টুনুরা পাঁচ ভাইবোন। চার বোনের পর একমাত্র ভাই টুনুর জন্ম। আকাশের চাঁদ যেন জমিনে। বাড়িতে আনন্দের বন্যা। তখন টুনুর বয়স দুই কি আড়াই বছর। একদিন রাতে টুনুর বাবা বাড়ি ফিরলেন মিষ্টি নিয়ে। টুনু গভীর ঘুমে। টুনুকে ঘুম থেকে জাগাবেন না, আবার মিষ্টি খাওয়াতে না পেরে শান্তি পাচ্ছিলেন না। বাবা প্যাকেট থেকে একটি মিষ্টি নিয়ে ঘুমন্ত টুনুর মুখে দিলেন, টুনু টপাটপ খেয়ে ফেলল একটি-দুটি করে তিনটি...। সে রাতের এ দৃশ্য সবাইকে আনন্দিত করেছিল।
ফনিক্স সাইকেলে বসিয়ে ছোট্ট টুনুকে নিয়ে বাবা বাজার করতেন, বাজার শেষে মিষ্টির দোকানে যেতেন। টুনুর পছন্দের সব ধরনের মিষ্টি খাওয়াতেন। ছেলের সব বায়না ও আবদার পূরণ করতেন। টুনুকে কোলে নিয়ে ঘুরতেন আর কপালে চুমু দিতেন...!
বাবা যেদিন বেতন পেতেন, সেদিন ছোট্ট টুনুর হাতে নতুন দুই টাকার পাঁচটি নোট দিতেন। সে নোট নিয়ে টুনুর সে কী আনন্দ! কখনো বালিশের নিচে, কখনো মায়ের কাছে জমা রাখত। আর একটু পর পর চেক করে দেখত টাকাটা ঠিক আছে কি না।
টুনু স্কুলে ভর্তি হবে। টুনুকে কাঁধে করে বাবা নিয়ে গেলেন টেইলার্সের দোকানে। সাদা শার্ট আর খাকি হাফপ্যান্টের সমন্বয়ে স্কুল ড্রেস বানাতে হবে। টেইলরকে কয়েকবার বুঝিয়ে দিলেন কীভাবে ছেলের মাপ নেবেন। যথারীতি মাপ নেওয়া শেষ। তারপর খেলনা গাড়ির দোকান থেকে টুনুকে একটা গাড়ি কিনে দিয়ে বাড়ি ফিরলেন।
টুনু নিয়মিত স্কুলে যেতে থাকল। স্কুলের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় দৌড়ে টুনু বরাবর প্রথম হয়। এ খবর তার বাবার অজানা নয়। তবে অফিসের ব্যস্ততার জন্য তিনি সরাসরি উপস্থিত থেকে কোনো বছরই ছেলের খেলা দেখতে পারেন না। একবার তিনি সারপ্রাইজ দিলেন। টুনু ৪০০ মিটার দৌড় দেওয়ার জন্য সব প্রতিযোগীর সঙ্গে মাঠে নামল। বাঁশি ফুঁ দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হলো—দৌড়...। লাস্ট লাইনের ফিতা ছোঁয়ার সঙ্গে সঙ্গেই টুনুর বাবা দৌড়ে মাঠে এসে হ্যান্ডশেক করলেন। এরপর কোলে তুলে নিয়ে ছেলের কপালে চুমু দিতে থাকলেন...। এসব মধুর স্মৃতি এখন সময়ে-অসময়ে টুনুর চোখ ঝাপসা করে দেয়—ভাবায়, কখনো কাঁদায়! যদিও ছেলেরা সহজে বা অল্প ব্যথায় কাঁদে না।
টুনুর যেকোনো সাফল্য (যেমন কলেজে চান্স পাওয়া, বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি, সরকারি চাকরি) বাবা গর্ব করে তার আত্মীয়স্বজন, বন্ধু, প্রতিবেশীদের জানাতে ভালোবাসতেন।
জীবদ্দশায় প্রায়ই একটি কথা টুনুর বাবা তার বন্ধুদের বলতেন, ‘আমার ছেলে অতিমানবিক, অতিমাত্রায় আবেগি এবং মানুষ চেনে না।’ টুনু হেসে উড়িয়ে দিত। কখনোবা বাবার পর্যবেক্ষণ সঠিক নয় ‘লোক চেনার ক্ষেত্রে’—এ কথাও বলত। কিন্তু বাবাই আসলে সঠিক; শতভাগ সঠিক। বিভিন্নজন সম্পর্কে বাবার যে পর্যবেক্ষণ, তার অবর্তমানে আজ অনেক বেশিই তা মিলে যায়।
বাবাই টুনুর সেরা বন্ধু...
