দেশে ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব, অর্থনৈতিক বৈষম্য ও কর্মসংস্থানের সংকট নিরসনে আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ১৮ লাখ ৩৯ হাজার ৯৪৮ কোটি টাকার “জাতীয় স্বপ্নবাজেট” প্রস্তাব করেছে মুভমেন্ট ফর ওয়ার্ল্ড এডুকেশন রাইটস (এমডব্লিউইআর)।
সংগঠনটির দাবি, ধারাবাহিকভাবে সাত বছর বছরে ১ কোটি ১০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা গেলে ২০৩৩ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে বেকারমুক্ত রাষ্ট্রে পরিণত করা সম্ভব হবে।
বুধবার (২০ মে) বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) মধুর ক্যান্টিনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ প্রস্তাবনা দেয় সংগঠনটি।
“সার্বভৌম দেশ, মানুষে বিনিয়োগ” প্রতিপাদ্যে প্রস্তাবিত এ বাজেটে বেকারত্ব সমস্যাকে সবচেয়ে বড় জাতীয় সংকট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
সংগঠনটির আহ্বায়ক ফারুক আহমাদ আরিফ বলেন, স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরও দেশের বিপুলসংখ্যক তরুণ কর্মসংস্থানের বাইরে রয়েছে। প্রতিবছর প্রায় ২২ লাখ মানুষ শ্রমবাজারে প্রবেশ করলেও চাকরি পাচ্ছে মাত্র ৭ লাখ মানুষ। ফলে প্রতিবছর নতুন করে অন্তত ১৫ লাখ বেকার যুক্ত হচ্ছে।
এমডব্লিউইআর তাদের প্রস্তাবে উল্লেখ করেছে, (বিবিএস)-এর ২০১৮ সালের তথ্য অনুযায়ী দেশে কর্মোপযোগী মানুষের সংখ্যা প্রায় ১০ কোটি ৯১ লাখ। এর মধ্যে ৬ কোটি ৮ লাখ মানুষ কর্মে নিয়োজিত থাকলেও প্রায় ৪ কোটি ৮২ লাখ মানুষ শ্রমশক্তির বাইরে রয়েছে। এ বাস্তবতায় রাষ্ট্রীয়ভাবে পরিকল্পিত বিনিয়োগ ছাড়া বেকারত্ব দূর করা সম্ভব নয় বলে মনে করেন তারা।
সংগঠনটির পরিকল্পনা অনুযায়ী, বছরে ৫ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ১ কোটি ১০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা হবে। এর মধ্যে কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীনে ২৫ লাখ, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ২৩ লাখ, সমুদ্রবিষয়ক, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ, নৌপরিবহন, পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের অধীনে ১৭ লাখ, প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ১৫ লাখ এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ১০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এছাড়া স্থানীয় সরকার, আইসিটি, শিল্প ও অর্থ মন্ত্রণালয়সহ অন্যান্য খাতেও নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির কথা বলা হয়েছে।
প্রস্তাবে শিক্ষিত ও অর্ধশিক্ষিত তরুণদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে সহজ শর্তে বড় অঙ্কের ঋণ দেওয়ার পরিকল্পনাও তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে মাস্টার্স পাস ১০ লাখ তরুণকে ৮ লাখ টাকা করে, অনার্স পাস ২০ লাখ তরুণকে ৭ লাখ টাকা করে, এইচএসসি পাস ৩০ লাখ তরুণকে ৫ লাখ টাকা করে এবং এসএসসি ও অষ্টম শ্রেণি পাস তরুণদের ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
সংগঠনটির হিসাব অনুযায়ী, এভাবে উদ্যোক্তা তৈরির মাধ্যমে কর্মসংস্থান যেমন বাড়বে, তেমনি উৎপাদন ও স্থানীয় অর্থনীতিও শক্তিশালী হবে।
ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রেও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছে। দ্বিতীয় বছর থেকে কিস্তিতে ঋণ পরিশোধ শুরু হবে এবং পাঁচ থেকে ছয় বছরের মধ্যে ঋণ পরিশোধ সম্পন্ন করার সুযোগ থাকবে।
সংগঠনটির দাবি, এ পদ্ধতিতে বছরে ১ লাখ ১১ হাজার কোটি টাকার বেশি অর্থ পুনরায় রাষ্ট্রীয় তহবিলে ফিরে আসবে।
এমডব্লিউইআর বলছে, দেশের অর্থনৈতিক সংকট কাটাতে পাচার হওয়া অর্থ ও কালো টাকা উদ্ধার করতে হবে। সংগঠনটির তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান –এর প্রতিবেদনে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচারের তথ্য উঠে এসেছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির হিসাব অনুযায়ী, দেশে কালো টাকার পরিমাণও কয়েক লাখ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। এসব অর্থ উদ্ধার করে কর্মসংস্থান ও উন্নয়ন খাতে বিনিয়োগের দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
বাজেট প্রস্তাবে শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতে ২ লাখ ৯২ হাজার ৩০০ কোটি টাকা বরাদ্দের কথা বলা হয়েছে, যা জিডিপির প্রায় ১৮ দশমিক ৭১ শতাংশ। এছাড়া কৃষিতে ৩ লাখ ৮১ হাজার ৪১২ কোটি টাকা, শিল্প ও অর্থনৈতিক সার্ভিসে ২ লাখ ৬ হাজার ৫৪৫ কোটি টাকা এবং স্বাস্থ্য খাতে ১ লাখ ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে।
শিক্ষাখাতে প্রস্তাবনার বিষয়ে সংগঠনটির শিক্ষা সম্পাদক উজ্জ্বল হোসেন বলেন, শিক্ষাখাতে প্রস্তাবনার মধ্যে রয়েছে শিক্ষাব্যবস্থার জাতীয়করণ, শিক্ষা ব্যাংক প্রতিষ্ঠা, শিক্ষাঋণ চালু, শিক্ষার্থীদের জন্য দৈনিক খণ্ডকালীন কাজের সুযোগ সৃষ্টি এবং ২০৫০ সালের মধ্যে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা পুরোপুরি রাষ্ট্রীয় অর্থায়নে বিনামূল্যে নিশ্চিত করা।
এছাড়া স্বাস্থ্যখাতে কমিউনিটিভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ, প্রত্যেক নাগরিককে স্বাস্থ্যবীমার আওতায় আনা, টেলিমেডিসিন ও প্রযুক্তিনির্ভর চিকিৎসা সেবা বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে।
কৃষিখাতে ইউনিয়নভিত্তিক কৃষি কর্মকর্তা নিয়োগ, কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতকরণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পূর্ণ ক্ষতিপূরণের দাবি জানানো হয়েছে।
সংগঠনটি মনে করছে, রাষ্ট্র যদি পরিকল্পিতভাবে মানবসম্পদ, শিক্ষা, কৃষি ও উদ্যোক্তা তৈরিতে বিনিয়োগ করে, তাহলে বাংলাদেশে দীর্ঘদিনের বেকারত্ব সংকট নিরসনের পাশাপাশি টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
এএস