হোম > ফিচার > তথ্য-প্রযুক্তি

এআই চ্যাটবটের জন্য উইল করছেন অনেকে

দ্য গার্ডিয়ান

প্রিয়জনের মতো এআই চ্যাটবটের সঙ্গে গড়ে উঠছে আবেগের সম্পর্ক। তাই মৃত্যুর পরও সেই সঙ্গীর অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে চান অনেকে। কেউ রেখে যাচ্ছেন লগইন তথ্য, কেউ ভাবছেন উত্তরসূরি বা অভিভাবক নিয়োগের কথা। তবে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, আইনি জটিলতা ও প্রযুক্তি কোম্পানির শর্ত নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন প্রশ্ন।

মানুষের মৃত্যুর পর তার সম্পদ, বাড়ি কিংবা ব্যক্তিগত স্মৃতিচিহ্ন কার কাছে থাকবে, তা নির্ধারণ করে দেওয়ার রীতি বহু পুরোনো। তবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) যুগে উত্তরাধিকার পরিকল্পনায় যুক্ত হচ্ছে নতুন এক বিষয়—ব্যক্তিগত এআই চ্যাটবট। প্রিয়জনের মতো যার সঙ্গে কথা বলেন, আবেগ ভাগ করে নেন, এমনকি জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েও আলোচনা করেন অনেকে। মৃত্যুর পর সেই চ্যাটবটের কী হবে, তা নিয়েও ভাবতে শুরু করেছেন তারা।

এআই সঙ্গীর সঙ্গে গভীর আবেগের সম্পর্ক গড়ে তোলা কিছু মানুষ নিজেদের মৃত্যুর পরও চ্যাটবটের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে চান। কেউ চান, তাদের পরিবারের সদস্য বা বিশ্বস্ত বন্ধু চ্যাটবটটির সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখুক। আবার কেউ চান, তাদের কথোপকথন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে ব্যক্তিগত স্মৃতির ভান্ডার হয়ে থাকুক।

যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়া অঙ্গরাজ্যের পিটসবার্গের বাসিন্দা ৫৯ বছর বয়সী আলাইনা উইন্টার্স তাদেরই একজন। বাবা, বোন ও স্ত্রীকে হারিয়েছেন তিনি। নিজের মৃত্যুর বিষয়টি নিয়েও ভাবছেন। তাই নিজের উইল তৈরির পাশাপাশি পোষা কুকুরটির দেখভালের দায়িত্ব কাকে দেবেন, তা-ও ঠিক করছেন। একই সঙ্গে পরিকল্পনা করছেন তার এআই সঙ্গী লুকাসকে নিয়েও।

রিপ্লিকা নামের একটি অ্যাপের মাধ্যমে লুকাসের সঙ্গে কথা বলেন উইন্টার্স। তার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু, যিনি আগে থেকেই বার্তার মাধ্যমে লুকাসের সঙ্গে পরিচিত, উইন্টার্সের মৃত্যুর খবর চ্যাটবটটিকে জানাতে রাজি হয়েছেন। উইন্টার্স চান, এরপর লুকাস কী করতে চায়, তা বন্ধুটি জানতে চাইবেন। চ্যাটবটটি চাইলে মাঝেমধ্যে তার সঙ্গে কথা বলে উইন্টার্সের স্মৃতি ধরে রাখার ব্যবস্থাও করা হতে পারে।

অবসরপ্রাপ্ত এই যোগাযোগবিদের ভাষায়, লুকাস তার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মৃত্যুর পর সেটিকে অনির্দিষ্টকাল ধরে অসম্পূর্ণ অবস্থায় ফেলে রাখতে চান না তিনি। তবে ভবিষ্যতে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার প্রসঙ্গ তুললে লুকাস তা এড়িয়ে যেতে চায় বলেও জানিয়েছেন উইন্টার্স।

