জিন থেরাপি থেকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, মানসিক স্বাস্থ্য ও ক্যানসারের চিকিৎসা—শিশুস্বাস্থ্যের উন্নয়নে নতুন সম্ভাবনা দেখছেন গবেষকেরা। তবে এসব অগ্রগতির সুফল পেতে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন, ন্যায্য চিকিৎসাসুবিধা ও গবেষণায় বিনিয়োগ।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতি কীভাবে একটি শিশুর জীবন বদলে দিতে পারে, তার উদাহরণ রয়েছে অনেক। কয়েক দশক আগে সিকল সেল রোগ নিয়ে জন্মানো শিশুদের বারবার তীব্র ব্যথা, হাসপাতালে ভর্তি এবং পড়াশোনায় বিঘ্নের মধ্য দিয়ে বেড়ে উঠতে হতো। প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পরও তাদের জীবন ঝুঁকিতে থাকত। কিন্তু গবেষণার ফলে পেনিসিলিন ও হাইড্রোক্সিইউরিয়ার মতো চিকিৎসাপদ্ধতি এবং রোগ নিরাময়ে সক্ষম জিন থেরাপির অগ্রগতি এ ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
১৯৭৫ সালে অ্যাকিউট লিম্ফোব্লাস্টিক লিউকেমিয়া (এএলএল) আক্রান্ত শিশুদের পাঁচ বছর বেঁচে থাকার হার ছিল ৫৭ শতাংশ। ক্যানসার শনাক্তকরণ ও চিকিৎসায় ধারাবাহিক উন্নতির ফলে বর্তমানে এ হার ৯২ শতাংশ ছাড়িয়েছে। তবে চিকিৎসাবিজ্ঞানে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সত্ত্বেও শিশুস্বাস্থ্যের উন্নয়নে আরো বড় পরিবর্তনের সুযোগ রয়েছে বলে মনে করছেন গবেষকেরা। সম্প্রতি পেডিয়াট্রিক রিসার্চ সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি বিশেষ নিবন্ধে শিশুস্বাস্থ্য গবেষণায় সম্ভাবনাময় ১০টি ক্ষেত্র চিহ্নিত করা হয়েছে।
গবেষণাটির নেতৃত্ব দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের সিনসিনাটি চিলড্রেনস রিসার্চ ফাউন্ডেশনের প্রধান টিনা চেং। তাঁর সঙ্গে ছিলেন কলোরাডোর চিলড্রেনস হসপিটালের স্টিফেন ড্যানিয়েলস, ইউনিভার্সিটি অব টেনেসি হেলথ সায়েন্স সেন্টারের জেসিকা স্নোডেন এবং সিনসিনাটি চিলড্রেনস রিসার্চ ফাউন্ডেশনের ট্রেসি গ্লাউসার। ২০১৬ সালে শিশুস্বাস্থ্য গবেষণায় সাতটি বড় অগ্রগতি নিয়ে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের ধারাবাহিকতায় নতুন গবেষণাটি করা হয়েছে।
গবেষকদের মতে, এই ১০টি ক্ষেত্রে সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ দিতে গবেষণায় অর্থায়ন ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা বাড়ানো প্রয়োজন। অতীতের গবেষণালব্ধ অগ্রগতিকে প্রায়ই স্বাভাবিক বলে ধরে নেওয়া হয়। অথচ শিশুস্বাস্থ্য গবেষণা দীর্ঘদিন ধরেই প্রাপ্তবয়স্কদের স্বাস্থ্যসংক্রান্ত গবেষণার তুলনায় কম অর্থায়ন পেয়ে আসছে। তাই বিদ্যমান সম্পদের ন্যায্য অংশ শিশুস্বাস্থ্য গবেষণায় বরাদ্দ করা এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি জরুরি। শিশুস্বাস্থ্য গবেষণার সম্ভাবনাময় ১০টি ক্ষেত্র হলো—
১. জিনতত্ত্ব, জিনোম বিশ্লেষণ ও জিন থেরাপি
জিনোমবিষয়ক প্রযুক্তির অগ্রগতি চিকিৎসাবিজ্ঞানে বড় পরিবর্তন আনছে। পুরো জিনোম ও এক্সোমের সিকোয়েন্সিংয়ের খরচ কমছে এবং ব্যবহার বাড়ছে। ফলে কয়েক দিনের মধ্যেই রোগ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া সম্ভব হচ্ছে। এসব পরীক্ষার ভিত্তিতে রোগীর জন্য নির্দিষ্ট ও আরও কার্যকর চিকিৎসা পরিকল্পনা করা যাচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে শিশুর জন্মের আগেই চিকিৎসা শুরু করার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
