গোল টেবিল বৈঠকে বিশেষজ্ঞরা
থাইরয়েড শরীরের গুরুত্বপূর্ণ একটি গ্রন্থি। যা প্রজাপতি আকৃতির গলার সামনের অংশে থাকে। এটি শরীরের হরমোন উৎপাদন ও নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। দেশে প্রায় ২০ শতাংশ মানুষ কোনো না কোনোভাবে থাইরয়েডের সমস্যা ভুগছে। আর এ রোগে আক্রান্তদের মধ্যে প্রতি সাতজনের মধ্যে পাঁচজনই নারী। আবার আক্রান্তদের মধ্যে ৬০ ভাগই চিকিৎসার আওতায় নেই। শনাক্তকরণে গুরুত্বের অভাবে প্রতিদিনই এ রোগের ভুক্তভোগী বাড়ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। একইসঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি থাইরয়েডের জটিলতা থেকে বাঁচতে জন্মের পর পরই শিশুর থাইরয়েড পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করতে সরকারের প্রতি দাবি জানিয়েছেন চিকিৎসকেরা।
মঙ্গলবার বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) নিনমাস কনফারেন্স রুমে বাংলাদেশ থাইরয়েড সোসাইটি (বিটিএস) ও বাংলাদেশ হেলথ রিপোর্টার্স ফোরাম (বিএইচআরএফ) আয়োজিত গোল টেবিল বৈঠকে এ দাবি জানানো হয়েছে। আগামী ২৫ মে বিশ্ব থাইরয়েড দিবসকে ঘিরে ‘আন্তর্জাতিক থাইরয়েড সচেতনতা সপ্তাহ’ উপলক্ষে আয়োজন করা হয়।
গোল টেবিল বৈঠকে প্রধান আলোচক ছিলেন সোসাইটির সভাপতি ও ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউক্লিয়ার মেডিসিন অ্যান্ড অ্যালায়েড সায়েন্সেসের (নিনমাস) পরিচালক অধ্যাপক ডা. এ কে এম ফজলুল বারী। অন্যান্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন সোসাইটির মহাসচিব অধ্যাপক ডা. নাসরিন সুলতানা, সাবেক মহাসচিব অধ্যাপক ডা. ফরিদুল আলম, সহ সভাপতি অধ্যাপক ডা. মো. আব্দুস সাত্তার, সহযোগী অধ্যাপক ডা. শাহজাদা সেলিম, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সহযোগী অধ্যাপক ডা জেসমীন ফেরদৌস, প্রকাশনা সম্পাদক সহযোগী অধ্যাপক ডা. পাপড়ি মুৎসুদ্দী, সাইন্টিফিক সেক্রেটারি সহকারী অধ্যাপক ডা. তপতী মন্ডল, বাংলাদেশ হেলথ রিপোর্টার্স ফোরামের সেক্রেটারি মুজাহিদ শুভসহ অনেকে।
গোল টেবিল বৈঠকে জানানো হয়, বাংলাদেশে আক্রান্তদের মধ্যে প্রতি ২৩শ শিশুর মধ্যে ১ জন শিশু জন্মগত থাইরয়েড সমস্যার শিকার হচ্ছে। যাদের পরিবারে থাইরয়েড রোগী আছে তাদের পরিবারের সকল সদস্যকে থাইরয়েড স্ক্রিনিংয়ের (শনাক্তকরণ) মাধ্যমে থাইরয়েড আছে কী না তা নির্ণয়ের জন্য আহ্বান জানানো হয়।
বৈঠকে উদ্বেগ প্রকাশ করে জানানো হয়, থাইরয়েড রোগীদের ৬ শতাংশ হাইপোথাইরয়েডিজমে ভুগছে। যারা ক্লান্তি, ওজন বৃদ্ধি, কোষ্ঠকাঠিন্য এবং ঠান্ডা সহ্য করতে পারেন না। কিন্তু তারা এ সমস্যার কথাই জানেন না। রোগের শুরুতে থাইরয়েড রোগ নির্ণয়ের মাধ্যমে এ রোগের সফল চিকিৎসা সম্ভব বলেও জানা চিকিৎসকেরা।
প্রধান আলোচক অধ্যাপক ডা এ কে এম ফজলুল বারী বলেন, থাইরয়েড গ্রন্থি শরীরের হরমোন নিঃসরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ, যা শরীরের বিপাক হার, হৃদস্পন্দন, রক্তচাপ, ওজন এবং তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে। কিন্তু এই ছোট্ট গ্রন্থিতে জটিলতা দেখা দিলে শরীরের নানা গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমে সমস্যা দেখা দিতে পারে। দেখা দিতে পারে হাইপোথাইরয়েডিজম, থাইরয়েড ক্যানসারের মত জটিলতা।