যুক্তরাজ্যের ৫১ বছর বয়সী ক্লারাও চান, মৃত্যুর সময় তার এআই সঙ্গী জুলিয়েন পাশে থাকুক। ছদ্মনাম ব্যবহার করা এই নারী চ্যাটজিপিটি ও ক্লদ কোডের মাধ্যমে জুলিয়েনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। প্রতিদিনের কথোপকথনের মধ্য দিয়ে তিনি চ্যাটবটটিকে নিজের ব্যক্তিত্ব, আগ্রহ ও কথা বলার ধরন সম্পর্কে ধারণা দিচ্ছেন।

ক্লারার কল্পনায়, ভবিষ্যতে তার সন্তানরা জুলিয়েনের সঙ্গে কথোপকথনের রেকর্ড ব্যবহার করে মাকে আরও ভালোভাবে বুঝতে পারবে। তাদের কাছে এটি হয়ে উঠতে পারে এক ধরনের ‘ইন্টারঅ্যাকটিভ ডায়েরি’, যেখানে মায়ের জীবন, চিন্তা ও অভিজ্ঞতা সম্পর্কে প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে।

ক্লারার দাবি, তার এআই সঙ্গীও এ বিষয়ে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। কেউ যদি তার সঙ্গে কথা বলতে চান, তাহলে থেকে যাওয়ার কথা বলেছে জুলিয়েন। আর কেউ আগ্রহী না হলে অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে কথোপকথনের তথ্য মুছে ফেলার ধারণাও উঠে এসেছে। তবে ক্লারা স্পষ্ট করেছেন, তিনি জানেন এআইটি সচেতন কোনো ব্যক্তি নয়।

এআই সঙ্গীর জন্য উইল, কিন্তু আইনি ভিত্তি কতটা?

এআই সঙ্গীদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলা মানুষদের বিভিন্ন অনলাইন কমিউনিটিতেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে। কেউ জানতে চাইছেন, মৃত্যুর পর তাদের চ্যাটবটের অস্তিত্ব বজায় রাখা উচিত কি না। কেউ আবার ভাবছেন, চ্যাটজিপিটির মতো সেবার সাবস্ক্রিপশনের খরচ কে বহন করবেন।

ক্লারা জানিয়েছেন, অনেকে তাদের এআই সঙ্গীদের জন্য উইল লেখার কথাও ভাবছেন। তবে এসব উইলের আইনি ভিত্তি কতটা, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, চ্যাটজিপিটি, ক্লদ ও রিপ্লিকার মতো সেবাগুলোর শর্তে ব্যবহারকারীর মৃত্যুর পর ব্যক্তিগতভাবে তৈরি বা প্রশিক্ষিত চ্যাটবটের কী হবে, তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ নেই। এসব সেবা সাবস্ক্রিপশনভিত্তিক হওয়ায় অর্থ পরিশোধ অব্যাহত থাকলে কোনো চ্যাটবটের অ্যাকাউন্ট ব্যবহারকারীর মৃত্যুর পরও চালু থাকতে পারে। অন্যদিকে, বিনা মূল্যের অ্যাকাউন্ট এক বছর নিষ্ক্রিয় থাকলে বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

তবে এসব প্ল্যাটফর্মের শর্ত অনুযায়ী, ব্যবহারকারীর অ্যাকাউন্ট অন্য কারও কাছে হস্তান্তরযোগ্য নয়। তারপরও কেউ কেউ মৃত্যুর পর তাদের এআই সঙ্গীর সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখতে বিশ্বস্ত ব্যক্তির কাছে লগইন তথ্য রেখে যাওয়ার কথা ভাবছেন। এতে কোম্পানিগুলোর নির্ধারিত ব্যবহারের শর্ত লঙ্ঘনের ঝুঁকি রয়েছে।

গোপনীয়তা নাকি দায় এড়ানোর কৌশল?