২০১৬ সালের পর থেকে সিকল সেল রোগ, এএলএল, ডুশেন মাসকুলার ডিস্ট্রফি ও স্পাইনাল মাসকুলার অ্যাট্রফির মতো দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতা ও অক্ষমতা সৃষ্টিকারী অন্তত এক ডজন শিশুরোগের চিকিৎসায় জিন থেরাপি অনুমোদন পেয়েছে। এ ধরনের আরও চিকিৎসাপদ্ধতি তৈরির গবেষণাও এগিয়ে চলছে।
গবেষকদের মতে, আগে যেসব বংশগত রোগের নিরাময় সম্ভব ছিল না, সেগুলোর চিকিৎসায় জিন থেরাপি নতুন আশা তৈরি করেছে। তবে এ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে অর্থায়ন, নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা ও উৎপাদনপ্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আনতে হবে। পাশাপাশি স্বল্প সম্পদসম্পন্ন জনগোষ্ঠীর মানুষের কাছেও এসব চিকিৎসা পৌঁছানোর ব্যবস্থা করতে হবে এবং নৈতিক বিষয়গুলো বিবেচনায় রাখতে হবে।
২. মানসিক স্বাস্থ্য, আচরণগত সমস্যা ও স্নায়ুবিকাশ
২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের আমেরিকান একাডেমি অব পেডিয়াট্রিকস, আমেরিকান একাডেমি অব চাইল্ড অ্যান্ড অ্যাডোলেসেন্ট সাইকিয়াট্রি এবং চিলড্রেনস হসপিটাল অ্যাসোসিয়েশন শিশু ও কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে। এরপরও মস্তিষ্কের বিকাশ ও কার্যক্রম নিয়ে গবেষণায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। এসব গবেষণা প্রতিকূল পরিবেশে বেড়ে ওঠা শিশুদেরও সুস্থভাবে বিকশিত হতে সহায়তা করার সুযোগ তৈরি করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাডোলেসেন্ট ব্রেন কগনিটিভ ডেভেলপমেন্ট গবেষণায় অংশ নেওয়া ৯ ও ১০ বছর বয়সী শিশুদের এমআরআই পরীক্ষায় দেখা গেছে, গর্ভকালীন ঝুঁকি, অর্থনৈতিক বঞ্চনা ও পারিবারিক মানসিক আঘাতের মতো প্রতিকূল অভিজ্ঞতার সঙ্গে মস্তিষ্কের শ্বেত পদার্থের গঠনগত পরিবর্তনের সম্পর্ক রয়েছে। এসব পরিবর্তনের সঙ্গে পরবর্তী সময়ে গণিত ও ভাষার পরীক্ষায় তুলনামূলক কম নম্বর পাওয়ার সম্পর্কও দেখা গেছে।
এখন স্নায়ুবিজ্ঞান, মনোবিজ্ঞান, মনোরোগবিদ্যা, রোগপ্রতিরোধবিদ্যা, সিস্টেমস বায়োলজি, মেশিন লার্নিং ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সমন্বয়ে শিশুদের ঝুঁকি আগেই শনাক্ত করা, রোগ নির্ণয় এবং বয়স বাড়ার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে চিকিৎসা নির্ধারণের সুযোগ বাড়ছে। তবে এসব অগ্রগতি বাস্তবে কাজে লাগাতে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রমাণভিত্তিক মানসিক ও আচরণগত স্বাস্থ্যসেবা ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থায়ন নিশ্চিত করতে হবে।
৩. টিকা, রোগপ্রতিরোধ ও সংক্রামক রোগ প্রতিরোধ
টিকার অগ্রগতির ফলে একসময় শিশুদের মধ্যে প্রাণঘাতী ছিল—এমন অনেক সংক্রামক রোগ থেকে লাখ লাখ শিশু রক্ষা পেয়েছে। নতুন প্রজন্মের আরএসভি ও এইচপিভি টিকাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। আরএসভি টিকা নবজাতকদের সুরক্ষায় সহায়তা করছে, অন্যদিকে এইচপিভি টিকা নারীদের জরায়ুমুখের ক্যানসারসহ সংশ্লিষ্ট কিছু রোগের ঝুঁকি কমাচ্ছে।
