মোটা উরু নিয়ে সংকোচ বা কাউকে তা নিয়ে খোঁচা দেওয়ার দিন হয়তো শেষ হতে চলেছে। কারণ, গবেষণায় উরুর আকারের সঙ্গে দীর্ঘায়ুর একটি যোগসূত্রের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
অনেকেই নিজেদের পেশিবহুল ও মোটা উরু নিয়ে অস্বস্তিতে ভোগেন। যুক্তরাজ্যের দৌড়বিদ তাশা থম্পসনও একসময় নিজের উরু নিয়ে এমন ভাবতেন। তার মনে হতো, ‘ইশ, এগুলো যদি এত মোটা না হতো!’
কিছু সংস্কৃতিতে দীর্ঘদিন ধরে সরু পা সৌন্দর্যের মানদণ্ড হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। থম্পসন বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসকে বলেন, সমাজের সেই প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারলে নিজেকে কিছুটা ব্যর্থ মনে হতে পারে।
তবে সাম্প্রতিক গবেষণায় এর ভিন্ন চিত্র উঠে এসেছে। বড় বা স্থূল উরুকে অযথা সমালোচনা করা হয়েছে এবং উরুর আকারের সঙ্গে দীর্ঘায়ুর সম্পর্ক থাকতে পারে—এমন প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে।
প্রায় ২৫ হাজার অংশগ্রহণকারীকে নিয়ে করা একটি মেটা-অ্যানালাইসিসে দেখা গেছে, উরুর পরিধি প্রতি ৫ সেন্টিমিটার বাড়ার সঙ্গে যেকোনো কারণে মৃত্যুঝুঁকি ১৮ শতাংশ কমে। মেটা-অ্যানালাইসিস হলো একই বিষয়ে করা বিভিন্ন গবেষণার ফল একত্র করে সামগ্রিক সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর পদ্ধতি।
তবে এর অর্থ এই নয় যে শুধু উরুর আকার বাড়ানোর জন্যই ব্যায়াম করতে হবে। গবেষকদের মতে, মূল বিষয় হলো উরুর পেশির শক্তি।
মোটা উরুর উপকারিতা কী
গবেষকদের ধারণা, ২০২০ সালের ওই মেটা-অ্যানালাইসিসে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের দীর্ঘায়ুর সঙ্গে তাদের পায়ের তুলনামূলক বেশি পেশির সম্পর্ক থাকতে পারে। পেশির পরিমাণ বেশি হলে উরু দেখতে পূর্ণ হয়।
যুক্তরাজ্যের কিংস কলেজ লন্ডনের বার্ধক্য ও স্বাস্থ্যবিষয়ক অধ্যাপক ক্লেয়ার স্টিভস বলেন, উরুর তিন ধরনের টিস্যুর মধ্যে পেশির সঙ্গে স্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ুর অত্যন্ত শক্তিশালী সম্পর্কের প্রমাণ রয়েছে।
বেশি পেশি রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে। এতে ডায়াবেটিস, হৃদরোগ ও অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদি রোগের ঝুঁকি কমতে পারে।
২০০৯ সালে ব্রিটিশ মেডিক্যাল জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা যায়, নারী ও পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রেই চিকন উরুর সঙ্গে হৃদরোগ ও মৃত্যুঝুঁকি বাড়ার সম্পর্ক রয়েছে।
শক্তিশালী উরু বয়স্কদের শারীরিক দুর্বলতা প্রতিরোধেও সহায়তা করতে পারে। এতে তাদের স্বনির্ভরতা বাড়ে।
ক্লেয়ার স্টিভস লন্ডনের গাইজ অ্যান্ড সেইন্ট থমাস হাসপাতালের পরামর্শক জেরিয়াট্রিশিয়ানও। তিনি বলেন, পরবর্তী বয়সে শারীরিক সক্ষমতার জন্য উরুর সামনের দিকের পেশি বা কোয়াড্রিসেপস খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, চেয়ার থেকে ওঠা ও চলাফেরায় এসব পেশি বড় ভূমিকা রাখে।
শুধু শরীরের চলাফেরাই নয়, পায়ের শক্তির সঙ্গে মস্তিষ্কের সুস্থ বার্ধক্যেরও সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
