পর্ব ২: একটি বিজ্ঞাপন কীভাবে মানুষের স্ক্রিনে পৌঁছায়?
একটি ইম্প্রেশন - এর নেপথ্যে কয়েক মিলিসেকেন্ডের প্রযুক্তিগত দৌড়
সকাল ১০টা। অফিসে বসে রাফিদ তার ল্যাপটপে আগের দিনের একটি ক্যাম্পেইনের রিপোর্ট দেখছিলেন। হঠাৎ পাশের ডেস্কের সহকর্মী বললেন,
- “ভাই, একটা বিষয় বলেন তো। আমরা যখন নিউজ ওয়েবসাইটে ঢুকি, তখন বিজ্ঞাপনটা আসলে কীভাবে আমাদের সামনে আসে?”
রাফিদ একটু হেসে বললেন,
- “আপনি কি মনে করেন, ওয়েবসাইটে ঢোকার আগেই বিজ্ঞাপনটা সেখানে পড়ে থাকে?”
- “তা না হলে?”
- “তাহলে চলুন, একটা নিউজ পেজ খুলে দেখি।”
রাফিদ একটি নিউজ ওয়েবসাইট খুললেন। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই স্ক্রিনে একটি ব্যানার বিজ্ঞাপন ভেসে উঠল।
ব্যাপারটি দেখতে খুবই সাধারণ। কিন্তু এই কয়েক মুহূর্তের আড়ালে ঘটে যেতে পারে বেশ কয়েকটি প্রযুক্তিগত ধাপ।
প্রথম ধাপ: পেজ লোড
একজন ব্যবহারকারী যখন কোনো নিউজ ওয়েবসাইটে ঢোকেন, তখন ওয়েবপেজ লোড হতে শুরু করে। সেই পেজের মধ্যে থাকতে পারে এক বা একাধিক এডভার্টাইজিং স্লট বা অ্যাড প্লেসমেন্ট।
কোথাও ব্যানার, কোথাও ভিডিও, আবার কোথাও ন্যাটিভ অ্যাড - এর জন্য জায়গা নির্ধারিত থাকে।
রাফিদ বললেন,
- “এই জায়গাটাকে আপনি খালি (শূণ্য) একটি বিজ্ঞাপনের জায়গা ভাবতে পারেন। কিন্তু জায়গাটি খালি থাকলেই তো হবে না। এখানে কোন বিজ্ঞাপন দেখানো হবে, সেটিও ঠিক করতে হবে।”
এরপর ঐ এডভার্টাইজিং স্লট - এর জন্য পাবলিশার - এর এডভার্টাইজিং সিস্টেম - এ একটি অ্যাড রিকোয়েস্ট তৈরি হতে পারে।
দ্বিতীয় ধাপ: অ্যাড রিকোয়েস্ট
অ্যাড রিকোয়েস্ট - এর সহজ অর্থ: এই এডভার্টাইজিং অপরচুনিটি - এর জন্য একটি বিজ্ঞাপন প্রয়োজন।
এই রিকোয়েস্ট - এর সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের অনুমোদিত সিগন্যাল যুক্ত হতে পারে। যেমন - কোন ওয়েবসাইট বা অ্যাপ, কোন অ্যাড প্লেসমেন্ট, ডিভাইস টাইপ, জিওগ্র্যাফিক ইনফরম্যাশন এবং পেজ - এর কনটেন্ট কনটেক্সট।
তবে এখানে প্রাইভেসি ও কনসেন্ট - এর বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। কোন তথ্য ব্যবহার করা যাবে, কীভাবে ব্যবহার করা যাবে - এসব নির্ধারণে প্রযোজ্য প্রাইভেসি রুলস ও কনসেন্ট ফ্রেমওয়ার্ক অনুসরণ করতে হয়।
তৃতীয় ধাপ: কে বিজ্ঞাপন দিবে?