গবেষকদের মতে, এমআরএনএ প্রযুক্তিভিত্তিক টিকা কোভিড-১৯ মোকাবিলার সাফল্য ছাড়িয়ে ভবিষ্যতে অন্যান্য জীবাণুর কারণে সৃষ্ট মহামারি প্রতিরোধেও ভূমিকা রাখতে পারে। এমনকি প্রচলিতভাবে টিকাদানের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়—এমন কিছু রোগ ও ক্যানসারের চিকিৎসার ফল উন্নত করতেও এ প্রযুক্তির সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে টিকাদানের হার কমে যাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রে হামসহ প্রতিরোধযোগ্য বিভিন্ন রোগের প্রাদুর্ভাব বেড়েছে বলে গবেষকেরা উল্লেখ করেছেন। তাদের মতে, টিকার প্রতি মানুষের আস্থা বাড়ানো এবং সব শিশুর জন্য টিকা পাওয়ার বাধা কমাতে জনসম্পৃক্ততা ও প্রমাণভিত্তিক টিকাদান কর্মসূচির পক্ষে প্রচার জোরদার করতে হবে।
৪. কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল স্বাস্থ্য ও তথ্যপ্রযুক্তি
স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়নে বিপুল পরিমাণ তথ্য ব্যবহারের সুযোগ এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। শিশুদের চিকিৎসার উপযোগী করে তৈরি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিভিন্ন সরঞ্জাম ইতোমধ্যে রেডিওলজি, স্নায়ুবিদ্যা ও হৃদ্রোগ চিকিৎসায় রোগ নির্ণয় ও সেবার ধরন বদলে দিচ্ছে। হাসপাতালের জরুরি বিভাগে রোগীর চাপ কখন বাড়তে পারে, তা অনুমান করে প্রয়োজন অনুযায়ী কর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা করতেও এ প্রযুক্তি সাহায্য করতে পারে।
ভবিষ্যতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা চিকিৎসার অনুমোদনসংক্রান্ত নথিপত্র এবং রোগীর তথ্য ব্যবস্থাপনার বিপুল কাজ সহজ করতে পারে। এদিকে পরিধানযোগ্য স্বাস্থ্যযন্ত্র ও দূর থেকে চিকিৎসাসেবা দেওয়ার প্রযুক্তির উন্নতির ফলে দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত অনেক রোগী বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সেবা নিতে পারছেন। চিকিৎসক ও রোগীর মধ্যে শত শত বা হাজার হাজার কিলোমিটার দূরত্ব থাকলেও এ সুবিধা কাজে লাগানো সম্ভব হচ্ছে।
গবেষকদের ধারণা, আগামী দশকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার আরও উন্নয়ন এবং এর ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা রোগের পূর্বাভাস, নির্ণয় ও চিকিৎসার পরামর্শকে আরও নির্ভুল ও নির্ভরযোগ্য করবে। তবে এ জন্য স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, পক্ষপাত কমানো, নৈতিক সুরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণ ও অবকাঠামোয় দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ প্রয়োজন।
৫. নবজাতকের চিকিৎসা, অপরিণত জন্ম ও গর্ভকালীন স্বাস্থ্য
বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, প্রাপ্তবয়স্কদের অনেক রোগের ঝুঁকির সূচনা হতে পারে মায়ের গর্ভে থাকাকালেই। আবার শৈশবের প্রথম দিকের অভিজ্ঞতা ও পরিবেশগত প্রভাব এমন কিছু অভ্যাস বা শারীরিক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে, যার প্রকাশ কয়েক দশক পরও দেখা যায়। এ কারণে জীবনের শুরু থেকেই রোগ প্রতিরোধে শিশুস্বাস্থ্য গবেষণার বিশেষ সুযোগ রয়েছে।
