ওয়েবসাইট আর বিজ্ঞাপনের গল্প : সকাল ১০টা ২০ মিনিট। রাফিদ তখন আগের দিনের একটি ক্যাম্পেইনের রিপোর্ট দেখছিলেন। হঠাৎ পাশের ডেস্কের তানভীর বললেনÑভাই, একটা জিনিস অনেক দিন ধরে ভাবছি। আমি বাসায় যে বিজ্ঞাপন দেখি, আপনি কি অফিসে বসে একই বিজ্ঞাপন দেখেন?
রাফিদ বললেনÑসবসময় না।
Ñকেন? আমরা তো একই ওয়েবসাইটে ঢুকি!
রাফিদ চেয়ার ঘুরিয়ে বললেনÑওয়েবসাইট একই হতে পারে, কিন্তু বিজ্ঞাপন দেখানোর সময় দুজন ব্যবহারকারীর জন্য পরিস্থিতি এক নাও হতে পারে।
তানভীরের কৌতূহল আরো বাড়ল।
রাফিদ একটি ক্যাম্পেইনের সেটিংস খুললেন।
Ñধরুন, এক কোম্পানি নতুন একটি মোটরসাইকেল বাজারে এনেছে। তারা ২৫ থেকে ৪০ বছর বয়সী নির্দিষ্ট এলাকার মানুষের কাছে বিজ্ঞাপনটি বেশি দেখাতে চায়। এখন প্রশ্ন হলো, ওয়েবসাইটে ঢোকা প্রত্যেক মানুষকেই কি একই বিজ্ঞাপন দেখানো হবে?
Ñমনে হয় না।
Ñঠিক। এখানেই আসে টার্গেটিং (Targeting)।
টার্গেটিংয়ের নেপথ্যে কী
ডিজিটাল বিজ্ঞাপনে একজন ব্যবহারকারীকে বোঝার জন্য বিভিন্ন ধরনের অনুমোদিত সিগন্যাল ব্যবহার করা হতে পারে। যেমন : ডিভাইসের ধরন, ভৌগোলিক তথ্য, ওয়েবপেজের কনটেক্সট, ভাষা, সময় বা ক্যাম্পেইনের নির্ধারিত অডিয়েন্স সিগন্যাল।
তানভীর বললেনÑতাহলে কি বিজ্ঞাপনদাতা প্রত্যেক মানুষের ব্যক্তিগত তথ্য জানেন?
রাফিদ মাথা নাড়লেন।
Ñবিষয়টা এত সরল নয়। ব্যক্তিগত তথ্য, কনসেন্ট, প্রাইভেসি এবং কোন ডেটা কীভাবে ব্যবহার করা যাবেÑএসবের ওপর নির্দিষ্ট নিয়ম রয়েছে। সব ধরনের ডেটা ইচ্ছেমতো সংগ্রহ বা ব্যবহার করা যায় না।
রাফিদ এবার আরেকটি উদাহরণ দিলেন।
Ñধরুন, আপনি একটি রান্নার রেসিপি পড়ছেন। আর আমি পড়ছি ফুটবল নিয়ে খবর। একই ওয়েবসাইট হলেও আমাদের পেজের কনটেক্সট আলাদা। বিজ্ঞাপনদাতা যদি কনটেক্সট বিবেচনা করে, তাহলে আমাদের সামনে ভিন্ন বিজ্ঞাপন আসতে পারে।
Ñমানে আমার পড়া বিষয়টাও বিজ্ঞাপন নির্বাচনে ভূমিকা রাখতে পারে?
Ñকিছু ক্ষেত্রে, হ্যাঁ। এটাকে কনটেক্সচুয়াল টার্গেটিংয়ের একটি উদাহরণ হিসেবে ভাবতে পারেন।
কথা বলতে বলতে রাফিদ একটি ক্যাম্পেইনের সেটিংসে ঢুকলেন।
সেখানে দেখা গেল, বিজ্ঞাপনদাতার চাহিদা অনুযায়ী অডিয়েন্সকে খুব নির্দিষ্ট করে রাখা হয়েছে।
তানভীর বললেনÑ‘এটি তো ভালো! যত নির্দিষ্ট, তত ভালো, তাই না?’
