রুবাইয়া জামান মাইশা। ঢাকায় বেড়ে ওঠা এই নারী বর্তমানে ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটিতে তৃতীয় বর্ষে পড়াশোনা করছেন। ২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে তিনি ভীষণভাবে সক্রিয় ছিলেন। তাকে নিয়ে লিখেছেন মোহনা জাহ্নবী
‘জুলাই মাসজুড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের নিউজ ও পোস্ট দেখছিলাম। কোটা সংস্কার আন্দোলনে অংশগ্রহণ করতে গিয়ে শিক্ষার্থীরা অস্বাভাবিকভাবে অমানবিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছিল। চারদিকে কেমন যেন দমবন্ধকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল। আমি একদম শুরুর দিক থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আন্দোলন নিয়ে সক্রিয় ছিলাম। বিশ্বস্ত আন্দোলন-সংক্রান্ত তথ্য শেয়ার করা, কেউ বিপদে পড়লে যারা সহযোগিতা করতে পারে, তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেওয়া—এ রকম বেশকিছু কাজ করছিলাম। কিন্তু কেন জানি মনে শান্তি অনুভব করছিলাম না। এরই মধ্যে ১৭ জুলাই জাহাঙ্গীরনগরসহ বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপর অত্যাচারের ভিডিওগুলো দেখে প্রচুর কান্না পাচ্ছিল, নিজেকে আর ধরে রাখতে পারছিলাম না। ঠিক সে সময় মনে একরকম স্পৃহা চলে এলো, মনে হলো এটাই সময় মাঠে নামার। মাথায় শুধু একটা কথাই ঘুরছিল—Do or die. এরপর ১৮ তারিখ থেকে মাঠে নেমে পড়লাম।’
মাইশার আন্দোলনে অংশগ্রহণের শুরুর গল্পটা এ রকমই। তিনি বলেন, ‘এই পুরো আন্দোলনে আমার অনুপ্রেরণা ছিল ঢাকার সব প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় ও তাদের শিক্ষার্থীরা। আসলে কোটা সংস্কার বা কোটা নিয়ে যেসব দাবিদাওয়া ছিল, সেগুলো প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে খুব একটা রেলিভেন্ট ছিল না। এর পরও সেসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা কেবল তাদের মতো অন্যান্য শিক্ষার্থীদের ওপর অন্যায় হচ্ছে দেখে মাঠে নামেন, পাশে দাঁড়ান, অনেকে আহত হন, আবার কেউ কেউ নিহতও হন। এই যে মানুষের প্রতি মানুষের মমতা, ভ্রাতৃত্ববোধ—এটাই ছিল আমার অনুপ্রেরণা।’
আন্দোলনের সময়কার স্মরণীয় ঘটনা শেয়ার করতে গিয়ে মাইশা বলেন, ‘জুলাই আন্দোলনের কথা মনে পড়লে অনেকগুলো ঘটনার কথাই মনে পড়ে যায়। তবে একটা ঘটনা আমার মনে দাগ কেটেছিল। ১৮ জুলাই যখন আমার নিজ ক্যাম্পাস ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটিতে জড়ো হয়েছিলাম, তখন একটি ফোনকলের মাধ্যমে আমরা জানতে পারি, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে পুলিশ হামলা চালাচ্ছে। রামপুরাসহ আশপাশের বেশিরভাগ রাস্তাগুলোয় বহু পুলিশ সদস্য অবস্থান করছিলেন। এ অবস্থায় আমরা যদি রাস্তায় বের হই, পুলিশ আমাদের ওপর হামলা চালাতে পারে! তবুও আমরা নিজেদের জীবনের তোয়াক্কা না করে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইবোনদের সহযোগিতা করতে দলবদ্ধভাবে এগিয়ে যাই। এই যে