পেটে ছুরি ধরে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের চার শিক্ষার্থীর কাছ থেকে ৩০ হাজার টাকা ছিনতাইয়ের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায়, ভুক্তভোগী এক শিক্ষার্থীকে ছুরিকাঘাতে আহত করা হয় এবং বাকিদেরকে গাছের ঢাল দিয়ে মারধর করা হয়।
এ ঘটনার নেপথ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদল নেতা আরিফ ফয়সালের সম্পৃক্ততার প্রমাণ উঠে এসেছে। আমার দেশের জিজ্ঞাসাবাদে টাকা নেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছেন তিনি।
তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের কমিউনিকেশন ডিজঅর্ডার বিভাগের শিক্ষার্থী। তার হল কবি জসিমউদ্দিন হল হলেও রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে তিনি থাকেন শেখ মুজিবুর রহমান হলের ৬১২ নাম্বার রুমে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দিনাজপুর-৩ আসনের ছাত্রদলের নির্বাচন সমন্বয় কমিটিতে রয়েছেন তিনি।
ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীদের অভিযোগ অনুযায়ী, রবিবার (২৫ জানুয়ারি) রাত আনুমানিক ৮টার দিকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের রমনা পার্ক সংলগ্ন এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। আহত ও ভুক্তভোগী চার শিক্ষার্থী হলেন- সৌরভ হাসান, মিফতাহুল শাহরিয়ার নিয়াজ, দিয়ান পারভেজ ও মাহি ইসলাম। তারা সবাই স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের আইন বিভাগের শিক্ষার্থী।
ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী মিফতাহুল শাহরিয়ার মিয়াজ জানান, তারা উদ্যানের ভেতর দিয়ে রমনার দিকে হাঁটছিলেন। এ সময় কয়েকজন যুবক তাদের ডেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচয় জানতে চায়। পরে তাদের বসতে বাধ্য করা হয়। একপর্যায়ে কথাকাটাকাটির মধ্যে তাকে মারধর শুরু করা হয়।
আরেক শিক্ষার্থী সৌরভ হাসান বলেন, ছিনতাইকারীরা তাদের মানিব্যাগ, মোবাইল ফোন, বিকাশ ও নগদ অ্যাকাউন্ট চেক করে এবং এমনকি ফোনের গ্যালারিও তল্লাশি করে। দিয়ান পারভেজ অভিযোগ করেন, তাদের নেশাদ্রব্য দিয়ে ফাঁসানোর ভয় দেখিয়ে ‘প্রলয় গ্যাং’ পরিচয়ে পুলিশে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয় এবং ব্ল্যাকমেইল করা হয়।
ভুক্তভোগীদের ভাষ্য অনুযায়ী, বাকবিতণ্ডার একপর্যায়ে মিফতাহুল শাহরিয়ার মিয়াজকে ছুরি দিয়ে আঘাত করা হয়। এতে তার চোখ ও কপালে জখম হয় এবং রক্তক্ষরণ শুরু হয়। বাকি তিন শিক্ষার্থীকে গাছের ডাল ভেঙে পায়ে আঘাত করা হয়।
তারা জানান, শুরুতে ছিনতাইকারীর সংখ্যা দুইজন থাকলেও পরে তা বেড়ে সাতজনে দাঁড়ায়। এর মধ্যে তিনজন সরাসরি নির্যাতনে অংশ নেয়।
ভুক্তভোগীরা জানান, তাদের কাছ থেকে নগদ অ্যাকাউন্ট থেকে ১৫ হাজার টাকা এবং হাতে থাকা আরও ১৫ হাজার টাকা- মোট ৩০ হাজার টাকা ছিনতাই করা হয়। পরে তারা জানতে পারেন, নগদ থেকে জোরপূর্বক ক্যাশআউট করা অর্থটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সূর্য সেন হল এলাকার শাকিলের দোকানের একটি নগদ এজেন্ট নম্বরে নেওয়া হয়েছে।
ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীরা জানান, তারা ছিনতাইকারীদের ব্যক্তিগতভাবে চেনেন না। তবে দ্বিতীয়বার দেখলে তারা শনাক্ত করতে পারবেন।
ঘটনার সূত্র ধরে লেনদেনকৃত দোকানের সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে আমার দেশ। ভিডিওতে দেখা যায়, রাত ৮টা ৬ মিনিটে দোকানে আসেন অভিযুক্ত আরিফ ফয়সাল। তিনি নগদে ক্যাশআউটের বিষয়ে জিজ্ঞাসা করেন এবং পরে ১৫ হাজার টাকা সংগ্রহ করে রাত ৮টা ৮ মিনিটে দোকান ত্যাগ করেন। ফুটেজে তার মোবাইল ফোনে কথোপকথন থেকেও বোঝা যায়, তিনি পরিচিত ও সমবয়সীদের সঙ্গে কথা বলছিলেন।
জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, অভিযুক্ত আরিফ ফয়সাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের কমিউনিকেশন ডিজঅর্ডার বিভাগের শিক্ষার্থী। তিনি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দিনাজপুর-৩ আসনের ছাত্রদলের নির্বাচন সমন্বয় কমিটির সমন্বয়ক ছিলেন। এছাড়া ছাত্রদলের বিভিন্ন কর্মসূচিতে কেন্দ্রীয় ও হল পর্যায়ের একাধিক নেতার সঙ্গে তার উপস্থিতির ছবি ও তথ্য এই আমার দেশের হাতে এসেছে।
এ বিষয়ে আরিফ ফয়সালের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, "আমার এক বন্ধু টাকা দেওয়ার জন্য নম্বর চেয়েছিল। সে টাকা পাঠিয়েছে। কিন্তু তখন আমি পুরো ঘটনার বিস্তারিত জানতাম না।"
তিনি বলেন, "পরে বিস্তারিত ঘটনা জানার পর ভুক্তভোগীদের সঙ্গে দেখা করে বিষয়টি আমরা ‘সমাধান’ করেছি।"
কারা সরাসরি ছিনতাইয়ের সঙ্গে জড়িত ছিল জানতে চাইলে তিনি সরাসরি দেখা করতে প্রতিবেদনকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শেখ মুজিবুর রহমান হলে যেতে বলেন। তবে হলে গিয়ে তাকে আর পাওয়া যায়নি। পরবর্তী সময়ে ফোন কলেও একাধিক বার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।
পরদিন আরিফ ফয়সালের রুমমেট ও হল সংশ্লিষ্টদের জিজ্ঞাসা করা হলে তারা জানান, "গতকাল থেকে তিনি হলে আসেন নি। ফোনও রিসিভ করছেন না।"
জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সভাপতি গণেশ চন্দ্র রায় সাহস জানান, তিনি এ বিষয়ে অবগত নন।
তিনি বলেন, “ছিনতাইকারী যে দলেরই হোক, তাদের ধরে পুলিশের হাতে তুলে দিতে হবে।”
জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর সাইফুদ্দিন আহমদ বলেন, আমরা এ ঘটনা সম্পর্কে অবগত নই। এ ঘটনায় এখনো কেউ প্রক্টর অফিসে লিখিত অভিযোগ দেয়নি। অভিযোগ পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।