আমাদের দৈনন্দিন জীবনের খাদ্যাভ্যাস স্বাস্থ্যের ওপর গভীরভাবে প্রভাব ফেলে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—রোগের ঝুঁকি বাড়ায় বা কমায়। তবে বেশির ভাগ খাদ্য ওষুধের মতো কাজ করে। কিন্তু খাদ্য কখনোই প্রচলিত চিকিৎসার বিকল্প নয়, কারণ অনেক রোগের চিকিৎসা শুধু খাদ্য যথেষ্ট নয়। খাদ্য আমাদের দেহে কীভাবে কাজ করে ও সুরক্ষা দেয়? খাবারে থাকা বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান আমাদের দেহকে সতেজ ও সুস্থ রাখে। বিভিন্ন রোগবালাই থেকে রক্ষা করে। তাই, আমাদের উচিত পুষ্টিকর খাবার খাওয়া। কারণ এতে থাকা বিভিন্ন মাইক্রো এবং ম্যাক্রো উপাদানগুলো একত্রে কাজ করে—এমন প্রভাব সৃষ্টি করে, যা অন্য কোনো ওষুধে পাওয়া যায় না। নিম্নে বিভিন্ন ধরনের খাদ্যের প্রকারভেদ নিয়ে আলোচনা করা হলো—
ভিটামিন ও খনিজ পদার্থ
আমাদের শরীরে প্রতিদিন অল্প পরিমাণ ভিটামিন ও খনিজ প্রয়োজন। তবু যতটুকু প্রয়োজন তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বর্তমানে আমাদের দেশীয় সুস্থ খাদ্যাভ্যাসের মধ্যে পশ্চিমা খাদ্যাভ্যাস মিশ্রিত হয়ে পুষ্টিকর খাবার বাজারে নেই বললেই চলে। সর্বত্র অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত করা খাবারের পরিমাণ বেশি এবং তাজা ফলমূল-সবজির পরিমাণ খুবই কম। এর ফলে সাধারণত আমাদের দেহের ভিটামিন ও খনিজের ঘাটতি তৈরি করে। এ ধরনের ঘাটতি বিভিন্ন ধরনের রোগের ঝুঁকি বাড়ায়।
উদাহরণস্বরূপ—ভিটামিন C-এর অভাবে Scurvy (স্কার্ভি) নামক রোগ হয়। এই রোগের উপসর্গগুলো হলো—দুর্বলতা ও অবসাদ, মাড়ি ফুলে যাওয়া ও রক্তপাত, দাঁত নড়বড়ে হয়ে যাওয়া, ত্বকে দাগ বা ক্ষত, ক্ষত সারতে বিলম্ব হওয়া, রক্তাল্পতা (Anemia), হাড় ও জয়েন্টে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট ও বুকব্যথা। তবে এই রোগ চিকিৎসাযোগ্য এবং যথাসময়ে চিকিৎসা পেলে গুরুতর সমস্যা হয় না।
—ভিটামিন D-এর অভাবে Rickets (রিকেটস) রোগ হয়, যা হাড়ের সঠিক বিকাশজনিত একটি রোগ। এছাড়া ভিটামিন D-এর অভাবে Osteoporosis (অস্টিওপোরোসিস)-এর ঝুঁকি বাড়ে। ভিটামিন D রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার সঙ্গে সম্পর্কিত।
—ভিটামিন A-এর অভাবে বহুল প্রচলিত রাতকানা রোগ হয়ে থাকে। এই ভিটামিন আমরা ছোট মাছ, সবুজ শাকসবজি, ডিম থেকে পেয়ে থাকি।
উদ্ভিজ্জ উপাদান
আমরা জানি, শাক, সবজি, ফল, ডাল ও দানাজাতীয় অসংখ্য অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থাকে, যা কোষকে বিভিন্ন ক্ষতি থেকে রক্ষা করে ও সুরক্ষা প্রদান করে।
এই উদ্ভিদজাত খাদ্যগুলো আমাদের মানবদেহের হৃদরোগ, ডিমেনশিয়া, উচ্চ রক্তচাপসহ ইত্যাদি রোগের ঝুঁকি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ সাহায্য করে থাকে।
২০২১ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, যাদের খাদ্যে বেশি পলিফেনল অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থাকে, তাদের বিষণ্ণতা বা Depression (ডিপ্রেশন)-এর হার তুলনামূলকভাবে কম। এই পলিফেনল অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট উদ্ভিদজাত খাদ্যে সবচেয়ে বেশি পাওয়া যায়।
আঁশ (Fiber)
আঁশ একটি অপরিহার্য পুষ্টি উপাদান, যা হজমে সাহায্য করে এবং অন্ত্রে থাকা দেহের প্রয়োজনীয় ব্যাকটেরিয়াকে পুষ্টি জোগায়। বিপাকপ্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ফল, সবজি, ডাল ও দানাজাতীয় উচ্চ আঁশযুক্ত খাবার দেহে জ্বালা-যন্ত্রণা বা প্রদাহ কমায়। রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় এবং বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি হ্রাস করে। অন্যদিকে, আঁশ(Fiber) কম থাকা খাদ্যাভ্যাস কোলন ক্যানসার ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ায়।
প্রোটিন ও স্বাস্থ্যকর চর্বি
খাবারে থাকা প্রোটিন ও চর্বি আমাদের দেহের অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ সম্পাদন করে থাকে। প্রোটিনের মূল উপাদান অ্যামিনো অ্যাসিড। Amino Acid দেহের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি, পেশি গঠন, বিপাক প্রক্রিয়া ও দেহের বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করে। এছাড়া চর্বি আমাদের দেহে শক্তি জোগায় এবং পুষ্টি শোষণে সাহায্য করে। বিশেষ করে, Omega-3 ফ্যাটি অ্যাসিড, যা মাছের দেহের তেল হিসেবে পাওয়া যায়, বিভিন্ন প্রদাহ নিয়ন্ত্রণ করে, ভিটামিনের চাহিদা পূরণ করে, রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি, হৃৎপিণ্ডের কার্যকারিতা বৃদ্ধি করে।
সম্পূর্ণ ও পুষ্টিকর খাদ্যে থাকে ভিটামিন, খনিজ, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, আঁশ, প্রোটিন ও চর্বি, যা দেহের সঠিক কার্যকারিতা বজায় রাখতে এবং সুস্থতা রক্ষায় অপরিহার্য ভূমিকা পালন করে। ছোট-বড় যুবক, বৃদ্ধ বাবা-মা সবার উচিত নিয়মিত পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ করা। যার ফলে আমাদের শরীর থাকবে সতেজ সুস্থ এবং শক্তিশালী।
তথ্যসূত্র : হেলথ লাইন