বাবাই টুনুর সেরা বন্ধু এবং শ্রেষ্ঠ রোল মডেল। তিনি একজন আদর্শ বাবা, কোচ, পরামর্শদাতা, আর্মি অফিসার, পথপ্রদর্শক এবং সর্বোপরি আকাশের মতো উদার একজন মানুষ।
টুনুর অস্তিত্ব, স্বপ্ন—সবকিছুর মূলে রয়েছেন একজন মানুষ; তিনি তার বাবা।
মায়ের চেয়ে বাবার সঙ্গেই সখ্য বেশি ছিল টুনুর। যত আবদার-অভিযোগ আর রাগ-অনুরাগ প্রকাশের জন্য টুনু তার বাবাকেই বেছে নিত। শত ব্যস্ততায়ও টুনুর সব কথা বাবা শুনতেন আর ম্যাজিকের মতো সব সমস্যার সমাধান করে দিতেন। সেই শিশুকাল থেকেই টুনুর কোনো আবদারে বাবা ‘না’ করেননি। শত কষ্ট হলেও টুনুর যেকোনো বায়না বা ইচ্ছা তিনি পূরণ করতেন। আসলে বাবারা এমনই!
বাবা টুনুর ভাইবোনের সেরা বন্ধু হয়ে কোমলতার পরশ ছড়িয়ে দিতেন। টুনু বাবাকে ভয় পেত না। কারণ বাবাই ছিল তার সব সমস্যা, মনের অনুভূতি প্রকাশের সেরা ও নিরাপদ আশ্রয়স্থল।
টুনুর বাবা সেনাবাহিনীতে চাকরি করতেন। কুয়েত মিশন থেকে প্রথম ছুটিতে দেশে এলেন। টুনুর জন্য আনলেন বাইনোকুলার, এরোপ্লেন আর খেলনা রাইফেল। সে কী আনন্দ টুনুর!
টুনু আর তার বাবা একসঙ্গে নাশতা করতেন; সেটা বাসায় হোক অথবা রেস্তোরাঁয়। তাদের নাশতার টেবিলে গল্প শেষ হতে চাইত না। বেশিরভাগ গল্পেই বাবার সঙ্গে টুনুর ছোটবেলায় ঘটে যাওয়া ঘটনাই থাকত।
বাবার আদর্শ
টুনুর বাবা যখন অসুস্থ হয়ে সিএমএইচে ভর্তি থাকতেন, তখন তিনি পুরোনো দিনের স্মৃতিচারণ করতেন, রাজনীতির গল্প করতেন, দেশের স্বাধীনতা অর্জনের গল্প শোনাতেন। টুনুর বাবা মানুষকে খুব ভালোবাসতেন, ভালোবাসার সুকোমল অনুভূতির কথা বলতেন। বাবা কখনোই কারো বিরুদ্ধে কিছু বলা একদমই পছন্দ করতেন না। তিনি ছোট-বড় সবাইকে সম্মান করতেন, সদা হাস্যোজ্বল থাকতেন; মানুষের বিপদে আন্তরিকভাবে পাশে থাকতেন এবং কীভাবে মানুষকে আপন করে নিতে হয়, সেটাই ছেলেকে শেখাতেন।
টুনুর জীবনের আদর্শ তার বাবা। বাবা সারা জীবন মানুষের উপকার করেছেন। তিনি নিজেকে নিয়ে যতটুকু ভাবতেন তার চেয়ে বেশি ভাবতেন দেশ ও সমাজ নিয়ে। তার জীবনের আদর্শ ছিল মানুষের উপকার করা। খুব সাধারণভাবে চলাফেরা করা তার পছন্দ ছিল। বাবার অবদান, ত্যাগ, স্নেহ ও ভালোবাসা সব তুলনার ঊর্ধ্বে।
পৃথিবীর অন্য আট-দশ জন বাবা থেকে টুনুর বাবা একটু আলাদা। কারণ বাবার চিন্তাচেতনা, মন-মানসিকতা সবকিছু ভিন্ন রকম। পৃথিবীতে অধিকাংশ মানুষকে দেখেছি নিজের স্বার্থসিদ্ধির জন্য মানুষের উপকার করতে। কিন্তু টুনুর বাবাকে সবসময় দেখেছি নিঃস্বার্থভাবে মানুষের উপকার করতে। প্রয়োজনে নিজের ক্ষতি করে হলেও তিনি মানুষকে সাহায্য-সহযোগিতা করতেন। তার সঞ্চয় ছিল শুধু মানুষের ভালোবাসা। ভালোবাসার সম্ভবত একটি তরঙ্গ আছে। বাবা যেমন মানুষকে ভালোবাসতেন, তারাও তেমনি ভালোবাসতেন তাকে। ভালোবাসার সেই অদৃশ্য তরঙ্গ সবাইকে স্পর্শ করত।
টুনুর বাবার প্রস্থান...
