ছোটখাটো বিষয় থেকে শুরু করে গুরুগম্ভীর যেকোনো তথ্য খোঁজার জন্য বিশ্বজুড়ে অনেকেরই প্রথম পছন্দ উইকিপিডিয়া। তবে ২০২৪ সালে ভারতে বার্তা সংস্থা এশিয়ান নিউজ ইন্টারন্যাশনালের (এএনআই) করা এক মানহানি মামলার জেরে নতুন করে আলোচনায় এসেছে এই প্ল্যাটফর্মটি।
দিল্লির হাইকোর্ট স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, ভারতীয় আইন না মানলে দেশটিতে উইকিপিডিয়া নিষিদ্ধ করা হতে পারে। এই পরিস্থিতির আলোকেই প্রশ্ন উঠেছে—উইকিপিডিয়া আসলে কীভাবে পরিচালিত হয় এবং এর তথ্য কতটা নির্ভরযোগ্য?
উইকিপিডিয়া কী এবং কীভাবে কাজ করে?
উইকিপিডিয়া হলো একটি ইন্টারনেটভিত্তিক মুক্ত বিশ্বকোষ বা 'অনলাইন এনসাইক্লোপিডিয়া'। ২০০১ সাল থেকে শুরু হওয়া এই প্ল্যাটফর্মটি সম্পূর্ণ বিনামূল্যে ব্যবহার করা যায় এবং এটি একটি 'ওপেন সোর্স' সফটওয়্যার। 'উইকিমিডিয়া ফাউন্ডেশন' নামের একটি অলাভজনক সংস্থা এটি পরিচালনা করে। বর্তমানে উইকিপিডিয়ায় ৬ কোটিরও বেশি নিবন্ধ রয়েছে এবং প্রতি মাসে এর পেজভিউ ১০ লাখ কোটি বারেরও বেশি।
উইকিপিডিয়ার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো, এর নিয়ন্ত্রণ নির্দিষ্ট কোনো গোষ্ঠীর হাতে নেই। যেকোনো ব্যক্তি এর নতুন পেজে লিখতে পারেন কিংবা বিদ্যমান তথ্য পরিবর্তন বা সম্পাদনা করতে পারেন।
কারা লেখেন এই তথ্য?
উইকিপিডিয়ার তথ্যগুলো মূলত স্বেচ্ছাসেবকরাই লিখে থাকেন। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে প্রায় ৩ লাখ স্বেচ্ছাসেবক এই প্ল্যাটফর্মের জন্য কাজ করছেন। তারাই তথ্য সংগ্রহ করেন এবং তা যাচাই করেন।
উইকিমিডিয়া ফাউন্ডেশনের দাবি, এই কাজের জন্য স্বেচ্ছাসেবকদের কোনো বেতন দেওয়া হয় না এবং তারা চাইলে নিজেদের পরিচয় গোপন রাখতে পারেন।
কোনো গাইডলাইন আছে কি?
উইকিমিডিয়া ফাউন্ডেশন জানিয়েছে, কোন পেজে কী লেখা হচ্ছে, তার ওপর সংস্থার সরাসরি কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। তবে লেখার ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা ও গাইডলাইন রয়েছে। যেমন—একেবারে নতুন বা কোথাও প্রকাশিত হয়নি, এমন কোনো তথ্য এখানে লেখা যায় না। শুধুমাত্র নির্ভরযোগ্য কোনো মুদ্রিত উৎসকে ভিত্তি করেই নিবন্ধ লিখতে হয়।
সব তথ্য সম্পাদক, ওয়েবসাইটের প্রশাসক এবং 'কম্পিউটার বট' দ্বারা নিরীক্ষণ করা হয়। কোনো নিবন্ধ নিয়ে বিতর্ক দেখা দিলে প্রবীণ সম্পাদকরা তা পরিবর্তন বা বাদ দিতে পারেন। বিতর্কিত বিষয়গুলো আলোচনার মাধ্যমে পারস্পরিক সম্মতিতে চূড়ান্ত করা হয় এবং বিতর্কের বিষয়টি পেজে উল্লেখ থাকে।
উইকিপিডিয়ার তথ্য কতটা নির্ভরযোগ্য?
উইকিপিডিয়া নিজেই স্বীকার করে যে, এখানকার তথ্যকে প্রাথমিক বা প্রধান উৎস হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়। একাডেমিক জগতের ব্যক্তিরাও এটিকে পুরোপুরি নির্ভরযোগ্য উৎস হিসেবে বিবেচনা করেন না। তবে প্রতিটা লেখার নিচে একটি তথ্যসূত্রের তালিকা থাকে, যা থেকে মূল তথ্য যাচাই করে নেওয়া সম্ভব।
মিডিয়া বিশেষজ্ঞ ও যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়া ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির অধ্যাপক অ্যামি ব্রুকম্যানের মতে, কম পরিচিত বিষয়ের ক্ষেত্রে উইকিপিডিয়ার তথ্য পুরোপুরি বিশ্বাসযোগ্য নাও হতে পারে। তবে বহুল পরিচিত ও জনপ্রিয় বিষয়গুলোর তথ্য 'সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য' হিসেবে কাজ করে। কারণ হাজার হাজার মানুষ এই লেখাগুলো নিয়মিত পর্যালোচনা ও সংশোধন করেন।
পক্ষপাতিত্বের সমালোচনা
উইকিপিডিয়ার বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগও রয়েছে। সমালোচকদের মতে, এখানে পুরুষ লেখকদের সংখ্যা বেশি হওয়ায় পুরুষদের নিয়ে নিবন্ধের সংখ্যাও বেশি।
এ ছাড়া রক্ষণশীল থিংক ট্যাংক 'ম্যানহাটন ইনস্টিটিউট'-এর গবেষণায় দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের ডানপন্থি ব্যক্তিত্বদের এই প্ল্যাটফর্মে কিছুটা নেতিবাচকভাবে দেখানোর প্রবণতা রয়েছে। তবে সার্বজনীন তথ্য সংগ্রহের জন্য মাধ্যমটি গুরুত্বপূর্ণ বলে তারা স্বীকার করেছে।
অর্থ আসে কোথা থেকে?
উইকিপিডিয়ার পেজে কোনো বিজ্ঞাপন থাকে না এবং তারা ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত তথ্য বিক্রি করেও আয় করে না। মূলত ব্যবহারকারীদের দেওয়া স্বেচ্ছামূলক অনুদানের অর্থ দিয়েই এটি পরিচালিত হয়। ২০২২-২৩ সালে উইকিমিডিয়া ফাউন্ডেশন ১৮ কোটি ডলারেরও বেশি অনুদান পেয়েছে।
বিভিন্ন দেশে নিষেধাজ্ঞা
বিশ্বের অন্তত ১৩টি দেশে উইকিপিডিয়ার ওপর বিভিন্ন ধরনের বিধি-নিষেধ রয়েছে। চীন, মিয়ানমার ও উত্তর কোরিয়া এটি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেছে। রাশিয়া ও ইরান এর কিছু নির্দিষ্ট লেখা ব্লক করে রেখেছে। এ ছাড়া ২০২৩ সালে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগে তিন দিনের জন্য উইকিপিডিয়া নিষিদ্ধ করেছিল পাকিস্তান।
এএম