যুক্তরাষ্ট্রের কানেকটিকাট রাজ্যের স্টেট সিনেটর এমডি মাসুদুর রহমানের পথচলা যেন এক অভিবাসীর স্বপ্ন পূরণের গল্প। বাংলাদেশ থেকে কয়েকশ ডলার ও একটি ব্যাকপ্যাক নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি দেওয়া এই বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত নাগরিক আজ কানেকটিকাটের মূলধারার রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছেন।
চাঁদপুরের হাজীগঞ্জে জন্ম নেওয়া এমডি মাসুদুর রহমান বর্তমানে কানেকটিকাট স্টেট সিনেটের ৪র্থ জেলার প্রতিনিধিত্ব করছেন। এই জেলার আওতাভুক্ত রয়েছে ম্যানচেস্টার, গ্ল্যাস্টনবারি, অ্যান্ডোভার ও বোল্টন শহর।
২০২২ সালের নির্বাচনে ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থী হিসেবে প্রথমবার স্টেট সিনেটর নির্বাচিত হন তিনি। এরপর বড় ব্যবধানে জয় পেয়ে দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে তিনি তৃতীয়বারের মতো একই পদে নির্বাচনের জন্য দলীয় মনোনয়ন পেয়েছেন।
সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে নিজের রাজনৈতিক যাত্রা ও সংগ্রামের কথা তুলে ধরে এমডি রহমান বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে আসার পর তার শুরুটা মোটেও সহজ ছিল না।
তিনি বলেন, “আমি বাংলাদেশ থেকে আমেরিকায় এসেছিলাম মাত্র কয়েকশ ডলার ও একটি ব্যাকপ্যাক নিয়ে। শুরুতে অনেক কষ্ট করতে হয়েছে। বিভিন্ন কাজ করেছি, সংগ্রাম করেছি। কিন্তু লক্ষ্য ঠিক থাকলে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব।”
যুক্তরাষ্ট্রে আসার পর প্রথমে নিউইয়র্কে অবস্থান করলেও পরে কানেকটিকাটে স্থায়ী হন তিনি। জীবনের শুরুতে বিভিন্ন সাধারণ কাজ করার পাশাপাশি ধীরে ধীরে ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হন।
পরবর্তীতে তিনি স্বাস্থ্যসেবা, আমদানি-রপ্তানি, নির্মাণসহ বিভিন্ন খাতে ব্যবসা গড়ে তোলেন। বর্তমানে তিনি একাধিক প্রতিষ্ঠানের মালিক ও পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত। তার প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কানেকটিকাটে হাজার হাজার কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে বলে জানান তিনি।
ব্যবসায় সফলতার পর সামাজিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হন এমডি রহমান। বাংলাদেশি কমিউনিটির বিভিন্ন কার্যক্রমের পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ের বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে কাজ করতে শুরু করেন।
রাজনীতিতে আসার পেছনে কমিউনিটির প্রতিনিধিত্বের অভাবকে অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।
এমডি রহমান বলেন, “আমি দেখেছি আমাদের কমিউনিটি থেকে মূলধারার রাজনীতিতে প্রতিনিধিত্ব খুব কম। স্টেট সিনেট, কংগ্রেস বা গুরুত্বপূর্ণ পদে আমাদের উপস্থিতি ছিল না। তখন মনে হয়েছে, আমাদের কাউকে এগিয়ে আসতে হবে।”
ডেমোক্রেটিক পার্টির বিভিন্ন কার্যক্রমে সক্রিয় থাকার মাধ্যমে তিনি ধীরে ধীরে দলের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে যুক্ত হন। স্থানীয় রাজনীতিবিদ থেকে শুরু করে জাতীয় পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে কাজের সুযোগ পান তিনি।
২০২২ সালে স্টেট সিনেট নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। ওই সময় তাকে চ্যালেঞ্জ করতে হয়েছিল দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ এক রাজনীতিবিদকে।
তিনি বলেন, “অনেকে বলেছিলেন এটি বড় একটি পদ, ছোট জায়গা থেকে শুরু করা উচিত। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি নেতৃত্বের জন্য বড় লক্ষ্য থাকা প্রয়োজন।”
নির্বাচনে জয় পাওয়ার পর এমডি রহমান সিনেটে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি বর্তমানে কানেকটিকাট স্টেট সিনেটের পরিকল্পনা ও উন্নয়ন কমিটির চেয়ারম্যান। এছাড়া বাণিজ্য, স্বাস্থ্য, অর্থ ও বিচার বিষয়ক কমিটিতেও দায়িত্ব পালন করছেন।
তার নেতৃত্বে আবাসন সংকট মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে কম আয়ের মানুষের জন্য আবাসনের সুযোগ বাড়াতে কাজ করছেন বলে জানান তিনি।
এমডি রহমান বলেন, “জনগণের জীবন সহজ করা এবং প্রয়োজনীয় সুযোগ তৈরি করাই আমাদের কাজ। মানুষের জন্য কাজ করলে মানুষ তার মূল্যায়ন করে।”
বাংলাদেশি কমিউনিটির ভবিষ্যৎ নিয়েও আশাবাদী তিনি। তার মতে, শুধু ব্যবসা বা চাকরির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে বাংলাদেশিদের রাজনীতিতে সক্রিয় হতে হবে।
তিনি বলেন, “আমাদের কণ্ঠস্বর শক্ত করতে হলে রাজনীতিতে অংশ নিতে হবে। স্থানীয় পর্যায় থেকে শুরু করে স্টেট ও ফেডারেল পর্যায়ে আমাদের প্রতিনিধিত্ব প্রয়োজন।”
বাংলাদেশের তরুণদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, সফলতার জন্য লক্ষ্য নির্ধারণ, কঠোর পরিশ্রম এবং আত্মবিশ্বাস জরুরি।
“আপনি কতবার ব্যর্থ হলেন সেটা গুরুত্বপূর্ণ নয়, গুরুত্বপূর্ণ হলো আপনি কতবার উঠে দাঁড়ালেন,” বলেন তিনি।
চাঁদপুরের একটি সাধারণ পরিবার থেকে উঠে এসে যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট সিনেটে জায়গা করে নেওয়া এমডি মাসুদুর রহমানের গল্প এখন অনেক প্রবাসী বাংলাদেশির জন্য অনুপ্রেরণার বিষয় হয়ে উঠেছে।