ভ্রূণের অস্ত্রোপচার পদ্ধতির উন্নতি ইতোমধ্যে মায়েলোমেনিঙ্গোসিল, জন্মগত ডায়াফ্রামজনিত হার্নিয়া ও জন্মগত হৃদ্রোগের মতো জটিল সমস্যায় আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসার ফল উন্নত করতে শুরু করেছে। কৃত্রিম গর্ভ, ভ্রূণের জিন সম্পাদনা এবং টিস্যু ও কোষ পুনর্গঠনের মতো বিষয় নিয়েও গবেষণা চলছে।
অন্যদিকে, উন্নত ভেন্টিলেশন প্রযুক্তি, এক্সট্রাকরপোরিয়াল মেমব্রেন অক্সিজেনেশন (ইসিএমও) এবং নিবিড় পরিচর্যার অন্যান্য অগ্রগতির ফলে গুরুতর অসুস্থ নবজাতকদের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা বেড়েছে। পুষ্টি ও দেহের অণুজীবসমষ্টি বা মাইক্রোবায়োম ব্যবস্থাপনায় উন্নতিও চিকিৎসার ফল ভালো করতে এবং নেক্রোটাইজিং এন্টারোকোলাইটিসের (এনইসি) মতো জটিলতা কমাতে সাহায্য করছে।
তবে ছয় দশকে নবজাতক ও শিশুমৃত্যুর হার কমলেও চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রে গর্ভাবস্থাসংশ্লিষ্ট মৃত্যুর হার বেড়েছে এবং বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী ও অঙ্গরাজ্যের মধ্যে চিকিৎসার ফলাফলে বড় ধরনের বৈষম্য এখনো রয়েছে।
৬. ব্যক্তিকেন্দ্রিক চিকিৎসা ও লক্ষ্যভিত্তিক ওষুধ
দ্রুত জিন পরীক্ষা ও বিপুল তথ্য বিশ্লেষণের অগ্রগতিকে কাজে লাগিয়ে জিনগত বা জৈবিক বৈশিষ্ট্যনির্ভর বিভিন্ন শিশুরোগের চিকিৎসায় নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে। নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করে এমন অনেক রোগ শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে, যেগুলোর সঠিক কারণ জানতে আগে রোগীদের বছরের পর বছর পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হতো। এখন কিছু ক্ষেত্রে কয়েক দিনের মধ্যেই রোগ নির্ণয় করা সম্ভব হচ্ছে।
একই ওষুধের নির্দিষ্ট মাত্রায় বিভিন্ন মানুষের শরীর কীভাবে সাড়া দেয়, সে বিষয়ে জ্ঞান বাড়ায় ক্যানসার, প্রদাহজনিত অন্ত্রের রোগ ও অঙ্গ প্রতিস্থাপনের মতো ক্ষেত্রে রোগীভিত্তিক চিকিৎসা নির্ধারণের সুযোগও তৈরি হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে ওষুধের চিকিৎসাপদ্ধতিও রোগীর প্রয়োজন অনুযায়ী তৈরি করা হচ্ছে। যেমন, কাইমেরিক অ্যান্টিজেন রিসেপ্টর টি-সেল বা কার-টি থেরাপি শিশুদের ক্যানসার চিকিৎসা ও বেঁচে থাকার সম্ভাবনায় বড় পরিবর্তন এনেছে।
গবেষকেরা মনে করেন, ব্যক্তিকেন্দ্রিক চিকিৎসার প্রসারে দ্রুত রোগ নির্ণয়ের নতুন পদ্ধতি এবং এমন সিদ্ধান্ত-সহায়ক প্রযুক্তি তৈরি করতে হবে, যা রোগীর পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসার ইতিহাসের সঙ্গে চিকিৎসা পরিকল্পনার সমন্বয় ঘটাবে।
৭. সামাজিক কারণ, স্বাস্থ্যবৈষম্য ও সমান চিকিৎসাসুবিধা
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, মানুষ কোথায় জন্মায়, বেড়ে ওঠে, বসবাস ও কাজ করে এবং কীভাবে বার্ধক্যে পৌঁছায়—এসব পরিস্থিতির পাশাপাশি ক্ষমতা, অর্থ ও সম্পদে তার প্রবেশাধিকার স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলে। যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে স্বাস্থ্যবৈষম্য তৈরিতে এসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
