ইথিওপিয়ার পথে
বিমানটি যখন ধীরে ধীরে আদ্দিস আবাবার বোলি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রানওয়ে স্পর্শ করল, তখনই জানলাম এই যাত্রা আমার জীবনের স্মরণীয় ভ্রমণগুলোর একটি হতে চলেছে। ইথিওপিয়া যেন এক বিশাল চিত্রপট, যার মধ্যে আছে প্রাচীন সভ্যতার ইতিহাস, বিভিন্ন ধর্মীয় স্থাপত্য, উচ্চভূমির মনোমুগ্ধকর প্রকৃতি এবং মানুষের সহজ-সরল জীবন। আফ্রিকার এই দেশটিকে বলা হয় মানবজাতির জন্মভূমি, তাই দেশটির প্রতিটি কোণ যেন ইতিহাসের নিঃশব্দ ফিসফাসে ভরা।
আদ্দিস আবাবা : আফ্রিকার রাজধানী
শহরের উন্মুক্ত দরজা
প্রথম দিনেই বেরিয়ে পড়লাম ইথিওপিয়ার রাজধানী আদ্দিস আবাবা ঘুরে দেখতে। শহরটি যেমন আধুনিক, তেমনই ঐতিহাসিক বৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ। আমার প্রথম গন্তব্য ছিল ন্যাশনাল মিউজিয়াম অব ইথিওপিয়া। এখানে সংরক্ষিত আছে লাখো বছরের পুরোনো মানব-অবশেষ ‘লুসি’, যাকে মানুষের প্রাচীনতম পূর্বপুরুষ হিসেবে ধরা হয়। কাচের বাক্সের ভেতরে লুসির সেই কঙ্কাল দেখে মনে হলো, যেন অতীত থেকে কেউ ফিরে এসে আমাদের সঙ্গে কথা বলছে।
বিকালের দিকে শহরের অন্যতম উঁচু স্থান এন্টোটো পাহাড়ে উঠলাম। উপরে দাঁড়িয়ে মনে হলো গোটা আদ্দিস আবাবা যেন হাতের তালুর মধ্যে। দূরের নীল পাহাড়, সবুজ প্রান্তর আর শহরের ব্যস্ত রাস্তা—সব মিলিয়ে এক দারুণ দৃশ্যপট। পাহাড়চূড়ার কাছে এন্টোটো মেরি গির্জা দাঁড়িয়ে আছে শত বছর ধরে। নীরব সেই গির্জায় প্রবেশ করতেই মনে হলো—এখানেই যেন পাহাড়, প্রকৃতি ও আধ্যাত্মিকতার মিলনস্থল।
আওয়াশ ন্যাশনাল পার্ক : সাভানার
রুক্ষ সৌন্দর্যে হারিয়ে যাওয়া
তৃতীয় দিনে রওনা দিলাম দক্ষিণ-পূর্বের দিকে, ইথিওপিয়ার অন্যতম প্রাচীন জাতীয় উদ্যান আওয়াশ ন্যাশনাল পার্কে। যতই শহর ছাড়লাম, ততই প্রকৃতি পাল্টাতে লাগল। সবুজ উচ্চভূমি বদলে গেল শুষ্ক তৃণভূমিতে—সাভানার বিস্তৃত রুক্ষ প্রান্তর। দূরে দেখা মিলল কিছু ওরেক্স, আর কাছেই ঘুরে বেড়াচ্ছে বাবুনদের দল।
পার্কের সবচেয়ে দৃষ্টিনন্দন স্থান আওয়াশ জলপ্রপাত, যেখানে নদী প্রচণ্ড বেগে নেমে আসে নিচের গিরি খাতে। দাঁড়িয়ে থাকতে ইচ্ছা করে না; জলধারা এমন তীব্র যে বাতাসেও ভিজে যায় শরীর। সেখানকার স্থানীয় গাইড আমাকে বললেন, এলাকায় মাঝে মাঝে হাতি আর চিতাবাঘও দেখা যায়। যদিও আমি দেখার সৌভাগ্য পাইনি, কিন্তু প্রকৃতির সেই মহিমা আমাকে বিমোহিত করেই রেখেছিল।
লালিবেলা : পাথরের বুকে খ্রিষ্টান সভ্যতার
অলৌকিক বিস্ময়
পরের গন্তব্য উত্তর ইথিওপিয়া—লালিবেলা, যাকে বলা হয় ‘আফ্রিকার জেরুজালেম’। ১২শ শতকে কেবল পাথর কাটতে কাটতে নির্মিত ১১টি মনোমুগ্ধকর গির্জা বিশ্বের অন্যতম স্থাপত্য বিস্ময়।
সবচেয়ে বিখ্যাত গির্জা বেত গিওরগিস (Saint George Church) দেখে আমার নিঃশ্বাস আটকে গিয়েছিল। পাথর কেটে কেটে পুরো গির্জাটি নেমে গেছে নিচের দিকে—উপরে থেকে দেখলে মনে হয় ক্রস আকৃতির স্থাপত্যটি যেন পৃথিবীর বুক থেকে উঠে এসেছে। সূর্যাস্তের আলো গির্জার দেয়ালে পড়তেই সেই দৃশ্য অবর্ণনীয় হয়ে ওঠে।