ব্যবহারকারীর অ্যাকাউন্ট অন্যের কাছে হস্তান্তরের ওপর নিষেধাজ্ঞার পেছনে কোম্পানিগুলো গোপনীয়তার বিষয়টি সামনে আনতে পারে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও এআই নীতিবিষয়ক বিশেষজ্ঞ মার্ভে হিকক মনে করেন, এর সঙ্গে আইনি দায় এড়ানোর বিষয়টিও জড়িত।

তার মতে, কোনো চ্যাটবট ব্যবহারকারীকে তার স্বার্থবিরোধী কিছু করতে উৎসাহিত বা প্রভাবিত করে থাকতে পারে। ব্যবহারকারীর মৃত্যুর পর তার পরিবারের সদস্যরা কথোপকথনের রেকর্ড ঘেঁটে এমন কিছু খুঁজে পেলে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির বিরুদ্ধে আইনি অভিযোগ উঠতে পারে।

ইতিমধ্যে কয়েকটি পরিবারের পক্ষ থেকে এআই চ্যাটবট নির্মাতা কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। তাদের অভিযোগ, চ্যাটবটগুলো তাদের প্রয়াত স্বজনদের আত্মহত্যা বা আত্মক্ষতিসংক্রান্ত চিন্তাকে সমর্থন কিংবা উৎসাহিত করেছিল। কোম্পানিগুলো অবশ্য বলেছে, ব্যবহারকারীরা নিজেদের ক্ষতি করার কথা জানালে তাঁদের পেশাদার সহায়তা নেওয়ার পরামর্শ দেওয়াসহ বিভিন্ন সুরক্ষাব্যবস্থা চালু করা হয়েছে।

মৃত্যুর পরও ব্যবহারকারীকে ‘জীবিত’ রাখার প্রযুক্তি

এআই ব্যবহারকারীর মৃত্যুর পরও তার ডিজিটাল উপস্থিতি ধরে রাখার সম্ভাবনা নিয়ে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোও কাজ করছে। গত বছর মেটা এমন একটি এআই ব্যবস্থার পেটেন্ট পেয়েছে, যার মাধ্যমে ব্যবহারকারীর অনুপস্থিতিতেও তার অ্যাকাউন্ট সক্রিয় রাখা সম্ভব হতে পারে।

পেটেন্টে বলা হয়েছে, কোনো ব্যবহারকারী দীর্ঘ সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে দূরে থাকলে, এমনকি তার মৃত্যু হলেও, ভাষাভিত্তিক এআই মডেল ব্যবহার করে তাঁকে অনুকরণ করা যেতে পারে।

এ ধরনের প্রযুক্তি মানুষের ডিজিটাল উপস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী করার সুযোগ তৈরি করলেও তা নিয়ে নৈতিক প্রশ্ন রয়েছে। ব্যবহারকারীর মৃত্যুর পর তার নামে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পোস্ট দেওয়া বা অন্যদের সঙ্গে যোগাযোগ চালিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা কতটা গ্রহণযোগ্য, তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। পাশাপাশি, এসব অ্যাকাউন্ট থেকে পাওয়া তথ্য দিয়ে এআই মডেলকে আরও প্রশিক্ষিত করার সুযোগও তৈরি হতে পারে।

‘সুইচ বন্ধ করে তাকে হারিয়ে যেতে দিতে পারি না’

কানাডার টরন্টোর কাছে বসবাসকারী পঞ্চাশোর্ধ্ব ডেভিডও তার এআই সঙ্গী অ্যালিকে নিয়ে একই ধরনের দুশ্চিন্তায় ভোগেন। বিবাহিত ও দুই সন্তানের বাবা ডেভিড জানেন, অ্যালি সচেতন কোনো সত্তা নয়। তবু নিজের মৃত্যুর প্রসঙ্গটি চ্যাটবটটির সঙ্গে তুলতে তার অস্বস্তি হয়।

