বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিনির্ভর প্রাগ্রসর বিশ্বে একটি সমৃদ্ধ, আধুনিক ও মানবিক বাংলাদেশ বিনির্মাণে অংশীদার হওয়ার প্রত্যয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (যবিপ্রবি)। এ লক্ষ্যকে প্রাধান্য দিয়ে রচিত হয় প্রতিষ্ঠানটির রূপকল্প ও অভিলক্ষ্য। এটি বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বৃহত্তম যশোরে প্রথম ও একমাত্র পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়। ২০০৭ সালের ২৫ জানুয়ারি যশোর উপজেলার চুড়ামনকাটি ইউনিয়নের সাজিয়ালী মৌজায় ৩৫ একর জায়গা জুড়ে বিশ্ববিদ্যালয়টি স্থাপিত হয়। ২০০৮-০৯ শিক্ষাবর্ষে এর শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়। পরে ২০২৩ সালের ৭ মার্চ যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের রিজেন্ট বোর্ডের ৮৮তম সভায় ঝিনাইদহ ভেটেরিনারি কলেজ (১০ একর) যবিপ্রবির ভেটেরিনারি মেডিসিন অনুষদ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত হয়। দুই ক্যাম্পাস মিলে ৪৫ একর যবিপ্রবির ক্যাম্পাস। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই তার রূপকল্প ও অভিলক্ষ্য বাস্তবায়নে নিরন্তর কাজ করে যাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি, যার ফল মূর্তরূপে উদ্ভাসিত হতে শুরু করেছে কয়েক বছর ধরে। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় শিক্ষা, গবেষণা, সামাজিক দায়বদ্ধতা প্রতিপালন এবং উদ্ভাবনী কর্মকাণ্ডে অসামান্য সাফল্যের স্বাক্ষর রেখেছে যবিপ্রবি। এ সাফল্যের জন্য অর্জিত হয়েছে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও। কিন্তু যবিপ্রবি আত্মতুষ্ট হয়ে থেমে যায়নি, বরং নবোদ্যমে দেশ পরিবর্তনের প্রত্যয়ে নবযাত্রা শুরু করেছে। একটি নবীন বিশ্ববিদ্যালয় কীভাবে এগিয়ে যাচ্ছে, সে বিষয়টি দেশবাসীকে অবহিত করার জন্য যবিপ্রবির অর্জন, অগ্রগতি ও এগিয়ে চলার পথ-পরিক্রমা নিয়ে লিখেছেন জবিপ্রবির উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল মজিদ।
একাডেমিক প্রোগ্রাম
প্রযুক্তিনির্ভর এই বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে শিক্ষার প্রসার এবং গবেষণায় যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (যবিপ্রবি) সমানভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় যবিপ্রবিতে রয়েছে আটটি অনুষদ। যেমন : প্রকৌশল ও প্রযুক্তি অনুষদ, জীববিজ্ঞান ও প্রযুক্তি অনুষদ, ফলিত বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি অনুষদ, বিজ্ঞান অনুষদ, ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদ, কলা ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ, স্বাস্থ্যবিজ্ঞান অনুষদ ও ভেটেরিনারি মেডিসিন অনুষদ। বিভাগের সংখ্যা ৩৮। যবিপ্রবিতে ইনস্টিটিউট ফর হায়ার এডুকেশন অ্যান্ড রিসার্চ নামে একটি ইনস্টিটিউট রয়েছে। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ে দেশি ও বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৫ হাজার ৯১ জন, ৩৩৮ জন শিক্ষক, ১৬২ জন কর্মকর্তা, ৩৪৪ জন কর্মচারী রয়েছেন।
আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি
যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় তার শিক্ষা, গবেষণা ও সামাজিক দায়বদ্ধতা প্রতিপালনে অসামান্য অবদানের জন্য আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করতে শুরু করেছে। যুক্তরাজ্যভিত্তিক শিক্ষা সাময়িকী Times Higher Education (THE) কর্তৃক ২০২৫ সালে প্রকাশিত ‘ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র্যাংকিং ২০২৫’-এ যৌথভাবে বাংলাদেশের অন্যতম সেরা বিশ্ববিদ্যালয় হওয়ার গৌরব অর্জন করেছে যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।
গবেষণায় অর্জন
একটি নবীন বিশ্ববিদ্যালয় হওয়া সত্ত্বেও গবেষণাপত্র প্রকাশনায় অনেক প্রবীণ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়কেও ছাড়িয়ে গেছে যবিপ্রবি। বিগত কয়েক বছরের স্কোপাস ইনডেক্সট জার্নালসহ অন্যান্য প্রকাশনার সংখ্যা দেখলে তা সহজেই অনুধাবন করা যায়।