আন্দোলনের সময় আমরা নিজের জীবনের পরোয়া না করে একটি লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছিলাম, এটাই আমার কাছে সবচেয়ে ইতিবাচক ঘটনা বলে মনে হয়। সেদিন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে একত্রিত হওয়ার পর আমরা চারপাশ থেকে টিয়ারশেল খাচ্ছিলাম। চতুর্থ টিয়ারশেল খেয়ে যখন চোখেমুখে অন্ধকার দেখছিলাম, তখন জীবন বাঁচাতে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে আশ্রয় গ্রহণ করি। প্রায় অনেকক্ষণ কিছু দেখতে পাচ্ছিলাম না। যখন আবার হালকা দেখতে পাচ্ছিলাম, তখন দেখলাম একটি ছেলের নিস্তেজ দেহ নিচে পড়া, যার শরীরজুড়ে প্রচুর রাবার বুলেটের চিহ্ন। ছেলেটির আশপাশে বেশ কয়েকজন মিলে তার নিঃশ্বাস আছে কি না দেখছিল। কয়েকজন চিৎকার করে কাঁদছিল। নিজের চোখের সামনে কাউকে খুন হতে দেখলাম। এরপর সেই ছেলেটিকে ইমপেরিয়াল কলেজের শহীদ শিক্ষার্থী হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল। এখনো মাঝেমধ্যে চোখ বন্ধ করলে গুলির শব্দ, টিয়ারশেলের ঝাঁঝ ও মানুষের চিৎকার আর আহাজারি কানে বাজে।’
আন্দোলনে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে পরিবারের সমর্থন প্রসঙ্গে মাইশা বলেন, ‘পরিবারের সমর্থন না থাকলে আন্দোলনে অংশগ্রহণ করাটা খুবই কঠিন হয়ে যেত। তবে অন্য পাঁচটা বাবা-মায়ের মতোই আমার মাও আশপাশের খবরগুলো দেখে অসম্ভব ভয় পেত। আমার বাসা আমার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কিছুটা দূরে ছিল, তাই আন্দোলনে অংশগ্রহণ করতে এতটুকু রাস্তা একা যাওয়াটা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। তবে মা কখনো তার সিদ্ধান্ত আমার ওপর চাপিয়ে দেননি, আমার সিদ্ধান্তকে সম্মান করেছেন এবং আমার জন্য দোয়া করেছেন। তার দোয়াই আমাকে বিপদের মুহূর্তে সাহস জুগিয়েছে।’
মাইশা মনে করেন, মানুষ এখন অন্ধ রাজনৈতিক মতাদর্শ থেকে বের হয়ে এসে ভুলকে ভুল এবং সঠিককে সঠিক বলতে শিখেছে। মানুষের মধ্যে একে অপরকে সহযোগিতা করার মানসিকতা ও একত্ববোধ বেড়েছে। এখন আর মানুষ বিপদ দেখলে পিছিয়ে পড়েন না। এই আন্দোলনের মাধ্যমে মানুষ অন্ধ রাজনৈতিক বিশ্বাস থেকে সরে এসে সঠিক রাজনৈতিক ইতিহাস সম্পর্কে রিসার্চ করে জানার চেষ্টা করছে।
তিনি আরো বলেন, ‘নতুন বাংলাদেশের মানুষ এখন সাধারণ মানুষের অধিকার, সাধারণ মানুষ কী চায়, এ বিষয়টি নিয়ে কাজ করছে। এটি আমার ভালো লেগেছে। তবে আইনশৃঙ্খলার অবক্ষয় দুঃখজনক।’
অন্য সব আন্দোলনকারীর মতো মাইশাও নতুন বাংলাদেশ নিয়ে স্বপ্ন দেখেন। নতুন বাংলাদেশের প্রতি তার আশা-আকাঙ্ক্ষার কথা জানাতে গিয়ে বলেন, ‘সর্বপ্রথম মানুষের জীবনের নিরাপত্তা চাই। আমরা আমাদের দেশে যেন স্বাধীনভাবে বাঁচতে পারি, সে অধিকার চাই। আর কোনো নারীকে যেন লাঞ্ছিত না হতে হয়। ধর্ষণের মতো নিকৃষ্ট কাজের শাস্তি যেন মৃত্যুদণ্ড হয়। দেশে যেন আইনের যথাযথ প্রয়োগ শুরু হয় এবং সাধারণ মানুষ ন্যায়বিচার পায়। সর্বোপরি মানুষ যেন সুখে-শান্তিতে জীবন কাটাতে পারে।’