চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্ররাজনীতির মাঠে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে উঠে এসেছে ইসলামী ছাত্রশিবির ও জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল। আওয়ামী শাসনের অবসানের পর অন্তর্বর্তী সরকারের শুরুর দিকে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে না পারলেও চাকসু নির্বাচনে এজিএস পদে জয়লাভের মাধ্যমে ক্যাম্পাসে উপস্থিতি জানান দেয় ছাত্রদল। পরবর্তী সময়ে গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপি সরকার
গঠন করলে সরকার দলীয় ছাত্র সংগঠন হিসেবে ক্যাম্পাসে আরো সক্রিয় হয়ে ওঠে তারা।
অন্যদিকে, গত বছরের ১৫ অক্টোবর অনুষ্ঠিত সপ্তম চবি কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (চাকসু) নির্বাচনে ২৬টি পদের মধ্যে ২৪টিতে নিরঙ্কুশ জয়লাভ করে ছাত্রশিবির প্যানেল। এরপর থেকে কিছুটা চাপে ছিল ছাত্রদল। তবে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর দৃশ্যপট অনেকটা পাল্টে যায়। বিভিন্ন জাতীয় ও বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্ট ইস্যুকে ঘিরে সাম্প্রতিক ক্যাম্পাসে পাল্টাপাল্টি মিছিল ও কর্মসূচি পালন করতে দেখা যাচ্ছে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরকে।
সম্প্রতি চট্টগ্রাম সিটি কলেজে দেয়ালে গুপ্ত লেখা ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের ওপর হামলাকে কেন্দ্র করে দুই সংগঠনের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এর জেরে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পাল্টাপাল্টি বিক্ষোভ মিছিল করে শাখা ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা।
এছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) নেতারা ও সাংবাদিক সমিতির সদস্যদের ওপর ছাত্রদলের হামলার ঘটনায়ও বিক্ষোভ মিছিল করে শাখা ছাত্রশিবির। এসব কর্মসূচিতে উভয় পক্ষকে একে-অপরকে সন্ত্রাসী সংগঠন আখ্যা দিয়ে আক্রমণাত্মক স্লোগান ও বক্তব্য দিতে দেখা যায়।
ক্যাম্পাসের এমন পরিস্থিতিতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। শিক্ষার্থীরা আশঙ্কা করছেন, এই অবস্থা অব্যাহত থাকলে পড়াশোনার পরিবেশ ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ব্যাহত হতে পারে।
জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষার্থী আমার দেশকে বলেন, আমরা সাধারণ শিক্ষার্থীরা চাই ক্যাম্পাস স্বাভাবিক থাকুক। রাজনৈতিক পাল্টাপাল্টি কর্মসূচির কারণে পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটতে পারে, নিরাপত্তা নিয়েও দুশ্চিন্তা আছে।
এদিকে, ছাত্ররাজনীতি ও সাম্প্রতিক ক্যাম্পাস পরিস্থিতি নিয়ে একে অপরকে দোষারোপ করছে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির। জানতে চাইলে শাখা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল নোমান আমার দেশকে বলেন, ৫ আগস্টের আগে ক্যাম্পাসে একক আধিপত্য ছিল ছাত্রলীগের। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ছাত্রশিবির ক্যাম্পাসের নিয়ন্ত্রণ নেয়। এখনো যদি কোনো সংগঠন একক আধিপত্য বজায় রাখতে চায়, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই বাধা আসবে।
ক্যাম্পাসে শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ছাত্রদলের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ে কখনো শিক্ষার পরিবেশ ব্যাহত হয়নি এবং ভবিষ্যতেও হবে না। আমরা সহাবস্থানের রাজনীতিকে স্বাগত জানাতে প্রস্তুত, তবে একক আধিপত্যের চেষ্টা মেনে নেওয়া হবে না।
অন্যদিকে, শাখা ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি মোহাম্মদ পারভেজ বলেন, ৫ আগস্টের পর শিবির এমন কোনো কার্যক্রমে জড়ায়নি, যা শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট করতে পারে। আমরা এখনো যে কোনো অস্থিতিশীল বা অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে সতর্ক অবস্থানে রয়েছি।
ছাত্রদলের মধ্যে ছাত্রলীগের পুনর্বাসন করা হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ বিষয়ে আমরা ‘পরিমিত প্রতিবাদ’ করছি, যাতে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা না ঘটে। দেশের বিভিন্ন ক্যাম্পাসে ছাত্রদল উসকানিমূলক কার্যক্রম চালাচ্ছে, যার উদ্দেশ্য সংঘর্ষের পরিস্থিতি তৈরি করা। তবে এ ক্ষেত্রেও আমরা সতর্ক রয়েছি।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. ভূঁইয়া মো. মনোয়ার কবীর বলেন, ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির উভয়ই জুলাই গণঅভ্যুত্থানের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। ৫ আগস্টের আগে তারা একসঙ্গে রাজনীতি করেছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে দুই সংগঠনের কেন্দ্রীয় নেতাদের আলোচনায় বসে উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণে আনার উদ্যোগ নেওয়া উচিত। তা না হলে ক্যাম্পাসের শিক্ষার পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।