দেশের তরুণ জনগোষ্ঠীর মেধা ও দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে ইন্ডাস্ট্রি ও অ্যাকাডেমিয়ার মধ্যে কার্যকর সমন্বয় বা লিংকেজ গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। তিনি বলেছেন, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হওয়ার পরপরই শিক্ষার্থীরা যাতে কর্মসংস্থানের সুযোগ পায়, সেজন্য শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আরো ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি করা প্রয়োজন।
বুধবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মার্কেটিং অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন (MAA) ও মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ (MGI) আয়োজিত বৃত্তি প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বা তরুণ মেধা শক্তিই দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ। আজকের নতুন যুগে এআই এবং আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়ায় শিক্ষার ধরন বদলে গেছে। আগামী দিনের বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দিতে হলে শিক্ষাখাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে বর্তমান সরকার শিক্ষায় যে বাজেট ও গুরুত্ব দিচ্ছে, তার সুফল পাবে তরুণ প্রজন্ম।’
ইন্ডাস্ট্রি-অ্যাকাডেমিয়া লিংকেজের ঘাটতির কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশে ইন্ডাস্ট্রি ও অ্যাকাডেমিয়ার মধ্যে যে সমন্বয় বা লিংকেজ থাকা দরকার, তা এখনো যথেষ্ট নয়। চীন বা উন্নত বিশ্বে দেখা যায়, বড় বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ভেতরেই কারিগরি ও উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান থাকে। সেখানে প্রাকটিক্যাল ট্রেনিংয়ের মাধ্যমে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা হয় এবং কোম্পানিগুলো তাদের সরাসরি হায়ার করে।’
তিনি বলেন, বাংলাদেশেও এ ধরনের লিংকেজ জোরদার করা প্রয়োজন, যাতে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হওয়ার পরপরই শিক্ষার্থীরা কর্মসংস্থানের সুযোগ পায়। দেশের তরুণ প্রজন্মের মেধা ও দক্ষতা কোনো অংশে কম নয়।
নিজের শিক্ষাজীবনের উদাহরণ তুলে ধরে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, তিনি বিজ্ঞানের শিক্ষার্থী হয়েও বিদেশে ইন্টারন্যাশনাল মার্কেটিংয়ে এমবিএ করেছেন, যাতে সময় ও চাহিদার সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারেন। পরবর্তীতে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার উন্নয়নে কাজ করার সুযোগ পেয়েছেন বলে জানান তিনি।
দেশের উন্নয়নে তরুণদের মেধা ও দক্ষতাকে কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্ব দিয়ে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, কারিগরি ও কর্মমুখী শিক্ষার মাধ্যমে দেশের জনসংখ্যাকে দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত করতে হবে। সেই সাথে শিক্ষার্থীদের আধুনিক প্রযুক্তিতে দক্ষতা অর্জন করতে হবে।
বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে কার্যকর সম্পর্ক গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের প্রশিক্ষণ ও গবেষণায় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো সহযোগিতা করলে এর সুফল ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান ছাড়িয়ে পুরো সমাজে পৌঁছাবে।
তিনি দেশের সম্ভাবনাময় বিভিন্ন খাতের কথাও তুলে ধরেন। শিক্ষামন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের ২০০ নটিক্যাল মাইল এক্সক্লুসিভ ইকোনমিক জোন এবং প্রায় ৪০০ নটিক্যাল মাইলের মহীসোপান রয়েছে। বঙ্গোপসাগরের তলদেশে থাকা বিপুল খনিজ ও প্রাকৃতিক সম্পদের সম্ভাবনা এখনো পুরোপুরি কাজে লাগানো হয়নি।
তিনি বলেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৮১ সালেই বঙ্গোপসাগরের এই সম্ভাবনার কথা দেখেছিলেন, যা বর্তমানে বিশ্বজুড়ে ‘ব্লু ইকোনমি’ হিসেবে পরিচিত। এ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির প্রয়োজনীয়তার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক ভূমিকার কথা উল্লেখ করে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, দেশের প্রতিটি ঐতিহাসিক অর্জনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদান অনস্বীকার্য। শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘তোমরা বিশ্ব জয় করো, নতুন জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা অর্জন করো, তবে দিনশেষে ফিরে এসো এই নিজ মাতৃভূমিতে। তোমরাই আগামীর বাংলাদেশ। নিজেদের মেধা, দক্ষতা ও দেশপ্রেম দিয়ে তোমরাই বাংলাদেশকে বিশ্বের দরবারে শ্রেষ্ঠ জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করবে।