মানুষের ব্যক্তিত্বের অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ হলো তার কণ্ঠস্বর। আমাদের মনের ভাব প্রকাশ থেকে শুরু করে পেশাগত জীবনের সাফল্য, সবখানেই একটি সুস্থ ও স্বাভাবিক কণ্ঠের গুরুত্ব অপরিসীম। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমরা অনেকেই আমাদের এই অমূল্য সম্পদের যথাযথ যত্ন নিই না। প্রতিবছর ১৬ এপ্রিল পালিত হয় বিশ্ব কণ্ঠ দিবস। এ বছরও সারা দেশে এই দিনটি জাঁকজমকপূর্ণভাবে পালিত হয়েছে।
কণ্ঠস্বর শুধু কথা বলার মাধ্যম নয়, এটি আমাদের পরিচয়ের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। শিক্ষক, আইনজীবী, বক্তা, গায়ক ও গৃহিণীÑআমরা প্রত্যেকেই কণ্ঠস্বরের ওপর নির্ভরশীল। যখন কণ্ঠস্বর স্বাভাবিক থাকে না, তখন তা ব্যক্তির যোগাযোগের ক্ষমতাকে যেমন বাধাগ্রস্ত করে, তেমনি তার মানসিক আত্মবিশ্বাসেও গভীর প্রভাব ফেলে। আমরা যখন প্রয়োজনের অতিরিক্ত উচ্চ স্বরে কথা বলি, দীর্ঘক্ষণ চিৎকার করি অথবা ভুল পদ্ধতিতে গলা ব্যবহার করি, তখন আমাদের ভোকাল কর্ড বা কণ্ঠনালির স্পর্শকাতর পেশিগুলোয় অতিরিক্ত চাপ পড়ে। এর ফলে দেখা দিতে পারে কণ্ঠের ব্যাধি বা ভয়েস ডিজঅর্ডার। কণ্ঠের ব্যাধি হলো এমন একটি শারীরিক অবস্থা, যেখানে মানুষের কণ্ঠস্বরের স্বাভাবিক গুণগত মান পরিবর্তিত হয়ে যায়, যার কারণে কথা বলা কঠিন হয়ে পড়ে বা কণ্ঠ অস্বাভাবিক শোনায়। এটি সাধারণত গলার স্বর কর্কশ হয়ে যাওয়া, স্বরের অস্বাভাবিক ওঠানামা, হঠাৎ গলা বসে যাওয়া অথবা কথা বলার সময় ব্যথা অনুভব করার মতো লক্ষণের মাধ্যমে প্রকাশ পায়। এ সমস্যা বিভিন্ন কারণে হতে পারে। যেমন : দীর্ঘদিন ধরে ভুলভাবে কণ্ঠের ব্যবহার, কণ্ঠনালির শারীরিক গঠনগত ত্রুটি অথবা কোনো স্নায়বিক জটিলতা। দীর্ঘদিন এসব উপসর্গ অবহেলা করলে সমস্যা গুরুতর আকার ধারণ করতে পারে এবং ব্যক্তির সামাজিক ও পেশাগত জীবনে বড় ধরনের বাধা সৃষ্টি করে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কণ্ঠের ব্যাধি নিয়ে বৃহৎ পরিসরে জাতীয় কোনো জরিপ বা তথ্য এখনো খুব সীমিত, তবে বিভিন্ন ছোট পরিসরের গবেষণা ও পর্যবেক্ষণ থেকে আমরা কিছু গুরুত্বপূর্ণ ধারণা পাই।
বিশেষজ্ঞদের অনুমান, বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ, যা প্রায় ৭ থেকে ১০ শতাংশ, জীবনের কোনো না কোনো পর্যায়ে কণ্ঠস্বরের কোনো না কোনো সমস্যায় ভোগেন। পেশাগত কারণে যারা কণ্ঠের সমস্যায় আক্রান্ত হন, তাদের মধ্যে শিক্ষকদের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি, যা প্রায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ। প্রতিদিন দীর্ঘক্ষণ ক্লাস নেওয়ার কারণে তাদের কণ্ঠনালিতে