দেশে চলমান গ্যাস সংকটের প্রভাব পড়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) আবাসিক হলগুলোতেও। গ্যাস সংকট ও লাইনে গ্যাসের চাপ কম থাকায় লাকড়ি দিয়ে রান্না করা হচ্ছে। এতে রান্নার সময় ও খরচ দুটোই যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে খাবারের দামও।
এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোতে নিয়মিত বিদ্যুৎ বিভ্রাটের অভিযোগ শিক্ষার্থীদের। একদিকে খাবারের বাড়তি দাম, অন্যদিকে গরমের মধ্যে বিদ্যুৎ না থাকায় পড়াশোনা ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ভোগান্তি বাড়ছে শিক্ষার্থীদের।
ক্যান্টিন মালিক ও কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দিনের বেশির ভাগ সময় পাইপলাইনে প্রয়োজনীয় গ্যাস পাওয়া যায় না। তাই বাধ্য হয়ে লাকড়ি ব্যবহার করছেন। এতে রান্নায় যেমন বেশি সময় লাগছে, পাশাপাশি চুলার তীব্র তাপ ও ধোঁয়ার মধ্যে দীর্ঘ সময় কাজ করতে হচ্ছে কর্মচারীদের। এছাড়া লাকড়ি দিয়ে রান্নায় প্রতিদিন অতিরিক্ত কয়েক হাজার টাকাও খরচ হচ্ছে।
গ্যাসের সংকটের বিষয়ে স্যার এএফ রহমান হলের ক্যান্টিন মালিক রবিউল ইসলাম বলেন, প্রয়োজনীয় গ্যাস সরবরাহ না থাকায় দৈনিক ২,০০০ টাকার লাকড়ি ব্যবহার করতে হয়। আগে গ্যাসে দ্রুত রান্না শেষ করা যেত কিন্তু লাকড়ির চুলায় একই কাজ করতে অনেক বেশি সময় লাগে। এতে দুপুরের রান্না শেষ করে কর্মীদের যে বিশ্রামের সুযোগ থাকত, তা কমে গেছে। দীর্ঘ সময় চুলার তাপ ও ধোঁয়ার মধ্যে কাজ করায় বাবুর্চি ও অন্য কর্মচারীরা শারীরিকভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়ছেন।
মাস্টারদা সূর্যসেন হল ক্যান্টিনের পরিচালক মোহাম্মদ আলী রাজু বলেন, প্রতিদিন প্রায় ২,০০০ টাকার লাকড়ি প্রয়োজন হয়। স্বাভাবিক সময়ে গ্যাসের ব্যবস্থা বিশ্ববিদ্যালয় বা হল প্রশাসনের মাধ্যমে হলেও এখন লাকড়ির বাড়তি খরচ ক্যান্টিনকেই বহন করতে হচ্ছে। এই বাড়তি ব্যয়ের কারণে খাবারের মানের ওপরও চাপ তৈরি হচ্ছে। এই সংকটকালীন হল প্রশাসনের পক্ষ থেকে ক্যান্টিনগুলোকে জ্বালানি ভর্তুকি দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
বেড়েছে খাবারের দাম
গ্যাস সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়েছে হলের ক্যান্টিনগুলোর খাবারের মূল্যতালিকায়। কয়েকটি ক্যান্টিন ঘুরে দেখা যায়, বিভিন্ন খাবারের দাম ৫ থেকে ১০ টাকা পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। স্যার এএফ রহমান হল, মাস্টারদা সূর্যসেন হল, বিজয় একাত্তর হলসহ বিভিন্ন ক্যান্টিনে মুরগি, হাঁস ও গরুর মাংসসহ কয়েকটি খাবারের দাম ৫ থেকে ১০ টাকা বাড়ানো হয়েছে। সবজি, ডিমের মতো কিছু আইটেমেও বাড়তি দাম নেওয়া হচ্ছে।
সংকট নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান প্রকৌশলী কাজী আক্রাম হোসেন বলেন, গ্যাস সংকট শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একক সমস্যা নয়। সারা দেশেই এর প্রভাব পড়েছে। গ্যাসের উৎপাদন কমে যাওয়ায় বিভিন্ন শিল্প-কারখানাও সমস্যায় পড়েছে।
তিনি জানান, এর আগে গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ার সময় তিতাসের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছিল। বর্তমানে পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে প্রয়োজন হলে আবারও চিঠি দেওয়ার কথা রয়েছে। প্রধান প্রকৌশলী বলেন, গ্যাসের সরবরাহের বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। মূল উৎস থেকেই গ্যাসের উৎপাদন কম হওয়ায় শুধু চাপ বাড়ানোর অনুরোধ করে সমস্যার সমাধান করা কঠিন।
নিয়মিত বিদ্যুৎ বিভ্রাট
গ্যাস সংকটের পাশাপাশি আবাসিক হলগুলোয় নিয়মিত বিদ্যুৎ বিভ্রাটের অভিযোগও করছেন শিক্ষার্থীরা। তাদের দাবি, অনেক সময় আবাসিক হলগুলোয় একটানা দুই থেকে তিন ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকে না। এতে তীব্র গরমের মধ্যে আবাসিক শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ব্যাহত হচ্ছে।
শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের শিক্ষার্থী সাজিদ আবরার বলেন, তীব্র গরমের মধ্যেও রাত-বিরাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলে কারেন্ট চলে যাচ্ছে। ফলে আমাদের পড়াশোনা বিঘ্নিত হচ্ছে।
তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেছি চার বছর হচ্ছে। কখনো এভাবে বিদ্যুৎ বিভ্রাট দেখিনি। ইদানীং হঠাৎ করে বিদ্যুৎ বিভ্রাট শুরু হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো জায়গায় এটি কখনোই কাম্য নয়।
প্রশাসনের বক্তব্য
গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী বলেন, আমি বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আবারও আলোচনা করব। হলগুলোতে লোডশেডিং কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে।
গ্যাস সংকটের বিষয়ে তিনি বলেন, ক্যান্টিন মালিকদের অভিযোগের বিষয়টি ইতোমধ্যে আমাদের নজরে এসেছে। আমরা সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করে দ্রুত সমাধানের উদ্যোগ নেব।