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার সময়ের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের ভিপি থাকাকালে শিক্ষার্থীদের কল্যাণে ‘অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন’ ও ‘এলাকা অ্যাসোসিয়েশন’ গঠনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। সে সময় নামমাত্র খরচে মানসম্মত খাবারের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের সহযোগিতার প্রয়োজন ছিল বলে জানান তিনি।
অ্যালামনাইদের ভূমিকা তুলে ধরে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, একটি অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের ৪০ বছর পূর্তি উদযাপনের সময় বেকার অ্যালামনাইদের কর্মসংস্থানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। অনুষ্ঠানে আসা তৎকালীন বিভিন্ন সচিব ও মন্ত্রীদের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দিয়ে অনেক প্রার্থীর কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হয়েছিল বলেও জানান তিনি।
৯০ শিক্ষার্থী পেলেন ২১ লাখ ৬০ হাজার টাকার বৃত্তি
অনুষ্ঠানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের বিভিন্ন শিক্ষাবর্ষের ৯০ জন মেধাবী শিক্ষার্থীকে মোট ২১ লাখ ৬০ হাজার টাকা ‘MGI-MAA বৃত্তি’ দেওয়া হয়। বৃত্তিপ্রাপ্ত প্রত্যেক শিক্ষার্থী ২৪ হাজার টাকা করে পেয়েছেন।
‘MGI-MAA Scholarship’ নামে গঠিত এক কোটি টাকার স্থায়ী তহবিলের আয় থেকে এ বৃত্তি প্রদান করা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মার্কেটিং অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন ও মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ যৌথভাবে এ বৃত্তি কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এর মাধ্যমে বিভাগের মেধাবী শিক্ষার্থীদের আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি উচ্চশিক্ষা ও গবেষণায় উৎসাহিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বৃত্তিপ্রাপ্ত ৯০ শিক্ষার্থীর মধ্যে ২০১৯-২০২০ শিক্ষাবর্ষের একজন, ২০২০-২০২১ শিক্ষাবর্ষের দুজন, ২০২১-২০২২ শিক্ষাবর্ষের দুজন, ২০২২-২০২৩ শিক্ষাবর্ষের ১৬ জন, ২০২৩-২০২৪ শিক্ষাবর্ষের ১৪ জন, ২০২৪-২০২৫ শিক্ষাবর্ষের ১৮ জন এবং ২০২৫-২০২৬ শিক্ষাবর্ষের ৩৭ জন রয়েছেন।
অনুষ্ঠানে প্রধান পৃষ্ঠপোষক হিসেবে বক্তব্য রাখেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম। তিনি বলেন, আর্থিক সমস্যার কারণে যেন কোনো মেধাবী শিক্ষার্থীর পড়াশোনা বাধাগ্রস্ত না হয়, সেদিকে নজর দিতে হবে। শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষা ও গবেষণায় সহযোগিতার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যালামনাই ও সমাজের বিত্তবানদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।
উপাচার্য বলেন, শিক্ষার্থীদের কল্যাণে বিশ্ববিদ্যালয় বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। মার্কেটিং বিভাগের শিক্ষার্থীদের বৃত্তি প্রদানের জন্য এক কোটি টাকার একটি স্থায়ী তহবিল গঠন করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণার উন্নয়নে সরকারি অর্থায়নের পাশাপাশি অ্যালামনাই ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোকেও এগিয়ে আসতে হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক সক্ষমতা বাড়াতে কেন্দ্রীয়ভাবে একটি এন্ডাউমেন্ট ফান্ড গঠনের ওপরও গুরুত্বারোপ করেন উপাচার্য। তাঁর মতে, অ্যালামনাই ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সহযোগিতা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণার মানোন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
মার্কেটিং অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. আবদুস সালাম, প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী এবং মার্কেটিং বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. সিরাজুল হক বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। অতিথি হিসেবে ছিলেন মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের পরিচালক ব্যারিস্টার তাসনিম মোস্তফা। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন মার্কেটিং অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক খন্দকার মো. রাফিক হাসান।