রাফিদ এবার বললেন,
- “ধরুন, এই জায়গায় বিজ্ঞাপন দেওয়ার জন্য একাধিক বিজ্ঞাপনদাতা আগ্রহী।”
প্রোগ্রাম্যাটিক এডভার্টাইজিং environment - এ বিভিন্ন বায়ার (buyer) বা ডিমান্ড সোর্স একই এডভার্টাইজিং অপরচুনিটি - তে আগ্রহ দেখাতে পারে।
কিন্তু সবাই একই ইম্প্রেশন - এর জন্য সমান মূল্য দিতে চায় না।
কারণ, একজন বিজ্ঞাপনদাতা হয়তো নির্দিষ্ট অডিয়েন্স খুঁজছে, অন্যজন হয়তো সেই অডিয়েন্স - এর জন্য আগ্রহী নয়।
চতুর্থ ধাপ: অকশন
এরপর শুরু হতে পারে একটি রিয়েল টাইম অকশন (Real Time Auction)।
সহজভাবে বললে, একটি নির্দিষ্ট এডভার্টাইজিং অপরচুনিটি তৈরি হয়েছে। একাধিক বায়ার সেটি পাওয়ার জন্য প্রতিযোগিতা করছে।
কেউ বলছে, “এই ইম্প্রেশন - এর জন্য আমি এত টাকা দিতে প্রস্তুত।”
অন্যজন বলছে, “আমি এর চেয়ে বেশি দিতে পারি।”
তবে শুধু সর্বোচ্চ bid করলেই সবসময় বিজ্ঞাপনটি জিতে যাবে - বিষয়টি এত সরল নয়। অকশন মেকানিক্স, ডিল টাইপ, টার্গেটিং, পাবলিশার রুলস এবং ইলিজিবিলিটি - এর মতো বিষয়ও সিদ্ধান্তে ভূমিকা রাখতে পারে।
পঞ্চম ধাপ: উইনিং অ্যাড
নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী একটি বিজ্ঞাপন নির্বাচিত হলে সেটি পাবলিশার - এর ওয়েবপেজে রেন্ডার হতে পারে। ব্যবহারকারী তখন স্ক্রিনে বিজ্ঞাপনটি দেখতে পান।
অর্থাৎ খুব সংক্ষেপে পুরো যাত্রাটি হতে পারে:
User → Page → Ad Request → Demand → Auction/Selection → Ad Response → Creative Render → Impression
সবকিছু ঘটে এত দ্রুত যে ব্যবহারকারী সাধারণত এর কিছুই দেখতে পান না।
তাহলে অ্যাডপ্স - এর কাজ কোথায়?
রাফিদ বললেন,
- “এই পুরো প্রক্রিয়া স্বয়ংক্রিয় হলেও অ্যাডপ্স - এর কাজ কিন্তু শেষ হয়ে যায় না।”
তাকে দেখতে হয় ক্যাম্পেইন এক্টিভ কি না, ক্রিয়েটিভ ইলিজিবল কি না, টার্গেটিং সঠিক কি না, ইনভেন্টরি ইলিজিবল কি না এবং ট্র্যাকিং ঠিক মতো কাজ করছে কি না।
ধরা যাক, একটি ক্যাম্পেইন - এর দৈনিক ৫ লাখ ইম্প্রেশন পাওয়ার কথা। কিন্তু দুপুর পর্যন্ত এসেছে মাত্র ৫০ হাজার।
তখন প্রশ্ন উঠবে - কেন?
টার্গেটিং কি অতিরিক্ত ন্যারো (Narrow)? ইনভেন্টরি কি পর্যাপ্ত নয়? ক্রিয়েটিভ কি অসমর্থিত? নাকি কোনো টেকনিক্যাল ইস্যু হয়েছে?
এই জায়গাতেই অ্যাডপ্স টিম - কে সমস্যার কারণ খুঁজে বের করতে হয়।
একটি বিজ্ঞাপন এমন একজন মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারে, যিনি সত্যিই ঐ পণ্যের সম্ভাব্য ক্রেতা। আবার একই বিজ্ঞাপন এমন কারও কাছেও যেতে পারে, যার পণ্যটির প্রতি কোনো আগ্রহই নেই। তাই আধুনিক এডভার্টাইজিং - এ শুধু বেশি ইম্প্রেশন নয়, ভ্যালুয়েবল ইম্প্রেশন তৈরি করাও গুরুত্বপূর্ণ।
পাবলিশার - এর দৃষ্টিকোণ
অন্যদিকে পাবলিশার - এর কাছেও প্রতিটি ইম্প্রেশন গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ওয়েবসাইটের এডভার্টাইজিং ইনভেন্টরি তার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিজনেস এসেট।
তবে বিজ্ঞাপন দেখাতে গিয়ে যদি পেজ ধীর হয়ে যায়, অতিরিক্ত বিজ্ঞাপন আসে, ইন্ট্রুসিভ ফরম্যাট ব্যবহার হয় কিংবা ইরেলিভেন্ট অ্যাড দেখানো হয় - তাহলে পাঠকের এক্সপেরিয়েন্স নষ্ট হতে পারে।
তাই পাবলিশার - কে একসঙ্গে ভাবতে হয়:
Revenue + User Experience + Brand Trust
একটি ইম্প্রেশন তৈরি হতে হয়তো এক সেকেন্ডও লাগে না। কিন্তু সেই এক সেকেন্ডের পেছনে চলে প্রযুক্তির এক দ্রুতগতির দৌড়।
আর সেই দৌড় ঠিকভাবে চলছে কি না, তা নিশ্চিত করার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব থাকে অ্যাডপ্স - এর।
(চলবে)
লেখক: অ্যাড ম্যানেজার (অনলাইন), আইটি বিভাগ, আমার দেশ