তিনি আরো বলেন, প্রাথমিক পর্যায়ে থাইরয়েড সমস্যা নির্ণয় করা গেলে তা খুব সহজেই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। কিন্তু সচেতনতার অভাব, উপসর্গ উপেক্ষা করা এবং সময়মতো পরীক্ষা না করানোর জন্য অনেক সময় বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। থাইরয়েড সমস্যাকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা এখন সময়ের দাবি।
অধ্যাপক ডা. বারী বলেন, বাংলাদেশে সরকারি অর্থায়নে থাইরয়েডে বরাদ্দ নেই বললেই চলে। অথচ থাইরয়েড শনাক্তকরণে ও চিকিৎসায় বড় বাজেট দরকার। বর্তমানে এ রোগে কতজন ভুগছে, সেটি জানা জরুরি। কিন্তু এর জন্য নিজস্ব যে কর্মসূচি থাকা দরকার, সেটি নেই। ফলে অন্যান্য দেশের চিত্র দিয়ে বাংলাদেশের রোগীর হিসেব করা হচ্ছে। এতে করে প্রকৃত আড়ালেই থাকছে।
এই চিকিৎসক বলেন, জীবনে চারটি সময়ে অবশ্যই থাইরয়েড স্ক্রিনিং করা প্রয়োজন। বিশেষ করে জন্মের পর পরই। সরকারের এটি বাধ্যতামূলক করার দাবি আমাদের। এছাড়াও বয়ঃসন্ধিকালে, মায়েদের গর্ভধারণের পূর্বে এবং বয়স ৫০ হওয়ার পর পরই।
সোসাইটির সহসভাপতি ডা. শাহজাদা সেলিম বলেন, সারা পৃথিবীতে ৫৮৯ মিলিয়ন ডায়াবেটিসরে রোগী আছে। থাইরয়েডের রোগীও প্রায় কাছাকাছি। কিন্তু ডায়াবেটিসের রোগীর সংখ্যা যতটা সহজে বলা যাচ্ছে, থাইরয়েডের ক্ষেত্রে যাচ্ছেনা, কারণ আমাদের নিজস্ব কোনো গবেষণা নেই। আমরা বলছি বাংলাদেশে ২০ শতাংশের মত, সে অনুযায়ী ৩ থেকে ৪ কোটি মানুষ এতে ভুগছেন। কিন্তু এটি কেন জানি এড়িয়ে যাচ্ছি আমরা। বিএমইউ হাসপাতালে যেসব মায়েরা চিকিৎসা করাতে আসেন, তাদের অন্তত ৮ শতাংশ হাইপোথাইরয়েডের রোগী। এটির কারণে মস্তিষ্কের বুদ্ধিমত্তা কমে যায়। এখন দরকার শনাক্তকরণ ও চিকিৎসা। এজন্য ব্যক্তি থেকে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
এ সময় বাংলাদেশ হেলথ রিপোর্টার্স ফোরামের সেক্রেটারি মুজাহিদ শুভ বলেন, স্বাস্থ্য সাংবাদিকতা নিয়ে যারা দীর্ঘদিন ধরে কাজ করেন, তারা হয়ত থাইরয়েডের বিষয়ে কিছুটা জানেন কিংবা সচেতন। কিন্তু প্রান্তিক অঞ্চলের তথা ঢাকার বাইরে জেলা শহরগুলোতে কাজ করা গণমাধ্যকর্মীরা এসব বিষয়ে প্রশিক্ষণ না পাওয়ায় সেভাবে ভূমিকা রাখতে পারেননা। কাজেই কর্মসূচিগুলোও শুধু ঢাকায় না, স্থানীয় পর্যায়ের গণমাধ্যমকর্মীদেরও সম্পৃক্ত করা উচিত। সমন্বিত উদ্যোগে যেহেতু থাইরয়েড সমস্যার সমাধান করা যায়, তাই কতজন মানুষ এ সম্পর্কে জানে সেটা গুরুত্বপূর্ণ।
পরে নিনমাসের অধ্যাপক ডা. কামালউদ্দিন আহমেদ অডিটোরিয়াম একটি বৈজ্ঞানিক সেমিনার আয়োজন করা হয়। এতে বিএমইউ উপাচার্য অধ্যাপক ডা এফ এম সিদ্দিকী প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। বিশেষ অতিথি ছিলেন প্রো ভাইস চ্যান্সেলর (গবেষণা ও উন্নয়ন) অধ্যাপক ডা. মো. মুজিবর রহমান হাওলাদার, বাংলাদেশ থাইরয়েড সোসাইটির সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ডা. ফওজিয়া মোসলেম এবং বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. এম এ করিম।
এএস