুরভী তার গলায় ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে ছুরি দিয়ে আঘাত করে। এতে দিতিও মারা যায়। দুজনকে হত্যার পর অর্থ ও স্বর্ণালংকার লুণ্ঠন করে তারা। গ্রেপ্তারের পর সুরভী দুই দফা স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়।
এ মামলায় ২০২২ সালের ১১ অক্টোবর দুই আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেয় আদালত। বিচার চলাকালে আদালত ৩২ সাক্ষীর মধ্যে ২৫ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ করা হয়েছে।
মামলায় অভিযোগ করা হয়, বিকেল সাড়ে ৪টা থেকে ৫টার মধ্যে দিলরুবা গৃহকর্মী দিতিকে তার মায়ের ফ্ল্যাটে কাজের জন্য পাঠান। সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে দিলরুবা তার মাকে ফোন দিলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি। এজন্য দিলরুবা তার বাসার কাজের ছেলে রিয়াজকে মায়ের ফ্ল্যাটে পাঠান। রিয়াজ সেখানে গিয়ে কলিং বেল চাপেন এবং ডাকাডাকি করে কোনো শব্দ না পেয়ে দরজা ধাক্কা দিলে তা খোলা দেখতে পান। রিয়াজ আফরোজা বেগমকে ডাইনিং রুমের মেঝেতে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে দৌড়ে গিয়ে দিলরুবাকে জানান। দিলরুবা দৌড়ে বাসার ভেতরে প্রবেশ করে দেখতে পান, ডাইনিং রুমের মেঝেতে তার মা আফরোজা বেগম পড়ে আছেন এবং পাশের গেস্টরুমে পড়ে আছেন গৃহকর্মী দিতি।