৩০০-এর বেশি যমজ নারীর পায়ের শক্তি পরিমাপ করে করা এক গবেষণায় দেখা যায়, শুরুতে যাদের পায়ের শক্তি বেশি ছিল, ১০ বছর পর তাদের চিন্তা ও বোঝার ক্ষমতা এবং মস্তিষ্কের গঠন তুলনামূলকভাবে ভালো ছিল।
পায়ের পেশি মস্তিষ্ককে কীভাবে সহায়তা করে
বিজ্ঞানীদের ধারণা, সক্রিয় পেশি এমন কিছু রাসায়নিক তৈরি করে, যা প্রদাহ কমাতে পারে। একই সঙ্গে এগুলো মস্তিষ্কের বিভিন্ন নেটওয়ার্ককে সুরক্ষা দিতে পারে। ফলে বয়স বাড়ার সঙ্গে মস্তিষ্ককে সুস্থ রাখতে পেশি ভূমিকা রাখতে পারে।
স্টিভস বলেন, শারীরিক কার্যকলাপ রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার ওপরও শক্তিশালী প্রভাব ফেলে।
কিংস কলেজ লন্ডনের আরেকটি গবেষণায় অত্যন্ত সক্রিয় বয়স্ক সাইক্লিস্টদের পর্যবেক্ষণ করা হয়। এতে দেখা যায়, তাদের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা তরুণদের মতোই সক্রিয় ছিল। কিছু ক্ষেত্রে তা ২০-এর কোঠায় থাকা মানুষের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার সঙ্গে মিলে যায়।
উরুকে কীভাবে শক্তিশালী করা যায়
ফিটনেস কোচ এলিজাবেথ ডেভিসের মতে, দীর্ঘায়ুর জন্য উরুর নির্দিষ্ট আকারের দিকে নয়, পেশির শক্তির দিকে মনোযোগ দেওয়া উচিত।
‘ট্রেইনিং ফর ইয়োর ওল্ড লেডি বডি’ বইয়ের লেখক ডেভিস বলেন, কেউ যদি বছরের পর বছর মনে করেন তার উরু আরো সরু, বড় বা অন্য রকম হওয়া উচিত ছিল, তাহলে সেই মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসার সময় এসেছে। বরং উরু কী করতে পারে, সেদিকে মনোযোগ দেওয়া উচিত।
তিনি বলেন, চিকন বা মোটা—যেকোনো উরুই শক্তিশালী হতে পারে।
গবেষণাতেও উরুর আকারের চেয়ে শক্তিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার প্রমাণ রয়েছে। ২০০৬ সালে সত্তরের কোঠায় থাকা ব্যক্তিদের নিয়ে করা এক গবেষণায় দেখা যায়, ছোট পেশির চেয়ে দুর্বল পায়ের পেশি মৃত্যুর শক্তিশালী পূর্বাভাস দিয়েছে।
উরুর শক্তি বাড়াতে রেজিস্ট্যান্স ট্রেনিং সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতিগুলোর একটি বলে মনে করেন ডেভিস। ওজন নিয়ে ব্যায়ামের আরো একটি সুবিধা হলো, এটি হাড়ের ঘনত্ব বাড়াতে পারে এবং অস্টিওপোরোসিস প্রতিরোধে সহায়তা করতে পারে। অস্টিওপোরোসিস হলে হাড় দুর্বল ও ভঙ্গুর হয়ে পড়ে।
ডেভিসের পরামর্শ, সপ্তাহে দুই থেকে তিন দিন পায়ের ব্যায়াম দিয়ে শুরু করা যেতে পারে। তার মতে, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নিজের বর্তমান সক্ষমতা অনুযায়ী শুরু করা এবং সময়ের সঙ্গে ধীরে ধীরে ব্যায়ামের মাত্রা বাড়ানো।
ওজন নিয়ে ব্যায়াম অনেকের কাছে আকর্ষণীয় না হলেও ডেভিস এটিকে দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজনীয় অংশ হিসেবে দেখতে বলেন। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, দাঁতের ফ্লস ব্যবহার করাও তার খুব পছন্দের নয়। কিন্তু মুখের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে তিনি এটি করেন।
একইভাবে শক্তিবর্ধক ব্যায়ামকে উপভোগ্য করে তোলার বিষয়েও গুরুত্ব দেন তিনি। তার মতে, এই ব্যায়ামের বাস্তব উপকার অনুভব করা গেলে আগ্রহ বাড়ে। যেমন নাতি-নাতনিকে কোলে নিয়ে সহজে হাঁটতে পারা বা ভারী কোনো জিনিস অনায়াসে গাড়িতে তুলে দিতে পারা—এসবই শক্তিশালী পেশির বাস্তব সুফল।
উরুর চর্বিরও কি উপকার আছে?
