পবিত্র রমজান মাসে মুসলমানরা সংযম ও ইবাদতের মাধ্যমে আত্মশুদ্ধির চর্চা করেন। এ সময় অনেকেই দৈনন্দিন জীবনযাপনে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করেন, বিশেষ করে স্বাস্থ্যসংক্রান্ত বিষয়ে। তবে নাক-কান-গলার (ইএনটি) কোনো সমস্যা দেখা দিলে রোজা রেখে চিকিৎসা গ্রহণ করা যাবে কি না—এ প্রশ্ন প্রায়ই রোগীদের মনে সংশয় তৈরি করে। নাকের স্প্রে, কানের ড্রপ, গড়গড়া বা অ্যান্টিবায়োটিক সেবন রোজার ওপর প্রভাব ফেলবে কি না—এ নিয়ে সচেতন দিকনির্দেশনা প্রয়োজন। চিকিৎসাবিজ্ঞান ও শরিয়াহর আলোকে বিষয়গুলো পরিষ্কারভাবে জানা থাকলে রমজানে চিকিৎসা গ্রহণ আরো সহজ ও স্বস্তিদায়ক হতে পারে।
টনসিল প্রদাহ ও গলার সংক্রমণ
টনসিল প্রদাহ বা গলার ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণে অনেক সময় অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণ জরুরি হয়ে পড়ে। সাধারণত কিছু অ্যান্টিবায়োটিক দিনে তিন থেকে চারবার খেতে হয়, আবার কিছুদিনে এক বা দুবার খেলেই কার্যকর হয়। রমজান মাসে চিকিৎসকরা সচেতনভাবে এমন অ্যান্টিবায়োটিক নির্বাচন করে থাকেন, যা ইফতার ও সাহরির সময় গ্রহণ করা সম্ভব। এতে রোগীর চিকিৎসাও সম্পন্ন হয়, আবার রোজাও বজায় থাকে। প্রয়োজনে ওষুধের ডোজ ও সময়সূচি সামঞ্জস্য করে নেওয়া যায়। রোজা রেখে অ্যান্টিবায়োটিক ইনজেকশন শিরায় নেওয়া যায়। তবে শক্তি বাড়ায় এমন কিছু (যেমন : স্যালাইন) শিরাপথে আইভি দেওয়া যাবে না।
রোজা অবস্থায় গড়গড়া করার বিষয়ে সতর্কতা
গলাব্যথা, টনসিল প্রদাহ বা মুখের দুর্গন্ধের কারণে অনেকেই দিনে বেলা লবণ-পানি কিংবা ওষুধমিশ্রিত পানি দিয়ে গড়গড়া করতে চান। তবে রোজা থাকা অবস্থায় চিকিৎসকরা সাধারণত টনসিল আক্রান্ত রোগীদের দিনের বেলায় গড়গড়া করতে নিরুৎসাহিত করে থাকেন। এর কারণ হলো, গড়গড়া করার সময় অল্প পরিমাণ তরল অনিচ্ছাকৃতভাবে গলা বেয়ে পাকস্থলীতে পৌঁছে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে, যা রোজা ভঙ্গের কারণ হতে পারে। তাই রোজা অবস্থায় দিনের বেলায় গড়গড়া করা পরিহার করাই উত্তম। প্রয়োজনে ইফতারের পর কিংবা সাহরির সময় গড়গড়া করা যেতে পারে। এতে গলার পরিচর্যাও বজায় থাকবে এবং রোজার পবিত্রতাও অক্ষুণ্ণ থাকবে।
সাইনোসাইটিস ও নাকের সমস্যা
সাইনোসাইটিসে নাক বন্ধ থাকা, মাথাব্যথা ও নাক দিয়ে পুঁজ পড়ার মতো উপসর্গ দেখা দেয়। এ ক্ষেত্রে নাকের ড্রপ বা স্প্রে ব্যবহারের প্রয়োজন হয়। রোজা অবস্থায় দিনের বেলায় নাকে ওষুধ প্রয়োগ করলে তা নাক দিয়ে গলা হয়ে পাকস্থলীতে পৌঁছানোর আশঙ্কা থাকে। তাই সাহরির সময় ও ইফতারের পর নাকের ড্রপ বা স্প্রে ব্যবহার করাই নিরাপদ ও গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি। চিকিৎসক প্রয়োজনে ডোজ সমন্বয় করে দিতে পারেন। পানিস্বল্পতা হলে মাইগ্রেনের তীব্রতা বাড়ে; তাই মাইগ্রেনের রোগীদের যেন রোজায় পানির ঘাটতি না হয়, সেটি ইফতার এবং সাহরির সময় বিশেষভাবে লক্ষ রাখতে হবে।
কান পাকা ও কানের অন্যান্য রোগ
কান পাকা বা কানের সংক্রমণে কানের ড্রপ ব্যবহারের প্রয়োজন হয়। সাধারণভাবে মনে করা হয়, কানে ওষুধ দিলে রোজা ভাঙে না। কিন্তু বাস্তবে অনেক রোগীর কানের পর্দায় (ইয়ারড্রাম) ছিদ্র থাকতে পারে। সে ক্ষেত্রে কানে দেওয়া তরল ওষুধ কানের সঙ্গে নাকের সংযোগকারী টিউব দিয়ে ভেতরের পথে গলা পর্যন্ত পৌঁছানোর সম্ভাবনা থাকে। তাই রোজা থাকা অবস্থায় কানে ড্রপ ব্যবহার না করে সাহরি ও ইফতারের পর ব্যবহার করাই উত্তম ও নিরাপদ।
রোজা ভঙ্গের বিষয়ে শরিয়াহর দৃষ্টিভঙ্গি
ইসলামি শরিয়াহ অনুযায়ী, ইচ্ছাকৃতভাবে পাকস্থলীতে কোনো কিছু পৌঁছালে রোজা ভেঙে যায়। এ বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—‘নাকে পানি দেওয়ার সময় ভালোভাবে পানি পৌঁছাবে, তবে রোজা থাকলে অতিরিক্ত করবে না।’ (সুনান আবু দাউদ, তিরমিজি, সহিহ)
এই হাদিসের আলোকে আলেমরা ব্যাখ্যা করেছেন, নাক এমন একটি পথ, যার মাধ্যমে কোনো কিছু পাকস্থলীতে পৌঁছাতে পারে। তাই রোজা অবস্থায় নাক দিয়ে কোনো তরল প্রবেশ করানো থেকে বিরত থাকাই নিরাপদ। রমজানে নাক-কান-গলার চিকিৎসা নেওয়া সম্ভব, তবে তা হতে হবে পরিকল্পিত ও সচেতনভাবে। চিকিৎসক ও রোগীর সমন্বয়ের মাধ্যমেই এমন চিকিৎসা দেওয়া যায়, যাতে রোগ নিরাময় হয় এবং রোজার পবিত্রতাও অক্ষুণ্ণ থাকে। সুস্থ শরীর ইবাদতের সহায়ক—এই উপলব্ধি থেকে রমজানে চিকিৎসা ও ইবাদত—দুটোই সমান গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
লেখক : নাক-কান-গলা রোগবিশেষজ্ঞ
সহকারী অধ্যাপক (ইএনটি), ওসমানী মেডিকেল
কলেজ হাসপাতাল, সিলেট