আজন্ম লোভ ও লালসার ঊর্ধ্বে থেকে টুনুর বাবা গণমানুষের জন্য কাজ করে গেছেন। সেবার দ্বারা ও মহৎ কর্মের মাধ্যমে আলোর প্রদীপ হাতে নিয়ে যে মানুষটি অবদান রেখেছিলেন, সে মানুষটি আজ ক্যান্টনমেন্টে চিরনিদ্রায় শায়িত। ২০২১ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি এ পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন টুনুর বাবা।
‘রাব্বির হামহুমা কামা রাব্বায়ানি সাগিরা।’
বাবার স্মৃতি
টুনুর তার বাবাকে খুব মনে পড়ে। যখন কোনো বাবা তার ছেলেকে বুকে জড়িয়ে আদর করেন, তা দেখলে তার বাবার স্মৃতি চোখে ভেসে ওঠে। খেতে বসলে টুনুর বাবাকে অনেক মনে পড়ে। খাওয়ার টেবিলে নিজের থালার খাবারগুলো টুনুকে তুলে দিয়ে তিনি বলতেন, ‘বাবা, তুমি বেশি করে খাও।’ পড়তে বসলে টুনুর বাবাকে খুব মনে পড়ে; তিনি বলতেন, ‘টুনু বাবা, মনোযোগ দিয়ে পড়ো।’
আনন্দ কিংবা বিপদে টুনু তার বাবার মতো বন্ধু পায় না খুঁজে। কেউ উপদেশ দেয় না তার বাবার মতো করে—‘ভয় নেই আছি পাশে, সামনে এগিয়ে চলো।’
বাবার কথা মনে পড়লেই টুনুর দুচোখ ভিজে যায়। এলোমেলো অজস্র স্মৃতি মনের কোণে ভিড় করে। টুনুর বাবা চলে গেছেন পাঁচ বছর, এর প্রতিদিনই সে বাবার অপরিসীম শূন্যতা অনুভব করেছে। বাবার ছায়া যে কী বিশাল, সেটি বোধ হয় কেবল যারা হারায় তারাই বোঝে...
জীবনের চলার পথে টুনু যখন বারবার হেরে যায়, হোঁচট খায়, তখন টুনুর বাবার কথা খুব মনে পড়ে। কোনোদিন প্রকাশ করতে পারেনি; অনেক মিস করছে বাবাকে...!
টুনুর আজও মনে পড়ে বাবার সঙ্গে তার শেষ কথাগুলো, মোবাইলে...! ইথারে ভেসে আসে, বারবার কানে বাজে—‘আমার ছেলে অতিমানবিক, অতিমাত্রায় আবেগি এবং মানুষ চেনে না।’
টুনুর বাবা আর নেই—এটাই নির্মম সত্য। বাবার শূন্যতা কিছুতেই পূরণ হওয়ার নয়। তবে আছে বাবার আদর্শ, অনেক স্মৃতি, অনেক কথা, যা কখনো ভোলা যাবে না। বাবার দেখানো ইতিবাচক পথ ধরেই টুনু চলবে। মহান আল্লাহ তায়ালা যেন তার বাবার অসম্পূর্ণ কাজগুলো তার মাধ্যমেই পূর্ণতা দান করেন।
লেখক : এমফিল শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়