উরুতে থাকা চর্বির কথাও আলাদাভাবে বিবেচনা করছেন গবেষকেরা। স্টিভসের মতে, শরীরের অন্যান্য অংশের চর্বির তুলনায় উরুর চর্বি তুলনামূলক কম ক্ষতিকর। বিশেষ করে পেটের চারপাশের চর্বির তুলনায় এটি কম ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
অঙ্গপ্রত্যঙ্গের চারপাশে জমা চর্বিকে ভিসেরাল ফ্যাট বলা হয়। এটি টাইপ-২ ডায়াবেটিস, হৃদরোগ এবং বিপাকীয় অকার্যকারিতার সঙ্গে সম্পর্কিত এমএএসএইচের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। এসব সমস্যার কারণে যকৃত বিকল হওয়া ও ক্যানসারের ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
অন্যদিকে, শরীরের নিচের অংশের চর্বি কিছু ক্ষেত্রে সুরক্ষামূলক ভূমিকা পালন করতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, এই অঞ্চলের চর্বি কোষ ক্ষতিকর ফ্যাটি অ্যাসিড আটকে রাখতে সক্ষম।
এর ফলে শরীরের নিচের অংশের চর্বি এলডিএল বা ‘খারাপ’ কোলেস্টেরল কমাতে এবং এইচডিএল বা ‘ভালো’ কোলেস্টেরল বাড়াতে সাহায্য করতে পারে। একই সঙ্গে এটি রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণেও ভূমিকা রাখতে পারে।
চর্বি শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় শক্তির মজুত হিসেবেও কাজ করে। অসুস্থতার সময় এই শক্তি বিশেষ করে বয়স্কদের জন্য উপকারী হতে পারে।
উরুর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ টিস্যু হলো হাড়।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সারকোপেনিয়া নামের একটি অবস্থার কারণে পেশির ভর ও শক্তি কমে যেতে পারে। সারকোপেনিয়া অস্টিওপোরোসিসকে ত্বরান্বিত করতে পারে। এতে হাড়ের ঘনত্ব কমে গিয়ে হাড় ভঙ্গুর হয়ে পড়ে।
তাই শক্তিশালী হাড় থাকা বার্ধক্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন স্টিভস। রেজিস্ট্যান্স ট্রেনিংয়ের মাধ্যমে হাড়ের শক্তি বাড়ানো সম্ভব।
নিজের শরীরের শক্তিকে গুরুত্ব দিন
উরু কীভাবে আরো শক্তিশালী করা যায়, সেদিকে মনোযোগ দেওয়া তাশা থম্পসনের চিন্তাভাবনাও বদলে দিয়েছে।
‘ব্ল্যাক গার্ল ডু রান ইউকে’ কমিউনিটির প্রতিষ্ঠাতা থম্পসন বলেন, কন্যাসন্তান হওয়ার পর উরু নিয়ে ব্যবহৃত ভাষাও তিনি বদলে ফেলেছেন। এখন তিনি উরুকে ‘মোটা’ বা ‘বড়’ না বলে ‘শক্তিশালী’ বলেন।
আল্ট্রাম্যারাথন দৌড়ানো ও ট্রায়াথলনে অংশ নেওয়া থম্পসন বলেন, মানুষ ভিন্ন ভিন্ন গড়ন ও আকার নিয়ে জন্মায়। তাই শরীর দেখতে কেমন, তার চেয়ে সেটি কী করতে পারে, সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
সূত্র: বিবিসি বাংলা
এএম