স্মার্টফোন এখন আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু প্রয়োজনীয় কাজের পাশাপাশি অপ্রয়োজনীয় স্ক্রলিং, ভিডিও দেখা ও নোটিফিকেশনে অনেক সময় নষ্ট হয়। অথচ এই ফোন দিয়েই ইংরেজি শেখা, নতুন দক্ষতা অর্জন, কঠিন বিষয় বোঝা, গুরুত্বপূর্ণ নথি সংরক্ষণ এবং ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার মতো কাজ করা যায়। ফোনের পরিচিত ব্যবহারের বাইরে থাকা এমন ১০টি কার্যকর সুবিধা জেনে নিলে স্মার্টফোনকে আরো বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে কাজে লাগানো সম্ভব।
১. ইংরেজি শেখা
ইংরেজিতে কথা বলা, নতুন শব্দ শেখা কিংবা উচ্চারণের অনুশীলন করতে এখন সবসময় কোচিংয়ে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। স্মার্টফোনে অনুবাদ অ্যাপ, ইংরেজি শেখার অ্যাপ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক সহকারীর সাহায্যে নিয়মিত অনুশীলন করা যায়। প্রতিদিন কয়েকটি নতুন শব্দ শেখা, নিজের পরিচয় ইংরেজিতে দেওয়া এবং ছোট ছোট কথোপকথনের অনুশীলনের মাধ্যমে ধীরে ধীরে দক্ষতা বাড়ানো সম্ভব। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে ইংরেজি কথোপকথনের সঙ্গী হতে বলুন। নিজের লেখা বা বাক্যের ভুল ধরিয়ে দিতে বলুন এবং কেন ভুল হয়েছে, তা বুঝে নিন।
২. কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে শিক্ষকের মতো ব্যবহার
কোনো কঠিন বিষয় বুঝতে সমস্যা হলে স্মার্টফোনের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক সহকারীর সাহায্য নেওয়া যায়। জটিল বিষয় সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করা, পড়ার রুটিন তৈরি, লেখার খসড়া সাজানো কিংবা কোনো দক্ষতা শেখার ধাপ তৈরি করার মতো কাজে এটি সহায়ক হতে পারে। শুধু উত্তর না চেয়ে বিষয়টি উদাহরণসহ সহজভাবে বুঝিয়ে দিতে বলুন। শেষে কয়েকটি প্রশ্নের মাধ্যমে নিজের বোঝাপড়া যাচাই করতে বলুন। তবে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য, পরিসংখ্যান ও উদ্ধৃতি নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে যাচাই করুন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সবসময় সঠিক উত্তর দেয় না।
৩. ক্যামেরা দিয়ে লেখা কপি ও অনুবাদ
কোনো বই, পোস্টার, নোটিস কিংবা বিদেশি ভাষার নির্দেশনা বুঝতে না পারলে ক্যামেরা কাজে লাগতে পারে। গুগল লেন্স বা গুগল ট্রান্সলেটের মতো অ্যাপ দিয়ে ছবির লেখা শনাক্ত, কপি ও অনুবাদ করা যায়। কিছু ভাষার অনুবাদ ইন্টারনেট ছাড়াও করা সম্ভব, যদি প্রয়োজনীয় ভাষার তথ্য আগে থেকে ডাউনলোড করে রাখা থাকে। ক্যামেরায় লেখাটি ধারণ করুন, প্রয়োজনীয় ভাষা নির্বাচন করুন এবং অনুবাদ দেখে নিন। অস্পষ্ট ছবি, হাতের লেখা কিংবা জটিল বাক্যের অনুবাদে ভুল হতে পারে।
৪. টাইপ না করেই লেখা তৈরি
দীর্ঘ বার্তা, নোট কিংবা ইমেইল লিখতে সময় লাগলে ভয়েস টাইপিং ব্যবহার করা যায়। ফোনের কী-বোর্ডে মাইক্রোফোন আইকনে চাপ দিয়ে কথা বললে সমর্থিত ভাষায় তা লেখায় রূপান্তরিত হয়। এতে দ্রুত খসড়া তৈরি করা সহজ হয় এবং টাইপ করার ঝামেলাও কমে। স্পষ্টভাবে কথা বলুন, ছোট ছোট বাক্য ব্যবহার করুন এবং লেখা তৈরি হওয়ার পর বানান, নাম, সংখ্যা ও যতিচিহ্ন যাচাই করুন। সব কী-বোর্ডে সব ভাষার ভয়েস টাইপিং সমান ভালো কাজ করে না।
৫. কাগজের নথি স্ক্যান করে পিডিএফ তৈরি
