এসজিপিটি (সেরাম গ্লুটামিক পাইরুভিক ট্রান্সঅ্যামিনেজ), যা চিকিৎসা বিজ্ঞানে এএলটি (অ্যালানিন অ্যামিনোট্রান্সফারেজ) নামে পরিচিত, লিভারের কোষে থাকা একটি গুরুত্বপূর্ণ এনজাইম। লিভারের কোষ ক্ষতিগ্রস্ত হলে এই এনজাইম রক্তে বৃদ্ধি পায়। তাই এসজিপিটি লিভারের কার্যকারিতা ও স্বাস্থ্য পরিস্থিতি নির্ণয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ বায়োকেমিক্যাল সূচক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। সাধারণভাবে এসজিপিটির স্বাভাবিক মাত্রা ৭ থেকে ৫৬ ইউনিট/লিটার ধরা হয়। এর বেশি মান লিভারে প্রদাহ বা কোষীয় ক্ষতির ইঙ্গিত বহন করে।
এসজিপিটি কী
এটি মূলত লিভারের কোষের ভেতরে অবস্থান করে এবং অ্যামিনো অ্যাসিড বিপাকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। লিভারের কোষে প্রদাহ, সংক্রমণ বা ক্ষতি হলে এই এনজাইম রক্তে প্রবেশ করে এবং এর মাত্রা বৃদ্ধি পায়। তাই এসজিপিটি শুধু একটি ল্যাবরেটরি সূচক নয়, বরং এটি লিভারের ভেতরের কার্যক্ষমতা ও স্বাস্থ্য পরিস্থিতি বোঝার একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক। চিকিৎসকদের জন্য এটি রোগ নির্ণয় ও পর্যবেক্ষণে অত্যন্ত সহায়ক।
বৃদ্ধি পাওয়ার প্রধান কারণ
এসজিপিটি বেড়ে যাওয়ার পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে, যেমন—
* ভাইরাসজনিত হেপাটাইটিস (এ, বি, সি, ই)
* ফ্যাটি লিভার রোগ (লিভারে অতিরিক্ত চর্বি জমা)
* ডায়াবেটিস ও স্থূলতা
* দীর্ঘদিন বা অতিরিক্ত ওষুধ সেবনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
* অ্যালকোহলজনিত লিভার ক্ষতি
* অটোইমিউন হেপাটাইটিস (শরীরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ভুল আক্রমণ)
* বিষাক্ত রাসায়নিক বা টক্সিনের সংস্পর্শ
* পিত্তনালির বাধা বা সংক্রমণ
লক্ষণ
অনেক ক্ষেত্রে প্রাথমিক পর্যায়ে কোনো উপসর্গ থাকে না। তবে রোগের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে দেখা দিতে পারে—
* অতিরিক্ত দুর্বলতা ও ক্লান্তি
* ক্ষুধামান্দ্য
* বমি-বমি ভাব বা বমি
* ডান পাশে উপরের পেটে ব্যথা বা অস্বস্তি
* জন্ডিস (চোখ ও ত্বক হলুদ হওয়া)
* গাঢ় রঙের প্রস্রাব
* শরীর ব্যথা
* হালকা জ্বর
এসজিপিটির মাত্রা অনুযায়ী অবস্থা
* স্বাভাবিক : ৭–৫৬ ইউনিট/লিটার
* হালকা বৃদ্ধি : ৫৭–২০০ ইউনিট/লিটার
* মাঝারি বৃদ্ধি : ২০০–৫০০ ইউনিট/লিটার
* তীব্র বৃদ্ধি : ৫০০ ইউনিট/লিটারের বেশি
এসজিপিটি পরিবর্তনের ব্যাখ্যা
এসজিপিটি যদি উচ্চ মাত্রা থেকে স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরে আসে, তবে সাধারণত বোঝায়—
* লিভারের প্রদাহ নিয়ন্ত্রণে এসেছে
* লিভার কোষ পুনরুদ্ধার হচ্ছে
* চিকিৎসা ও জীবনযাপনের পরিবর্তন কার্যকর হয়েছে
তবে শুধু এসজিপিটি স্বাভাবিক হওয়া মানেই রোগ সম্পূর্ণ সেরে গেছে, এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়। কারণ অনেক সময় মূল কারণ তখনো বিদ্যমান থাকতে পারে।
রোগ নির্ণয়ের প্রয়োজনীয় পরীক্ষা
লিভারের সঠিক অবস্থা মূল্যায়নের জন্য সাধারণত নিচের পরীক্ষাগুলো করা হয়—
* এসজিওটি (অ্যাসপার্টেট অ্যামিনোট্রান্সফারেজ)
* সিরাম বিলিরুবিন পরীক্ষা
* আলকালাইন ফসফাটেজ (এএলপি)
* হেপাটাইটিস বি সারফেস অ্যান্টিজেন
* হেপাটাইটিস সি অ্যান্টিবডি আল্ট্রাসনোগ্রাম
* ফাইব্রোস্ক্যান (প্রয়োজনে)
* সম্পূর্ণ রক্ত পরীক্ষা (সিবিসি)
জটিলতা
চিকিৎসা না নিলে লিভারের সমস্যা দীর্ঘ মেয়াদে জটিল রূপ নিতে পারে, যেমন—
* দীর্ঘস্থায়ী হেপাটাইটিস
* লিভার ফাইব্রোসিস
* লিভার সিরোসিস
* লিভার ফেইলিউর
* পেটে পানি জমা (অ্যাসাইটিস)
* রক্তক্ষরণজনিত সমস্যা
* লিভার ক্যানসারের ঝুঁকি বৃদ্ধি
প্রতিরোধে করণীয়
* স্বাস্থ্যকর ও সুষম খাদ্য গ্রহণ
* অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত খাবার পরিহার
* নিয়মিত শারীরিক ব্যায়াম
* শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা
* অপ্রয়োজনীয় ওষুধ বর্জন
পরিশেষে বলা যায়, এসজিপিটি লিভারের কার্যকারিতা নির্ণয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। এর বৃদ্ধি লিভারের ক্ষতি বা প্রদাহ নির্দেশ করে, আর স্বাভাবিক হওয়া সাধারণত সুস্থতার দিকে অগ্রগতির লক্ষণ। তবে সঠিক রোগ নির্ণয়ের জন্য অন্যান্য পরীক্ষার ফলাফলের সঙ্গে মিলিয়ে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনই লিভার রোগ প্রতিরোধের মূল ভিত্তি।
লেখক : প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান
জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটি