আজ বিশ্ব বাবা দিবস। বাবার প্রতি ভালোবাসা ও সম্মান জানাতেই প্রতি বছর জুন মাসের তৃতীয় রোববার বিশ্বজুড়ে এই বিশেষ দিনটি পালন করা হয়।
বাবা সব সন্তানের জীবনেই সৃষ্টিকর্তার আশীর্বাদ। বাবা সন্তানের কাছে অমূল্য সম্পদ। পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ ও ভরসার আশ্রয়স্থল বাবা। তবে ব্যতিক্রমও আছে। কারো জন্য বাবা মানে দীর্ঘশ্বাসের কষ্ট! সংখ্যায় কম হলেও এমন জীবনও আছে। সেসব গল্প হয়তো বুকের গোপন প্রকোষ্ঠে গোপনেই জমা থাকে আজীবন।
মানুষ আসলে চাঁদের মতো। যার একটা দিক আড়ালে থাকে, কেউ তা দেখতে পায় না। কিংবা কাউকে দেখাতে চায় না। চাঁদের আলোকিত দিকটাই সবাই দেখে, অন্ধকার দিকটা কেউ দেখতে পায় না, কিংবা দেখাতে চায় না। মানুষও তেমন তার কষ্টগুলো যত্ন করে আড়ালে রাখতে চায়।
বাবা-মাকে নিয়ে সবারই কমবেশি স্মৃতি আছে। আমিও তার ব্যতিক্রম নই। বাবা হারানোর কষ্ট আছে, আছে দগদগে ক্ষত! তবুও আজ বিশেষ দিনটিতে আনন্দের স্মৃতিই শেয়ার করছি।
আমি তখন অনার্স প্রথম বর্ষের ছাত্রী। আমরা লক্ষ্মীবাজারে থাকি। আমাদের বাসার পাশেই ফুপুর বাসা। ফুপুদের সঙ্গে বাবার সম্পর্ক খুবই ভালো ছিল।
এক ঈদে আমাদের বাসার সবাই গ্রামে ঈদ করতে যান। বাসার গৃহপরিচারিকাও গেলেন। বাসায় শুধু আমি আর আমার বাবা। ছুটা গৃহকর্মী এসে ঘর মোছা আর কাপড় ধোয়ার কাজ করে দিয়ে যান। যে কদিন বাসায় সবাই না ফিরবে, আমরা দুজন ফুপুর বাসায় খাব। এমনকি ঈদও ফুপুদের সঙ্গে করা এবং তাদের সঙ্গে খাওয়ার কথা।
তবে ফুপুদের বাসায় প্রতিদিন খেতে আমার অস্বস্তি হতো। আমি যথেষ্ট বড় হয়েছি। আমি নিজে রান্না করে খাওয়ানোর চেষ্টা করতেই পারি। কারণ বাবা বাইরের খাবার খান না। গরমে আমার রান্না করতে কষ্ট হবে, তাই আমার বাবা নানা যুক্তি দেখিয়ে কিছুতেই মানলেন না। আমাকে আশ্বস্ত করলেন, আমরা যে কদিন ফুপুদের বাসায় খাব, আমার বাবা বাজার করে দেবেন। এরই মধ্যে বাজার করে দিয়েছেন বলেও জানালেন। তাদের বাসায় দুজন গৃহকর্মী রয়েছেন। আমাদের বাপ-বেটিকে রান্না করে খাওয়াতে কোনো সমস্যা হবে না, তাই আমি যেন বিব্রতবোধ না করি। এদিকে আমার অনাগ্রহের কথা শুনে ফুপুরা মনঃক্ষুণ্ণ হলেন। নিজের ফুপুকেও আপন ভাবতে পারছি না—এমন দু-চার কথা আমাকে শুনিয়ে দিলেন।
ঈদের আগের দিন হঠাৎ মনে হলো, আমি বাবার বড় মেয়ে। আমার উচিত ঈদের দিন বাবাকে কিছু রান্না করে খাওয়ানো। ঈদের আগের দিন আমার বাবাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘আমি একটু পায়েস রান্না করি?’ এ কথা শুনে তো আমার বাবা আঁতকে উঠলেন! তীব্র আপত্তি জানালেন—‘না, না, নাহ্! হাতটাত পুড়ে যাবে, মা। এই গরমে রান্নাঘরে গেলে তুমি ঘেমে যাবে। বসে টিভি দেখো, সুন্দর সিনেমা হচ্ছে। আর আমরা তো ইভার (তার বোন) বাসায় খাব।’ আমি তো নাছোড়বান্দা। বললাম, ‘আমি পারব, কোনো অসুবিধা হবে না।’ বারবার বুঝিয়ে অবশেষে সম্মতি নিলাম। ডিপ ফ্রিজ থেকে দুই লিটার প্যাকেট দুধ ভিজিয়ে রাখলাম। যেহেতু দুজনের জন্য রান্না এবং নষ্ট হওয়ারও আশঙ্কা আছে, তাই কমই নিলাম।
কিছুক্ষণ পর রান্না শুরু করলাম। জীবনের প্রথম রান্না। অন্যরকম অনুভূতি! আমার বাবা আমার চেয়েও অনেক বেশি উচ্ছ্বসিত- হাসু রান্না করছে! ’হাসু’ নামটি আমার বাবাই আদর করে রেখেছিলেন এবং শুধু তিনিই এই নামে ডাকতেন। আর আমার মেঝো মামা ডাকেন।
রান্না চলছে। একটু পরপর কৌতূহল ও উচ্ছ্বাস নিয়ে রান্নাঘরে উঁকি দিয়ে দেখে যান—কীভাবে, কী করছি। আর বলতে থাকেন, এই গরমের মধ্যে কেন কষ্ট করে রান্না করছি—ফ্যানের নিচে বসে একটু ঠাণ্ডা হয়ে যেতে।
একবার রান্নাঘরে ঢুকে বললেন, ‘আমি দেখছি। এহ্! আমার মেয়েটা ঘেমে গেছে!’ হাত ধরে নিয়ে গিয়ে ফ্যানের নিচে বসালেন। বললাম, ‘দুধ উতলে পড়ে যাবে।’ রান্নাঘরে গিয়ে তিনি নিজেই কিছুক্ষণ নাড়তে থাকলেন।
আবার উঠে গিয়ে বললাম, ‘আমি রান্না করি, তুমি ফেলে দেবে।’ তিনি রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। তবে একটু পরপর খবর নিচ্ছেন—‘মা, রান্না শেষ হতে আর কতক্ষণ লাগবে?’
একটা কথা না বললেই নয়। আমার বাবা খুবই আবেগপ্রবণ ও পরোপকারী ছিলেন। নিজের কী রইল না রইল, তা না ভেবেই দুহাতে দান করতেন। তার এই গুণটা আমাকে বরাবর মুগ্ধ করত, আজীবন করবে। এজন্য তিনি মানুষের অঢেল ভালোবাসা ও দোয়া পেয়েছেন। আবার শিশুদের মতো মনটা সরল ও নরম হওয়ায় সুবিধাভোগীরা নানাভাবে তার কাছ থেকে সুবিধা নিত।
আমি আমার মতো করে পায়েস রান্না শেষ করলাম। তখন ইন্টারনেট দেখে রান্নার এত প্রচলন ছিল না। রান্না তো হলো, কিন্তু চাল ফুটল না। পায়েস খেতে পুটুস-পুটুস লাগল। কারণ আমি দুধের মধ্যে আগে চাল দিয়ে ফুটিয়ে নিইনি; চাল ফোটার আগেই চিনি দিয়ে দিই। তাই চালটা আর ফোটে না, খেতে গিয়ে টুসটুস করছিল।
কিন্তু সেই পায়েস আমার বাবা এত যত্ন নিয়ে তৃপ্তি করে খেয়েছিলেন যে আমি মহা বিস্ময়ে শুধু দুচোখ ভরে তাকিয়ে দেখছিলাম। পুটুস-পুটুস করায় সেই পায়েস আমি খাইনি। সবটুকু পায়েস বাবা একাই খেয়েছিলেন। খেতে খেতে বারবার বলেছিলেন, ‘মা, খুব ভালো হয়েছে! খুব মজা হয়েছে!’
আমি নিয়মিত রান্না করি না। খুব ভালো রান্না করতে পারিও না। তবে পায়েসটা বোধহয় এখন ভালোই রান্না করতে পারি। বাবা নেই পাঁচ বছর হয়ে গেল! কারণে-অকারণে, সুখে-দুঃখে, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি, বঞ্চনা ও হতাশায় বাবাকে মনে পড়ে। যতবার পায়েস রান্না করি, ততবার বাবাকে মনে পড়ে। পায়েস রান্না করতে বেশ সময় লাগে। রান্না করতে গিয়ে প্রতিবার চেতন ও অবচেতন মনে সেই দিনটিতে হারিয়ে যাই। প্রতিবার স্মৃতিরা জীবন্ত হয়ে এসে চোখ ভিজিয়ে দিয়ে যায়। নিভৃতে কাঁদায়!
জীবনের সব গল্প লেখা যায় না, লেখা হয় না। লিখলে হয়তো অগণিত মহাকাব্য রচিত হতো। জীবনের গতিও হয়তো বদলে যেতে পারত। আর যে গল্প কাউকে বলা যায় না, বলা হয় না—তার নামই কষ্ট!
যেখানেই থাকুন, পৃথিবীর সব বাবা ভালো থাকুন। আল্লাহ বাবাকে জান্নাতবাসী করুন।