সার্টিফিকেট, আবেদনপত্র, রসিদ কিংবা গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র ডিজিটালভাবে সংরক্ষণ করতে আলাদা স্ক্যানার প্রয়োজন হয় না। গুগল ড্রাইভের মতো অ্যাপে ফোনের ক্যামেরা দিয়ে নথি স্ক্যান করে পিডিএফ তৈরি করা যায়। একাধিক পৃষ্ঠাও একই ফাইলে রাখা সম্ভব। নথিটি সমতল জায়গায় রাখুন এবং পর্যাপ্ত আলো নিশ্চিত করুন। স্ক্যান করার পর লেখা পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে কি না, তা পরীক্ষা করুন। গুরুত্বপূর্ণ ফাইলের ব্যাকআপ রাখুন এবং ব্যক্তিগত নথি অপরিচিত কারো সঙ্গে শেয়ার করবেন না।
৬. স্ক্রিনের লেখা শুনে নেওয়া
দীর্ঘ নিবন্ধ পড়ার সময় না থাকলে কিংবা চোখে পড়তে অসুবিধা হলে ফোনের লেখা পড়ে শোনানোর সুবিধা ব্যবহার করা যায়। অ্যান্ড্রয়েডের কিছু ফোনে ‘সিলেক্ট টু স্পিক’ বা টেক্সট টু স্পিচ সুবিধার মাধ্যমে সমর্থিত লেখা কণ্ঠে শোনা যায়। এটি পড়াশোনা, ভাষা শেখা এবং দীর্ঘ নথি বোঝার ক্ষেত্রে কাজে লাগে। ফোনের সেটিংসে অ্যাক্সেসিবিলিটি বিভাগে গিয়ে সুবিধাটি খুঁজুন। সমর্থিত লেখা নির্বাচন করে শুনুন। বাংলা কণ্ঠের সুবিধা ফোন ও ব্যবহৃত ভাষার তথ্যের ওপর নির্ভর করতে পারে।
৭. হারানো ফোন খুঁজে বের করা
ফোন হারিয়ে গেলে অন্য ডিভাইস থেকে গুগলের ফাইন্ড হাব অথবা অ্যাপলের ফাইন্ড মাই সুবিধা ব্যবহার করে ফোনের অবস্থান খোঁজা, শব্দ বাজানো কিংবা দূর থেকে লক করার চেষ্টা করা যায়। কিছু ক্ষেত্রে ফোনের তথ্য মুছে ফেলার ব্যবস্থাও রয়েছে। আগে থেকেই ফোনে প্রয়োজনীয় অ্যাকাউন্ট যুক্ত রাখুন, স্ক্রিন লক চালু করুন এবং ফোন খুঁজে পাওয়ার সেটিংস পরীক্ষা করুন। ফোন বন্ধ থাকলে, নেটওয়ার্ক না থাকলে কিংবা সুবিধাটি চালু না থাকলে অবস্থান শনাক্ত করা সীমিত হতে পারে।
৮. বিপদের সময় জরুরি সংকেত পাঠানো
অনেক স্মার্টফোনে ইমার্জেন্সি এসওএস সুবিধা রয়েছে। নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে এটি চালু করলে জরুরি নম্বরে কল করা, নির্ধারিত পরিচিতদের কাছে অবস্থানের তথ্য পাঠানো কিংবা অন্য জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার ব্যবস্থা থাকতে পারে। তবে ফোন, অপারেটিং সিস্টেম ও দেশের ভিত্তিতে সুবিধার ধরন আলাদা হয়। ফোনের সেটিংসে ‘সেফটি অ্যান্ড ইমার্জেন্সি’ বা এ ধরনের বিভাগ খুঁজে জরুরি যোগাযোগের নম্বর যুক্ত করুন। সুবিধাটি কীভাবে চালু হয়, তা আগে জেনে রাখুন। পরীক্ষা করার সময় যেন ভুল করে জরুরি কল চলে না যায়, সেদিকে খেয়াল রাখুন।
৯. পাসওয়ার্ড মনে রাখার ঝামেলা কমানো
অনেক অ্যাকাউন্টের জন্য আলাদা পাসওয়ার্ড মনে রাখা কঠিন। গুগল পাসওয়ার্ড ম্যানেজারের মতো সুবিধা শক্তিশালী পাসওয়ার্ড তৈরি ও সংরক্ষণ করতে এবং প্রয়োজনের সময় স্বয়ংক্রিয়ভাবে পূরণ করতে পারে। সমর্থিত সেবায় পাসকি ব্যবহার করে প্রচলিত পাসওয়ার্ড ছাড়াও সাইন ইন করা যায়। প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অ্যাকাউন্টে আলাদা পাসওয়ার্ড ব্যবহার করুন, দুই ধাপের যাচাইকরণ চালু রাখুন এবং গুগল অ্যাকাউন্টের নিরাপত্তা নিশ্চিত করুন। অপরিচিত লিংকে পাসওয়ার্ড বা যাচাইকরণ কোড দেবেন না।
১০. অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করুন
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নোটিফিকেশন ও বারবার ফোন দেখা কাজের মনোযোগ নষ্ট করতে পারে। অ্যান্ড্রয়েডের ডিজিটাল ওয়েলবিয়িংয়ের মতো সুবিধা দিয়ে কোন অ্যাপে কত সময় ব্যয় হচ্ছে, তা দেখা, নির্দিষ্ট অ্যাপের সময়সীমা নির্ধারণ এবং ফোকাস মোড চালু করা যায়। ফোকাস মোডে নির্বাচিত অ্যাপ সাময়িকভাবে বিরতিতে রাখা যায় এবং সেগুলোর নোটিফিকেশন বন্ধ থাকে। পড়াশোনা বা কাজের সময় অপ্রয়োজনীয় অ্যাপের ব্যবহার সীমিত করুন। ঘুমের আগে নোটিফিকেশন বন্ধ রাখুন এবং প্রতিদিনের স্ক্রিন টাইম পর্যালোচনা করুন।