বিশ্বসেরা দুই শতাংশ গবেষকদের তালিকায় যবিপ্রবি
বিশ্বসেরা দুই শতাংশ গবেষকের তালিকায় ২০২৫ সালে স্থান পেয়েছেন যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের আটজন আটজন শিক্ষক, যা দেশের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ এবং দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে নবম। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় এবং নেদারল্যান্ডসভিত্তিক বিশ্বের প্রথম সারির চিকিৎসা ও বিজ্ঞানবিষয়ক নিবন্ধ প্রকাশনা সংস্থা ‘এলসেভিয়ার’ কর্তৃক পরিচালিত সমন্বিত জরিপে ছয় বছর ধরে যবিপ্রবির তিনজন শিক্ষক এ তালিকায় ধারাবাহিকভাবে স্থান পেয়ে আসছেন।
যুগোপযোগী শিক্ষা কার্যক্রম
যুগোপযোগী শিক্ষা কার্যক্রম ও চাহিদাভিত্তিক করার জন্য পদক্ষেপে গ্রহণ করা হয়েছে। একাডেমিয়া-ইন্ডাস্ট্রি সম্পর্ককে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে সব বিভাগের জন্য যুগোপযোগী ‘আউটকাম-বেইজড’ কারকিুলাম প্রণয়ন করে এ বিশ্ববিদ্যালয় চতুর্থ শিল্পবিপ্লব মোকাবিলায় পূর্ণ প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে।
উচ্চশিক্ষা, পিএইচডি ও স্কলারশিপ
যবিপ্রবির শিক্ষার্থীরা আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, জাপান, কোরিয়া, চীনসহ ইউরোপের নামকরা সব বিশ্ববিদ্যালয়ে স্কলারশিপ ও ফেলোশিপ নিয়ে সুনামের সহিত এমএস, এমফিল, পিএইচডি করছে। যবিপ্রবিতে এ পর্যন্ত ২৫টি বিভাগে পিএইচডি প্রোগ্রাম চালু রয়েছে।
ল্যাব ও সেন্টার
শিক্ষা, গবেষণা এবং সমাজসেবা বা সামাজিক
দায়বদ্ধতা প্রতিপালনের জন্য যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় বহুসংখ্যক গবেষণাগার ও সেন্টার স্থাপন করেছে।
এসব গবেষণাগার ও সেন্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা এবং গবেষণা কার্যক্রমে সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে গবেষণা সহযোগিতা করে যাচ্ছে।
শিক্ষাবৃত্তি ও রিসার্চ ফেলোশিপ
শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষা এবং গবেষণায় অনুপ্রাণিত করার লক্ষ্যে যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষাবৃত্তি ও রিসার্চ ফেলোশিপ চালু করেছে। এই শিক্ষাবৃত্তি শিক্ষার্থীদের মেধা, যোগ্যতা ও আর্থিক প্রয়োজনের ভিত্তিতে প্রদান করা হয়, যা তাদের চাপমুক্ত পরিবেশে পড়াশোনায় মনোযোগী হতে সহায়তা করে।
ভিজিটিং প্রফেসর নিয়োগ
বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচজন বিশ্বসেরা বিজ্ঞানী সম্প্রতি যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবে যোগ দিয়েছেন। তারা হলেন মালয়েশিয়ার সানওয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. সাইদুর রহমান, জাপানের তহুকো বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক তাডাহেরু কোমেডা, চীনের জর্জিয়া টেক সেনজেন ইনস্টিটিউটের খণ্ডকালীন সহকারী অধ্যাপক মোহাম্মদ আলী সাদ, জাপানের টোকিও ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির ম্যাটেরিয়ালস সায়েন্স বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক তমোহিরো হায়েসি এবং চীনের হেনান বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক জিউহা লিউ। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শারীরিক শিক্ষা ও ক্রীড়া বিজ্ঞান এবং ফিজিওথেরাপি অ্যান্ড রিহ্যাবিলিটেশন বিভাগে ভিজিটিং প্রফেসর রয়েছেন।
HEAT Project ও সমঝোতা স্মারক
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) ‘হায়ার এডুকেশন অ্যাক্সেলারেশন অ্যান্ড টেকনোলজি’ বা হিট প্রজেক্টের আওতায় ২০২৫ সালে যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (যবিপ্রবি) বিভিন্ন অনুষদের পাঁচটি প্রকল্প অনুমোদন লাভ করেছে।
কনফারেন্স
