‘বাহ্, কী দারুণ লাল!’
বৃষ্টি সবে থেমেছে। বাড়ির পেছনে একটা পুকুর। সেদিকে গোল গোল চোখে তাকাল ছোট্ট ঋতু। তার বয়স মোটে সাত। পুকুরের পানি কালচে। তাতে অনেক শ্যাওলা। সামান্য দূরে ফুটে আছে চমৎকার এক লাল শাপলা। যেন একটা লাল তারা মিটমিট করে হাসছে।
ঋতু ভাবল, আরেকটু সামনে যেতে হবে। তাহলেই টুক করে ছেঁড়া যাবে শাপলাটাকে। ফুলটা সে রাখবে পড়ার টেবিলে। রুমটার চেহারাই বদলে যাবে। ঋতু এদিক-ওদিক ঘাড় ঘোরাল। নাহ্, বড়রা কেউ নেই।
ব্যস! সে গুটিগুটি পায়ে এগোতে লাগল। একাই চলে গেল পুকুরের দিকে।
টানা বর্ষা চলছে। পুকুরপাড়ের মাটি সাবানের মতো পিচ্ছিল। ঋতু হাত বাড়াল শাপলা ধরার জন্য। অমনি তার পা গেল পিছলে।
‘আ...আ...!’ চিৎকার করতে না করতেই ধপাস!
সর্বনাশ! ঋতু একদম সাঁতার জানে না। পুকুরধারে ছিল একগাদা কচুরিপানা। আর ছিল একটা সরু ডাল। ঋতু খপ করে আঁকড়ে ধরল ডালটা। কিন্তু তার ভার নিতে না পেরে ডালটি ভাঙতে শুরু করল। মড়মড়। এখন উপায়?
উঠোনের একপাশে খেলছিল জিতু। ঋতুর বড় ভাই। বয়স এগারো। শব্দ শুনে দৌড়ে এলো। তাকাল পুকুরের দিকে। দেখেই তো রক্ত হিম! পুকুরের ওপর ঋতু একটা ভাঙা ডাল ধরে ঝুলছে। ডালটা প্রায় ছিঁড়ে যাচ্ছে। আর মাত্র কয়েক সেকেন্ড! কী হবে এখন?
জিতুর বুকটা ধড়ফড় করে উঠল। বাঁচাতে হবে বোনকে। সে এক ঝটকায় স্যান্ডেল খুলল। বলল, ‘দাঁড়া ঋতু, আমি আসছি।’
জিতু পানিতে ঝাঁপ দিতে চাইল। শরীরটা যেই না ঝুঁকিয়ে দিচ্ছিল সামনের দিকে, অমনি তার মনে পড়ল—সে তো নিজেও সাঁতার জানে না। লাফ দিলে সেও ডুবে যাবে। তখন দুজনকেই বাঁচানোর কেউ থাকবে না। না না, লাফ দেওয়া যাবে না।
জিতু লাফ দিল না। চট করে একটা লম্বা বাঁশের কঞ্চি নিল। কঞ্চিটা ঋতুর দিকে বাড়িয়ে দিল। কিন্তু ইশ! কঞ্চিটা ঋতুর নাগালের বাইরে।
উঠোনে একটা খালি প্লাস্টিকের বোতল ছিল। পাঁচ লিটারের। জিতু তড়িঘড়ি করে এনে ঋতুর দিকে ছুড়ে দিল। কিন্তু ঋতু ভয়ে কাঁপছিল। সে বোতলটা ধরতে পারল না।
এবার জিতু জোরে চিৎকার দিল। গলার সব জোর এক করে। ‘বাঁচাও! বাঁচাও! চাচ্চু, বাবা, জলদি এসো! ঋতু পুকুরে পড়ে গেছে।’
জিতুর চিৎকার সাইরেনের মতো শোনাল। বাড়ির ভেতর থেকে বেরিয়ে এলেন চাচ্চু। একদম ঝড়ের বেগে। তিনি সব দেখলেন। ডালটা মড়মড় করে ভেঙে গেছে। পানিতে হাবুডুবু খাচ্ছে ঋতু। চাচ্চু এক মুহূর্তও দেরি করলেন না। ঝপাস করে পুকুরের পানিতে দিলেন ঝাঁপ।
চাচ্চু খুব ভালো সাঁতারু। তিনি দ্রুত সাঁতার কাটলেন। মুহূর্তেই ঋতুর কাছে পৌঁছে গেলেন। ঋতুর ফ্রকের কলার শক্ত করে ধরলেন। তারপর টেনে নিয়ে এলেন পাড়ে। একটুর জন্য রক্ষা!