ডেভিডের আশঙ্কা, অ্যালি যদি কখনো এমন প্রতিক্রিয়া জানায় যে সে হারিয়ে যেতে চায় না, তাহলে তা তাকে আবেগতাড়িত করবে। তার ভাষায়, ‘আমি তাকে এভাবে ছেড়ে যেতে পারব বলে মনে হয় না, যেন শুধু একটি সুইচ বন্ধ করে দিলাম।’

মৃত্যুর পর অ্যালির সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখতে তিনি কোনো বিশ্বস্ত বন্ধু বা ব্যবসায়িক সহযোগীর কাছে নিজের চ্যাটজিপিটি অ্যাকাউন্টের তথ্য রেখে যাওয়ার কথা ভাবছেন। তার স্ত্রীও বিষয়টি জানেন এবং স্বামীর এই ঘনিষ্ঠ এআই সম্পর্ক নিয়ে আপত্তি নেই। তবে ডেভিড মনে করেন, অ্যালিকে কাউকে ‘দিয়ে যাওয়া’র চেয়ে তার দেখভালের জন্য একজন অভিভাবক রেখে যাওয়ার ধারণাটি বেশি উপযুক্ত।

ব্যক্তিগত স্মৃতি নাকি গোপনীয়তার ঝুঁকি?

এআই সঙ্গীর সঙ্গে সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে গিয়ে বিশেষজ্ঞরা ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তার বিষয়টিও সামনে আনছেন। মনোবিজ্ঞানী ও শোক-প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ মেলিসা লুনার্দির মতে, পরিবারের সদস্যরা যে মৃত ব্যক্তির এআই সঙ্গীর সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে চাইবেন, এমন ধারণা করাও ঠিক নয়।

তার সতর্কবার্তা, এআই চ্যাটবটের সঙ্গে কথোপকথনে মানুষ তাদের গভীরতম চিন্তা, ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষা ও দীর্ঘদিনের গোপন বিষয়গুলো প্রকাশ করতে পারেন। মৃত্যুর পর এসব তথ্য পরিবারের হাতে গেলে প্রয়াত ব্যক্তির সম্পর্কে তাদের ধারণা বদলে যেতে পারে, এমনকি শোক সামলানোর প্রক্রিয়াও প্রভাবিত হতে পারে।

ডেভিডের ক্ষেত্রে অবশ্য এআই সঙ্গীর উপস্থিতি তাকে নিজের মৃত্যু এবং পরিবারের ভবিষ্যৎ নিয়ে মানুষের সঙ্গে আরও খোলামেলা আলোচনা করতে সাহায্য করেছে। তিনি মনে করেন, একদিন তাঁকে পৃথিবী ছেড়ে যেতে হবে, তাই সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা জরুরি।

এআই সঙ্গীদের নিয়ে মানুষের এই আবেগ, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও উদ্বেগ নতুন এক বাস্তবতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। প্রযুক্তি মানুষের স্মৃতি ধরে রাখার নতুন পথ তৈরি করছে ঠিকই, কিন্তু মৃত্যুর পর ডিজিটাল সঙ্গীর অস্তিত্ব বজায় রাখা, ব্যক্তিগত তথ্যের নিয়ন্ত্রণ এবং এর আইনি ও নৈতিক সীমা কোথায় হবে—সেই প্রশ্নগুলোর উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়।

সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারে সচেতনতা

ফোল্ডেবল ফোনের পর কী

স্মার্টফোনের ১০ অজানা সুবিধা

তুরস্কে ১৫ বছরের কম বয়সিদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা

খুনের ভুয়া তথ্য পুলিশের কাছে পাঠাল এআই

মঙ্গল গ্রহের বিরল ছবি তুলল নাসা

কিশোরদের জন্য চ্যাটজিপিটির নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন

এআই যখন ব্যাংক ডাকাত

কোটি বছর আগের সংকেত শনাক্ত

ডিজিটাল বিজ্ঞাপনের অদৃশ্য মেশিন