সবচেয়ে বেশি চাপ পড়ে। এছাড়া বাংলাদেশে পুরুষদের ক্যানসারের মধ্যে কণ্ঠনালির ক্যানসার একটি অন্যতম শীর্ষস্থানীয় রোগ। ধূমপান, জর্দা, গুল বা তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহারের অভ্যাসের কারণে প্রতিবছর কয়েক হাজার মানুষ এই মারাত্মক রোগে আক্রান্ত হন। রাস্তার হকার, মসজিদের ইমাম, মাদরাসার শিক্ষক এবং রাজনৈতিক কর্মীদের মধ্যেও কণ্ঠের রোগের প্রবণতা তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায়। কণ্ঠের সমস্যার চিকিৎসায় বর্তমানে স্পিচ অ্যান্ড ল্যাংগুয়েজ থেরাপি চিকিৎসা একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। একজন দক্ষ স্পিচ অ্যান্ড ল্যাংগুয়েজ থেরাপি চিকিৎসক রোগীর কণ্ঠস্বরের গভীরতা, উচ্চারণ ও স্বাচ্ছন্দ্য মূল্যায়ন করে একটি সুনির্দিষ্ট চিকিৎসা পরিকল্পনা তৈরি করেন। এই চিকিৎসা পদ্ধতিতে রোগীকে সঠিকভাবে শ্বাস নেওয়ার কৌশল, কণ্ঠের সঠিক ব্যবহার এবং দৈনন্দিন জীবনে কণ্ঠের স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কে দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়। বিভিন্ন ধরনের কণ্ঠ ব্যায়াম, পেশি শিথিলকরণের কৌশল এবং প্রয়োজনীয় আচরণগত পরিবর্তনের মাধ্যমে ধীরে ধীরে রোগীর কণ্ঠস্বরকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনা হয়। মনে রাখতে হবে, ভোকাল কর্ডের সমস্যা কোনো অস্ত্রোপচার ছাড়াই অনেকাংশে নিরাময়যোগ্য, যদি সঠিক সময়ে সঠিক থেরাপি নেওয়া যায়।
তবে বাংলাদেশের বাস্তবতা হলো, রাজধানী ঢাকার বাইরে জেলাপর্যায়ে এই চিকিৎসার বড় অভাব রয়েছে। পাশাপাশি সরকারি হাসপাতালগুলোয় পর্যাপ্তসংখ্যক স্পিচ অ্যান্ড ল্যাংগুয়েজ থেরাপি চিকিৎসকের নিয়োগ না থাকায় সাধারণ মানুষ এখনো অপচিকিৎসা বা অবহেলার শিকার হচ্ছেন। একটি সমীক্ষায় উঠে এসেছে, বাংলাদেশের প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষই জানেন না যে কণ্ঠের সমস্যার জন্য নাক, কান, গলাবিশেষজ্ঞের পাশাপাশি একজন স্পিচ অ্যান্ড ল্যাংগুয়েজ থেরাপি চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার প্রয়োজন আছে। অধিকাংশ মানুষ গলা ভাঙা বা বসে যাওয়াকে সাধারণ ঠান্ডা বা কাশির উপসর্গ মনে করে এড়িয়ে যান, যার ফলে পরে সমস্যা জটিল আকার ধারণ করে। তবে আশার কথা হলো, বাংলাদেশে স্পিচ অ্যান্ড ল্যাংগুয়েজ থেরাপি চিকিৎসা পেশাটি এখন দ্রুত বিকশিত হচ্ছে। বিশেষ করে, অটিজম সচেতনতা বৃদ্ধি পাওয়ার পর থেকে এই চিকিৎসা পদ্ধতির প্রয়োজনীয়তা সাধারণ মানুষের কাছে ধীরে ধীরে পরিচিতি পাচ্ছে।
লেখক : স্পিচ অ্যান্ড ল্যাংগুয়েজ থেরাপি বিভাগ
ময়মনসিংহ কলেজ অব ফিজিওথেরাপি অ্যান্ড হেলথ সায়েন্সেস