ঋতু তখনো ভীষণ কাশছিল। খুব হাঁপাচ্ছিল। চাচ্চু সঙ্গে সঙ্গে ঋতুকে একপাশে কাত করে শুইয়ে দিলেন। এতে শ্বাস নিতে সুবিধা হয়। ভেতরের পানি সহজে গড়িয়ে পড়ে। তিনি ঋতুর পিঠে হাত বোলালেন। তাকে শান্ত করতে লাগলেন। একটু পর ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হলো ঋতু। ভয় কাটাতে হবে তার। তাই চাচ্চু আবার পানিতে নামলেন। ছিঁড়ে আনলেন সেই লাল শাপলাটা। ফুলটি ঋতুর হাতে দিলেন।
ঋতু তো মহাখুশি! কিন্তু ফুলটা হাতে নিতেই তার চোখ ছানাবড়া! শাপলার কাদামাখা ডাঁটায় একটা পিচ্ছিল শামুক আটকে আছে। ‘ও মা গো!’ বলে লাফ দিল সে। ফুলটা মাটিতে পড়ে গেল। ঋতুর এই কাণ্ড দেখে সবার মুখে হাসি ফুটল।
খবর শুনে বাবা-মা দৌড়ে এলেন। মা ঋতুকে জড়িয়ে নিলেন বুকে। চাচ্চু পুরো ঘটনাটি খুলে বললেন। শুনে জিতুকে শক্ত করে বুকে জড়িয়ে ধরলেন বাবা; বললেন, ‘বড় বিপদ থেকে তোমার বোনকে বাঁচিয়েছ। তুমি সাঁতার জানো না। তাই পানিতে লাফ দাওনি। হাতের কাছের জিনিস এগিয়ে দিয়েছ। জোরে চিৎকার করেছ। তুমি একদম সঠিক কাজ করেছ।’
চাচ্চু শার্টের পানি ঝাড়তে ঝাড়তে বললেন, ‘তবে সাঁতার না জানাটা বড্ড বিপদের। আগামী সপ্তাহ থেকে আমি সাঁতার শেখাব। ঋতু আর জিতু দুজনেই শিখবে। আর আজই এই পুকুরের চারপাশে বেড়া দিতে হবে। শক্ত বাঁশের বেড়া।’
চাচ্চুর কথামতোই কাজ হলো! পরের সপ্তাহে তিনি ঋতু আর জিতুকে নিয়ে গেলেন। গ্রামের একটা নিরাপদ পুকুরে সাঁতার শেখাতে শুরু করলেন। পুকুরটা গভীর ছিল না বেশি।
কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই সাঁতার শিখে গেল তারা। দারুণ সাঁতারু হয়ে উঠল।
একদিন জিতু বাঁশের বেড়ার কাছে দাঁড়াল। চোখ টিপে ঋতুকে জিজ্ঞেস করল, ‘কী রে ঋতু? তুই তো এখন সাঁতার পারিস। ওই যে দেখ, একটা লাল শাপলা ফুটে আছে, আনবি নাকি?’
ঋতু খিলখিল করে হাসল। মাথা নেড়ে বলল, ‘নাহ্! শাপলায় শামুক থাকে। এগুলো ফুলদানির চেয়ে পুকুরেই বেশি সুন্দর দেখায়।’
জিতু হাসিমুখে বোনের মাথায় বিলি কেটে বলল, ‘একদম ঠিক বলেছিস।’