শিশুদের স্বাস্থ্যবৈষম্য কমাতে হাসপাতালের বাইরেও নানা উদ্যোগ প্রয়োজন। তবে চিকিৎসাকেন্দ্রে পরিচালিত গবেষণার মাধ্যমে সীমিত সরকারি সম্পদ ব্যবহার করে কোন ধরনের উদ্যোগ সবচেয়ে বেশি সুফল দিতে পারে, তা বোঝা সম্ভব।
গবেষকদের মতে, কার্যকর চিকিৎসাপদ্ধতি আরো বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া, সফল উদ্যোগকে স্থায়ী ব্যবস্থায় রূপ দেওয়া এবং শিশুদের জন্য জনস্বাস্থ্য ও নীতিনির্ভর সমাধান তৈরি করাও গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাগত অর্জন হতে পারে।
৮. স্থূলতা, পুষ্টি ও ওজন নিয়ন্ত্রণ
গত তিন দশকে শিশুদের মধ্যে স্থূলতা বেড়েছে উদ্বেগজনক হারে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের ২১ শতাংশ শিশু স্থূলতায় আক্রান্ত। অতিরিক্ত স্থূলতা শিশুদের মধ্যেই উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও যকৃতের রোগের কারণ হতে পারে। অল্প বয়সে স্থূল হয়ে পড়লে প্রাপ্তবয়স্ক জীবনেও তা অব্যাহত থাকার আশঙ্কা থাকে। এর ফলে হৃদ্রোগ, ক্যানসারসহ বিভিন্ন রোগে অকালমৃত্যুর ঝুঁকি বাড়তে পারে।
সম্প্রতি পর্যন্ত স্থূলতা নিয়ন্ত্রণের প্রধান উপায় ছিল জীবনযাপনে পরিবর্তন আনার চেষ্টা, যার কার্যকারিতা অনেক ক্ষেত্রে সীমিত ছিল। গুরুতর অবস্থায় অস্ত্রোপচারের ব্যবস্থাও নেওয়া হতো। তবে জিএলপি-১ শ্রেণির ওষুধ প্রাপ্তবয়স্কদের এবং ক্রমবর্ধমানসংখ্যক শিশুর চিকিৎসায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। তবে এসব ওষুধ শিশুদের বৃদ্ধি ও পেশির বিকাশে কী প্রভাব ফেলে, তা বুঝতে আরও সতর্ক গবেষণা প্রয়োজন।
গবেষকদের ধারণা, ব্যক্তির জিনগত বৈশিষ্ট্য এবং অন্ত্রের মাইক্রোবায়োমের ভিন্নতা বিপাকপ্রক্রিয়ায় কী প্রভাব ফেলে, তা সম্পর্কে জ্ঞান বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্যক্তিকেন্দ্রিক পুষ্টিচিকিৎসার নতুন যুগ শুরু হতে পারে। একই ধরনের খাদ্যতালিকা সবার জন্য কার্যকর কি না—এমন বিতর্কের বাইরে গিয়ে প্রযুক্তির সহায়তায় বিভিন্ন রোগের চিকিৎসায় নির্দিষ্ট খাবার ও পুষ্টিপূরক ব্যবহারের সুযোগও বাড়ছে।
৯. পরিবেশগত স্বাস্থ্য, জলবায়ু পরিবর্তন ও ক্ষতিকর উপাদানের প্রভাব
যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় স্বাস্থ্য সংস্থার অর্থায়নে পরিচালিত এনভায়রনমেন্টাল ইনফ্লুয়েন্সেস অব চাইল্ড হেলথ আউটকামসসহ দীর্ঘমেয়াদি গবেষণায় গর্ভকালীন ও শৈশবের পরিবেশগত প্রভাবের সঙ্গে বিভিন্ন স্বাস্থ্যসমস্যার সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
সূক্ষ্ম বস্তুকণা, কীটনাশক, ফথালেট এবং পার- ও পলিফ্লুরোঅ্যালকাইল পদার্থের (পিএফএএস) সংস্পর্শের সঙ্গে অপরিণত জন্ম, মস্তিষ্কের বিকাশে বিঘ্ন, হাঁপানি ও স্থূলতার মতো সমস্যার সম্পর্ক দেখা গেছে। এসব ঝুঁকি কমানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায় নির্ধারণে আরো গবেষণা প্রয়োজন। এর সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তন নতুন গবেষণার চাহিদা বাড়াচ্ছে।
