হোম > ফিচার > স্বাস্থ্য

ক্যানসার চিকিৎসায় নতুন সম্ভাবনা

আমার দেশ অনলাইন

ক্যানসার চিকিৎসায় ব্যক্তিভেদে আরো কার্যকর ও নির্ভুল পদ্ধতি তৈরির পথে নতুন সম্ভাবনা দেখিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। রোগীর টিউমারের নির্দিষ্ট আণবিক বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে দুই ধরনের নিউক্লিক অ্যাসিড থেরাপির সমন্বয়ে ক্যানসার চিকিৎসার একটি নতুন কৌশল উদ্ভাবন করেছেন তারা। প্রাথমিক পরীক্ষায় দেখা গেছে, এই সম্মিলিত পদ্ধতি একক থেরাপির তুলনায় অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসার কোষের বৃদ্ধি এবং টিউমারের অগ্রগতি দমনে বেশি কার্যকর।

গবেষকেরা বলছেন, নতুন এই পদ্ধতিতে একই সঙ্গে ক্যানসার সৃষ্টিকারী জিনের কার্যক্রম কমানো এবং ক্যানসার প্রতিরোধে ভূমিকা রাখা জিনের কার্যক্রম বাড়ানো সম্ভব। এর ফলে টিউমারের একাধিক অস্বাভাবিকতা একসঙ্গে মোকাবিলা করা যেতে পারে। ভবিষ্যতে রোগীর টিউমারের আণবিক বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী চিকিৎসা নির্ধারণের ক্ষেত্রেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

সম্প্রতি অ্যাডভান্সড সায়েন্স সাময়িকীতে প্রকাশিত ‘কনসার্টেড অ্যাকশন অব টার্গেটেড নিউক্লিক অ্যাসিড থেরাপিউটিকস অ্যাজ ফ্লেক্সিবল, প্রিসিশন অ্যান্ড পার্সোনালাইজড ক্যানসার ট্রিটমেন্ট’ শীর্ষক এক গবেষণায় এ তথ্য জানানো হয়েছে। গবেষণাটি পরিচালিত হয়েছে অগ্ন্যাশয়ের নালিকাজনিত অ্যাডেনোকার্সিনোমা বা পিডিএসি নিয়ে। এটি অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসারের একটি আক্রমণাত্মক ধরন, যা চিকিৎসার ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত।

ফ্রান্সের জাতীয় বৈজ্ঞানিক গবেষণা কেন্দ্রের (সিএনআরএস) গবেষণা পরিচালক ড. পেং লিং বলেন, একই চিকিৎসা সবার ওপর প্রয়োগ করার পরিবর্তে রোগীর টিউমারের আণবিক বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী আরএনএর সমন্বিত চিকিৎসা বেছে নেওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে এই গবেষণায়। রোগের অগ্রগতির সঙ্গে টিউমারের আণবিক বৈশিষ্ট্য পরিবর্তিত হলে ভবিষ্যতে সেই অনুযায়ী চিকিৎসার সমন্বয়ও করা যেতে পারে।

একই সঙ্গে জিন সক্রিয় ও নিষ্ক্রিয় করার কৌশল

ক্যানসার একটি জটিল রোগ। এতে একই সময়ে একাধিক জিনে পরিবর্তন ঘটতে পারে। আবার একেকজন রোগীর টিউমারে জিনগত পরিবর্তনের ধরন একেক রকম হয়। সময়ের সঙ্গে এসব পরিবর্তনও ঘটতে পারে। ফলে সব রোগীর জন্য একই চিকিৎসা সমান কার্যকর হয় না।

বর্তমানে নিউক্লিক অ্যাসিডভিত্তিক অনেক চিকিৎসাপদ্ধতি একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যকে কেন্দ্র করে কাজ করে। কোনোটি ক্যানসার সৃষ্টিকারী জিনের কার্যক্রম বন্ধ করার চেষ্টা করে, আবার কোনোটি ক্যানসার প্রতিরোধী জিনকে সক্রিয় করে। কিন্তু একই সঙ্গে দুই ধরনের কাজ করার সুযোগ তুলনামূলকভাবে সীমিত।

এই সীমাবদ্ধতা কাটাতে গবেষকেরা দুটি ছোট আরএনএ অণুর সমন্বয় ব্যবহার করেছেন। এর একটি হলো স্মল ইন্টারফেরিং আরএনএ বা এসআইআরএনএ, যা নির্দিষ্ট জিনের কার্যক্রম কমিয়ে বা বন্ধ করে দেয়। অন্যটি স্মল অ্যাক্টিভেটিং আরএনএ বা এসএআরএনএ, যা নির্দিষ্ট জিনের কার্যক্রম বাড়াতে সাহায্য করে।