রাফিদ হেসে বললেনÑ‘সবসময় নয়।’
টার্গেটিং অতিরিক্ত সংকীর্ণ হলে কাঙ্ক্ষিত অডিয়েন্সের পরিমাণ এত কমে যেতে পারে যে ক্যাম্পেইনই ঠিকমতো ডেলিভারি করতে পারবে না। আবার টার্গেটিং খুব বিস্তৃত হলে বিজ্ঞাপন এমন মানুষের কাছেও যেতে পারে, যাদের কাছে সেটি তেমন প্রাসঙ্গিক নয়। অর্থাৎ এখানে একটি ভারসাম্য দরকার।
বিজ্ঞাপনের ফ্রিকোয়েন্সি
রাফিদ বললেনÑ‘বিজ্ঞাপনদাতার আসল প্রশ্ন হওয়া উচিতÑআমি কাকে পৌঁছাতে চাই? আর AdOps-এর প্রশ্নÑএই অডিয়েন্সকে বাস্তবে কতটা নির্ভরযোগ্যভাবে পাওয়া সম্ভব?’
কিন্তু এখানে আরেকটি বিষয় আছেÑফ্রিকোয়েন্সি (Frequency)।
একই মানুষকে বিজ্ঞাপনটি একবার দেখানো হলো। তারপর আবার। তারপর আবার।
রাফিদ বললেনÑ‘একজন ব্যবহারকারীকে বারবার বিজ্ঞাপন দেখালে সবসময় ফল ভালো হবে না। বরং অতিরিক্ত exposure বিরক্তি তৈরি করতে পারে।’
তাই অনেক ক্যাম্পেইনে ফ্রিকোয়েন্সি ক্যাপের মতো নিয়ন্ত্রণ ব্যবহার করা হয়। একজন ব্যবহারকারী নির্দিষ্ট সময়ে কতবার বিজ্ঞাপন দেখতে পারেন, তার সীমা নির্ধারণ করার জন্য।
তানভীর বললেনÑ‘তাহলে বিজ্ঞাপন দেখানোও একটা হিসাব?’
Ñ‘একদম। কাকে দেখাব, কতবার দেখাব, কোন পরিবেশে দেখাবÑসবই হিসাব।’
ঠিক তখন রাফিদের মেইলে নতুন একটি ব্রিফ এলো।
ক্যাম্পেইনটি আগামীকাল থেকে শুরু হবে।
তিনি বললেনÑএখন আমাদের দেখতে হবে, বিজ্ঞাপনদাতা যাদের কাছে পৌঁছাতে চাইছেন, বাস্তবে সেই অডিয়েন্সের জন্য পর্যাপ্ত ইনভেন্টরি আছে কি না।’
তানভীর বললেনÑ‘মানে টার্গেটিং ঠিক করলেই কাজ শেষ নয়?’
রাফিদ মুচকি হাসলেন।
ব্যবহারকারী যেন সোনার হরিণ
Ñ‘টার্গেটিং হলো দরজা ঠিক করা। কিন্তু দরজার ওপারে সত্যিই কাঙ্ক্ষিত মানুষ আছে কি না, সেটিও দেখতে হয়।’
কম্পিউটারের স্ক্রিনে নতুন ক্যাম্পেইনের সেটিংস খুলে গেল। একই ওয়েবসাইটে হাজার মানুষ ঢুকবে।
কেউ খেলাধুলার খবর পড়বে। কেউ অর্থনীতি। কেউ বিনোদন। আর প্রত্যেক বিজ্ঞাপনদাতার লক্ষ্য হবেÑতার জন্য প্রাসঙ্গিক সেই মানুষটিকে খুঁজে পাওয়া। ব্যবহারকারী হয়তো শুধু একটি ব্যানার দেখবেন।
কিন্তু সেই ব্যানারের পেছনে কাজ করবে অডিয়েন্স, কনটেক্সট, ডেটা, নিয়ম এবং সিদ্ধান্তের একটি অদৃশ্য জাল।
রাফিদ বললেনÑএবার আসল প্রশ্ন হলোÑবিজ্ঞাপনটা যার কাছে গেল, সে দেখল কি না, ক্লিক করল কি না আর শেষ পর্যন্ত কিছু করল কি না। সেটা জানতে হলে আমাদের আরেকটি মেশিন চালু করতে হবে।
তানভীর জিজ্ঞেস করলেনÑ‘কোন মেশিন?’
রাফিদ বললেনÑ‘ট্র্যাকিং আর মেজারমেন্ট।’
(চলবে)