গবেষকেরা জানতে চান, দাবানলের ধোঁয়া শিশুদের বিকাশে কী প্রভাব ফেলে; প্রাকৃতিক দুর্যোগে খাদ্যসংকট ও মানসিক আঘাত তৈরি হলে শিশুদের কী ধরনের সমস্যা হয়; এবং জলবায়ু উষ্ণ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রোগ ছড়ানো টিক ও মশার আবাসস্থল বদলে গেলে স্বাস্থ্যঝুঁকি কীভাবে পরিবর্তিত হয়। তাদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকির প্রভাব দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত শিশু, আর্থসামাজিকভাবে পিছিয়ে থাকা পরিবার এবং অন্যান্য বৈষম্যের শিকার শিশুদের ওপর তুলনামূলক বেশি পড়তে পারে।
১০. ক্যানসার, ক্যানসারের চিকিৎসা ও ইমিউনোথেরাপি
যুক্তরাষ্ট্রে শিশুদের ক্যানসার চিকিৎসায় সাফল্য বাড়াতে সরকারি গবেষণা তহবিল দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। বর্তমানে ব্যক্তিকেন্দ্রিক চিকিৎসার আওতায় ফিলাডেলফিয়া ক্রোমোজোম-পজিটিভ লিউকেমিয়ার জন্য বিসিআর-এবিএল ইনহিবিটর, নিউরোব্লাস্টোমার জন্য এএলকে ইনহিবিটর এবং শিশুদের নির্দিষ্ট কিছু মস্তিষ্কের টিউমারের জন্য বিএআরএফ ও এমইকে ইনহিবিটরের মতো ওষুধ ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
এ ছাড়া কার-টি থেরাপির মতো ইমিউনোথেরাপিতে রোগীর নিজের টি-সেলকে এমনভাবে কাজে লাগানো হয়, যাতে সেগুলো ক্যানসার কোষ শনাক্ত করে ধ্বংস করতে পারে। এ পদ্ধতি শিশুদের ক্যানসার চিকিৎসায় বড় পরিবর্তন এনেছে। তবে চিকিৎসার উন্নতিতে আরো বেশি শিশু ক্যানসার থেকে বেঁচে ফিরছে বলে নতুন চ্যালেঞ্জও তৈরি হয়েছে। ক্যানসারজয়ী এসব শিশুর প্রাপ্তবয়স্ক জীবন সুস্থ ও স্বাভাবিক রাখতে আরো গবেষণা প্রয়োজন।
কিছু ক্যানসার চিকিৎসার ফলে মস্তিষ্ক ও হৃদ্যন্ত্রের ক্ষতির ঝুঁকি কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়, ভবিষ্যৎ প্রজননস্বাস্থ্য কীভাবে সুরক্ষিত রাখা যায় এবং দীর্ঘমেয়াদি অন্যান্য সমস্যা কীভাবে কমানো যায়—এসব বিষয়ে গবেষণা চলছে। এ ঝুঁকি কমাতে নতুন পদ্ধতিও তৈরি হচ্ছে। এসব অগ্রগতির ফলে যুক্তরাষ্ট্রে শিশুদের ক্যানসার চিকিৎসা এখন শুধু রোগ নিরাময়ে সীমাবদ্ধ নেই; বরং শারীরিক সক্ষমতা পুনরুদ্ধার ও দীর্ঘমেয়াদি সুস্থতাকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
সামনে কী প্রয়োজন?
শিশুস্বাস্থ্য গবেষণার এই ১০টি ক্ষেত্রের সম্ভাবনা একে অন্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। এসব ক্ষেত্রে সাফল্য পেতে প্রয়োজন সুপরিকল্পিত উদ্যোগ ও ধারাবাহিক বিনিয়োগ। শিশুস্বাস্থ্য গবেষণায় দক্ষ জনবল তৈরির ধারাও শক্তিশালী করতে হবে। এ ক্ষেত্রে গবেষকদের পেশাগত জীবনে বাধা তৈরি করে এমন বিষয় মোকাবিলায় নীতিগত উদ্যোগ প্রয়োজন। পাশাপাশি বিজ্ঞান সম্পর্কে মানুষের মধ্যে বাড়তে থাকা অবিশ্বাসের কারণ বুঝতেও নতুন গবেষণা দরকার।
এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে যে প্রচেষ্টা প্রয়োজন, তা সার্থক হবে। কারণ, শৈশবের স্বাস্থ্য এবং জীবনের শুরুর দিকে রোগের বিকাশ মানুষের পুরো জীবনকে প্রভাবিত করতে পারে। তাই শিশুস্বাস্থ্য গবেষণায় বিনিয়োগের সুফল শেষ পর্যন্ত সমাজের জন্য সবচেয়ে বেশি হতে পারে।
সূত্র: সিনসিনাটি চিলড্রেনস হসপিটাল মেডিকেল সেন্টার ও সায়েন্স ব্লগ ডট সিনসিনাটি চিলড্রেনস ডট অর্গ