গবেষকেরা এই দুই ধরনের আরএনএ একসঙ্গে ব্যবহার করে ক্যানসার সৃষ্টিকারী জিনকে নিষ্ক্রিয় করার পাশাপাশি টিউমার দমনকারী জিনকে সক্রিয় করার চেষ্টা করেছেন। তাদের লক্ষ্য ছিল, ক্যানসারের সঙ্গে সম্পর্কিত একাধিক আণবিক অস্বাভাবিকতা একই সময়ে মোকাবিলা করা।

ড. লিংয়ের ভাষায়, ক্যানসারের জন্য দায়ী আণবিক ভারসাম্যহীনতার দুটি দিককে একসঙ্গে সংশোধন করাই এই পদ্ধতির মূল উদ্দেশ্য।

৪৫টি টিউমার মডেল বিশ্লেষণ

গবেষণার শুরুতে বিজ্ঞানীরা দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর খোঁজেন। একাধিক ক্যানসার-সংশ্লিষ্ট অস্বাভাবিকতা একই সঙ্গে মোকাবিলা করতে পারে—এমন আরএনএভিত্তিক চিকিৎসা তৈরি করা সম্ভব কি না এবং প্রতিটি রোগীর টিউমারের আণবিক বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী উপযুক্ত আরএনএর সমন্বয় নির্বাচন করা যায় কি না।

এ জন্য গবেষকেরা প্রথমে অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসারের অগ্রগতিতে ভূমিকা রাখা গুরুত্বপূর্ণ জিনগুলো শনাক্ত করেন। এরপর ৪৫টি রোগী-উদ্ভূত অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসার মডেলে আরএনএর কার্যক্রম এবং সংশ্লিষ্ট প্রোটিনের বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করেন। এতে প্রতিটি টিউমারে জিনের অস্বাভাবিক কার্যক্রম সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। সেই তথ্যের ভিত্তিতে নির্দিষ্ট জিনকে লক্ষ্য করে আরএনএভিত্তিক চিকিৎসার সমন্বয় তৈরি করা হয়।

এরপর কোষের কালচার, অর্গানয়েড এবং টিউমার জেনোগ্রাফট মডেলে চিকিৎসাগুলোর কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হয়। অর্গানয়েড হলো পরীক্ষাগারে তৈরি ত্রিমাত্রিক কোষগুচ্ছ, যা শরীরের নির্দিষ্ট অঙ্গের কিছু বৈশিষ্ট্য অনুকরণ করতে পারে। অন্যদিকে, টিউমার জেনোগ্রাফট মডেলে প্রাণীর শরীরে টিউমার প্রতিস্থাপন করে চিকিৎসার প্রভাব পরীক্ষা করা হয়।

পরীক্ষার ফলাফলে দেখা যায়, সম্মিলিত আরএনএ থেরাপি ক্যানসার কোষের বংশবৃদ্ধি, টিউমারের বৃদ্ধি এবং রোগের অগ্রগতি কমাতে একক থেরাপির তুলনায় বেশি কার্যকর ছিল। কোষের কালচার থেকে শুরু করে জটিলতর অর্গানয়েড ও প্রাণীর শরীরে প্রতিস্থাপিত টিউমার—বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষামূলক মডেলেই এই সুবিধা দেখা গেছে।

বিশেষ করে ইঁদুরের শরীরে প্রতিস্থাপিত টিউমারের ওপর পরীক্ষায় পাওয়া ফলাফল ইঙ্গিত দেয়, পরীক্ষাগারের কোষে দেখা কার্যকারিতা জীবন্ত প্রাণীর শরীরেও বজায় থাকতে পারে। তবে এসব ফলাফল থেকে মানুষের শরীরে চিকিৎসাটির কার্যকারিতা নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।

টিউমারভেদে চিকিৎসার সমন্বয় আলাদা

গবেষণার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, সব টিউমার একই ধরনের আরএনএ সমন্বয়ে সমানভাবে সাড়া দেয়নি। বিভিন্ন টিউমার মডেলে ভিন্ন ভিন্ন সমন্বয় সবচেয়ে ভালো ফল দিয়েছে। আবার যেসব টিউমারের আণবিক বৈশিষ্ট্য কাছাকাছি, সেগুলোর ক্ষেত্রে কিছু নির্দিষ্ট সমন্বয় কার্যকর হয়েছে।