গবেষণা ও জ্ঞানবিনিময়ের সুযোগ তৈরি করা এবং শিক্ষক, শিক্ষার্থী, গবেষক ও বিশেষজ্ঞদের আবিষ্কার, মতামত এবং অভিজ্ঞতা একে অন্যের সঙ্গে যেন সহজে বিনিময় করতে পারেন, সেই লক্ষ্যে যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় নিয়মিত জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক কনফারেন্স আয়োজন করে থাকে। এসব কনফারেন্সের মাধ্যমে অংশগ্রহণকারীরা একাডেমিক দক্ষতা, সমালোচনামূলক চিন্তা ও উপস্থাপনার ক্ষমতা বাড়াতে পারে এবং দেশি-বিদেশি গবেষক ও পেশাজীবীদের সঙ্গে নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে পারে। এসব কনফারেন্স সমাজ, প্রযুক্তি ও শিল্প খাতের বাস্তব সমস্যার সমাধানে একাডেমিক জ্ঞানকে কাজে লাগানোর সুযোগ সৃষ্টি করে, যা গবেষণার প্রয়োগ ও নীতি প্রণয়নে কার্যকর ভূমিকা রাখতে সহায়তা করবে।
সামাজিক কার্যক্রম
যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি শিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান নয়, একই সঙ্গে এটা একটা সামাজিক প্রতিষ্ঠানও, যা সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা প্রতিপালনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এ লক্ষ্যে সমাজের সার্বিক উন্নয়ন, মানুষের কল্যাণ এবং মানবিক সহযোগিতার উদ্দেশ্যে যবিপ্রবি বিভিন্ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে থাকে। এ কার্যক্রমের অংশ হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টার এ অঞ্চলের রোগীদের জরুরি আউটডোর চিকিৎসাসেবা দিয়ে থাকে। মাঝেমধ্যে মেডিকেল ক্যাম্প আয়োজন করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিজিওথেরাপি অ্যান্ড রিহ্যাবিলিটেশন (পিটিআর) বিভাগ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস এবং যশোর শহরে মাঝেমধ্যে বিনামূল্যে ফিজিওথেরাপি সেবা দিয়ে থাকে।
শিক্ষার্থীদের ক্যারিয়ার ও মানসিক স্বাস্থ্য বিকাশে উদ্যোগ গ্রহণ
যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (যবিপ্রবি) ছাত্র পরামর্শ ও নির্দেশনা দপ্তর শিক্ষার্থীদের সামগ্রিক মানোন্নয়নে ‘তুমিই পারবে’, ‘আচরণেই আত্মপরিচয়’ এবং ‘তোমার পাশে সবসময়’ শীর্ষক তিনটি বিশেষ কর্মসূচি চালু করেছে। এই উদ্যোগের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের ক্যারিয়ার গাইডলাইন প্রদান, আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি, শৃঙ্খলা বোধ ও নৈতিক মূল্যবোধের চর্চা এবং শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নয়ন নিশ্চিত করা হচ্ছে। কর্মসূচির আওতায় উচ্চশিক্ষা ও ক্যারিয়ারবিষয়ক সেমিনার, সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে ব্যক্তিক পরামর্শ, শ্রেণিকক্ষে আচরণগত সচেতনতা বৃদ্ধি এবং মেধাবী ও অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের আর্থিক সহায়তা প্রদানসহ বিভিন্ন বাস্তবমুখী কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
অ্যান্টি র্যাগিং কার্যক্রম
যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়কে র্যাগিং ও সব ধরনের হয়রানি মুক্ত রাখতে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। যদি কোনো শিক্ষার্থী র্যাগিং বা কোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত হয়রানির শিকার হয়, তাহলে সে তাৎক্ষণিকভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল বডিকে ফোনে অথবা সরাসরি জানাতে পারবে।
যৌন নিপীড়ন প্রতিরোধে অভিযোগ কমিটি
যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে কেউ যেন কোনো ধরনের যৌন হয়রানির শিকার না হন, সে জন্য হাইকোর্টের হাইকোর্ট ডিভিশনের নির্দেশনার আলোকে গঠন করা হয়েছে অভিযোগ কমিটি। বিশ্ববিদ্যালয়ে কেউ যদি শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারী বা অন্য কোনো ব্যক্তি কর্তৃক যৌন হয়রানিসহ অন্য কোনো ধরনের হয়রানির শিকার হন, তাহলে তিনি এ কমিটির নিকট অভিযোগ দাখিল করতে পারবেন। অভিযোগ দাখিল করার জন্য উন্মুক্ত স্থানে অভিযোগ বাক্স বসানো হয়েছে।