লালিবেলার পথে পথে ছড়িয়ে থাকা ধুলোমাখা পাহাড়ি পথ, গাধায় চড়ে চলা মানুষ আর স্থানীয়দের সরল জীবন যেন আমাকে নিয়ে গেল হাজার বছর পেছনে। গির্জার ভেতর পুরোহিতের হাতে ধরা সোনালি ক্রস আর প্রাচীন পাণ্ডুলিপি দেখে বুঝলাম, ইথিওপিয়ার খ্রিষ্টান ইতিহাস কতটা সমৃদ্ধ ও প্রাচীন।
বাহির দার : তানা হ্রদ ও নীল নদের পবিত্র অন্বেষণ
লালিবেলা ছেড়ে এবার রওনা দিলাম বাহির দার শহরের পথে। এই শহর শান্ত, স্নিগ্ধ আর প্রকৃতির সৌন্দর্যে ভরপুর। শহরের পাশেই ইথিওপিয়ার বৃহত্তম হ্রদ তানা লেক। এই হ্রদ থেকেই জন্ম নিয়েছে বিশ্বের বিখ্যাত নদী ব্লু নাইল বা নীল নদীর একটি প্রধান শাখা।
কাঠের নৌকায় চেপে চলে গেলাম হ্রদের মাঝখানে অবস্থিত একাধিক ছোট ছোট দ্বীপে। দ্বীপগুলোর উপর ছড়িয়ে আছে পুরোনো সব মঠ (Monastery), যেগুলোর দেয়ালে রঙিন চিত্রায়ণ—বাইবেলের গল্প ও ইথিওপিয়ার ইতিহাসের প্রতিচ্ছবি। শান্ত পরিবেশ, নৌকার মৃদু দোল আর নীল আকাশের নিচে তানা লেককে মনে হচ্ছিল এক গভীর প্রশান্তির জগৎ।
দুপুরে রওনা দিয়েছিলাম ব্লু নাইল ফলস বা স্থানীয়দের ভাষায় ‘টিস ইসাত’—অগ্নি ধোঁয়া। জলপ্রপাতটি এতই বিস্তৃত আর শক্তিশালী যে দূর থেকেই পানির গর্জন শোনা যায়। কাছে গেলে মনে হয়, প্রকৃতি যেন নিজের সমস্ত শক্তি একজায়গায় উন্মুক্ত করে দিয়েছে। এই জলপ্রপাতের চারপাশে রঙধনুর দেখা পাওয়া খুবই সাধারণ; আমিও সেই সৌভাগ্য পেলাম।
সিমিয়েন পর্বতমালা : আফ্রিকার ছাদের ওপরে
ভ্রমণের শেষ গন্তব্য ছিল ইউনেস্কো-স্বীকৃত বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান ‘সিমিয়েন মাউন্টেনস ন্যাশনাল পার্ক’। এখানে পৃথিবীর কয়েকটি বিরল প্রজাতির প্রাণী দেখা যায়, যেমন গেলাদা বাবুন, ইথিওপিয়ান উলফ ও ওয়ালিয়া আইবেক্স।
উঁচু-নিচু পাহাড় কেটে তৈরি হওয়া বিশাল গিরিখাত, ক্লিফ আর সবুজ তৃণভূমি দেখে মনে হচ্ছিল—আমি যেন পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু ছাদের ওপর দাঁড়িয়ে আছি। সেখানে গেলাদা বাবুনের বড় বড় দল ঘাস খেতে খেতে অবলীলায় মানুষের সামনে চলে আসে। তাদের লাল বুকের চিহ্ন দেখে মনে হয় আগুনের ফুলকি লেগে আছে।
পাহাড়চূড়ায় দাঁড়িয়ে যখন দূরের আফ্রিকান সূর্যাস্ত দেখলাম, মনে হলো পৃথিবীর সব ক্লান্তি এক মুহূর্তে মিলিয়ে গেল। প্রকৃতির এই অপার মহিমা সত্যিই ভাষায় প্রকাশ করা অসম্ভব।
ফিরতি পথের অনুভূতি
ছয় দিনের ভ্রমণ শেষ হয়ে এসেছে। ফেরার পথ ধরতেই আমার মনে হচ্ছিল—ইথিওপিয়া শুধু একটি দেশ নয়; বরং ইতিহাস, প্রকৃতি ও মানুষের মহত্ত্বের এক অনন্য মিলনস্থল। আদ্দিস আবাবার আধুনিকতা যেমন আমাকে ছুঁয়ে গেল, তেমনি লালিবেলার প্রাচীন গির্জা, তানা লেকের শান্ত জলরাশি, সাভানার কঠিন প্রকৃতি আর সিমিয়েন পর্বতমালার মহিমা আমাকে বারবার অবাক করেছে।
ইথিওপিয়া আমাকে শিখিয়েছে—একটি দেশকে জানার জন্য শুধু চোখ দিয়ে দেখা যথেষ্ট নয়; হৃদয় দিয়ে অনুভব করতে হয়। প্রতিটি মানুষ, প্রতিটি স্থান আর প্রতিটি নিঃশ্বাসে যেন এখানকার ইতিহাস বেঁচে আছে।
ফিরতি বিমানে বসে জানালার বাইরে তাকিয়ে মনে হলো, ইথিওপিয়া আমার হৃদয়ে চিরদিনের জন্য একটি রঙিন চিত্রফলকের মতো থেকে যাবে। আর হয়তো কোনো একদিন আবার ফিরে যাব সেই রহস্যময় আফ্রিকার ভূমিতে, যেখানে প্রতিটি পথই নতুন গল্প বলে।