গবেষকদের মতে, ভবিষ্যতে এই বৈশিষ্ট্য কাজে লাগিয়ে একজন রোগীর টিউমারের জন্য আলাদা চিকিৎসা নির্ধারণ করা সম্ভব হতে পারে। একই সঙ্গে যেসব রোগীর টিউমারের আণবিক বৈশিষ্ট্য একই রকম, তাঁদের একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর জন্যও উপযুক্ত আরএনএ সমন্বয় নির্বাচন করা যেতে পারে।

এ ধরনের চিকিৎসা ব্যক্তিকেন্দ্রিক বা পার্সোনালাইজড মেডিসিনের ধারণার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এতে রোগীর রোগের ধরন, জিনগত বৈশিষ্ট্য এবং টিউমারের আণবিক কার্যক্রম বিবেচনা করে চিকিৎসা নির্ধারণ করা হয়।

মানুষের চিকিৎসায় প্রয়োগের আগে আরো গবেষণা প্রয়োজন

সম্ভাবনাময় ফলাফল পাওয়া গেলেও গবেষণাটির কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। প্রথমত, পরীক্ষায় অল্পসংখ্যক লক্ষ্য জিন এবং একটি নির্দিষ্ট ধরনের ক্যানসার নিয়ে কাজ করা হয়েছে। ভবিষ্যতে আরো বেশি জিন এবং অন্যান্য ধরনের ক্যানসারে এই পদ্ধতির কার্যকারিতা পরীক্ষা করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, চিকিৎসার আরএনএ অণুগুলোকে প্রয়োজনীয় কোষে পৌঁছে দিয়ে যথেষ্ট সময় ধরে কার্যকর রাখা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এ কারণে উপযুক্ত ও কার্যকর ওষুধ সরবরাহব্যবস্থা তৈরি করা ভবিষ্যৎ গবেষণার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।

এ ছাড়া রোগীদের টিউমার থেকে তৈরি মডেল ব্যবহার করা হলেও মানুষের শরীরে টিউমার যে জটিল পরিবেশে বেড়ে ওঠে, সেখানে এই চিকিৎসা কতটা কার্যকর হবে, তা এখনও অজানা। মানুষের ওপর ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল এবং পরবর্তী গবেষণা ছাড়া চিকিৎসাটির নিরাপত্তা, কার্যকারিতা ও ব্যবহারিক সম্ভাবনা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

গবেষকদের আশা, এসব সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ওঠা গেলে ক্যানসার চিকিৎসায় নিউক্লিক অ্যাসিডের সমন্বিত ব্যবহার নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে। তাঁদের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য হলো, ‘একটি ওষুধ, একটি লক্ষ্য’—এই ধারণার বাইরে গিয়ে রোগীর টিউমারের আণবিক বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী একাধিক প্রোগ্রামযোগ্য আরএনএ চিকিৎসার সমন্বয় তৈরি করা।

তবে আপাতত এটি প্রাক্‌-ক্লিনিক্যাল গবেষণার ফল। মানুষের ক্যানসার চিকিৎসায় নিয়মিত ব্যবহারের উপযোগী হয়ে উঠতে হলে পদ্ধতিটির কার্যকারিতা ও নিরাপত্তা নিয়ে আরও পরীক্ষা প্রয়োজন।

সূত্র: অ্যাডভান্সড সায়েন্স নিউজ

দেশে মৃত্যুর প্রধান কারণ উচ্চ রক্তচাপ, নিয়ন্ত্রণে টেকসই অর্থায়নের তাগিদ

তৃণমূল পর্যায়ে স্তন ক্যান্সার স্ক্রিনিং চালুর উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার: স্বাস্থ্যমন্ত্রী

ডেঙ্গুতে আরো ৬ জনের মৃত্যু, হাসপাতালে ভর্তি ২ হাজার ৮৮

শিশুস্বাস্থ্যের উন্নয়নে সম্ভাবনাময় ১০ ক্ষেত্র

ধূমপান না করেও ফুসফুসে ক্যানসার, ঝুঁকিতে যারা

সাত দিনে ৫১ ধরনের উদ্ভিজ্জ খাবার খেলেন সাংবাদিক

স্তন ক্যানসারের ঝুঁকিতে কারা

ব্রেস্ট ক্যানসার সচেতনতার মাস

অস্থিসন্ধির ব্যথাকে অবহেলা নয়

জ্বর কমছে না কেন