অনন্যা বসাক। ছোটবেলা থেকেই স্বপ্ন দেখতেন ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তা হওয়ার। উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর পছন্দের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে না পেরে সেই স্বপ্ন আরো দৃঢ় হতে থাকে। ৪৫তম বিসিএস পরীক্ষায় কর ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন এই নারী।
বিসিএস ক্যাডার হওয়ায় অনুভূতি?
খুবই খুশি হয়েছিলাম রেজাল্ট জানার পরে। সৃষ্টিকর্তার প্রতি অশেষ কৃতজ্ঞতা যে তিনি আমার পরিশ্রমের যথার্থ মূল্য দিয়েছেন। সর্বোপরি প্রজাতন্ত্রের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করার সুযোগ পেয়ে খুবই আনন্দিত। পরিশ্রম সার্থক হয়েছে, স্বপ্ন সত্যি হয়েছে।
আপনার শৈশব ও শিক্ষাজীবন?
আমার জন্ম ও বেড়ে ওঠা ঠাকুরগাঁও জেলায়। এসএসসি পাস করেছি ঠাকুরগাঁও সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয় থেকে এবং এইচএসসি পাস করেছি ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজ থেকে। এরপর হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইলেকট্রনিকস অ্যান্ড কমিউনিকেশনে স্নাতক সম্পন্ন করি। মা, বাবা এবং আমার একমাত্র ছোট ভাইকে নিয়ে আমার পরিবার।
জীবনে চলার পথে এমন কোনো বাধা আছে, যা অনুপ্রেরণা জোগায়?
উচ্চ মাধ্যমিকের পর আমি পছন্দের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পাইনি। ভর্তি পরীক্ষায় খুব ভালো করতে পারিনি, যা আমার জীবনের একটি আফসোস ছিল। কিন্তু তখনই আমি দৃঢ় প্রত্যয় নিয়েছিলাম, চাকরির পরীক্ষায় আমাকে ভালো করতেই হবে। এটা প্রতিনিয়ত আমাকে অনুপ্রেরণা দিয়েছে।
নারী হিসেবে কী কী চ্যালেঞ্জ ছিল?
আমাদের সমাজে নারীদের জন্য শিক্ষা থেকে কর্মক্ষেত্র সবকিছুই চ্যালেঞ্জিং। তবে আমি নিজে আসলে নারী হিসেবে কোনো চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হইনি। আমার পরিবার ও আমার হাজব্যান্ড খুবই সাপোর্টিভ ছিল। তারা এই পুরো জার্নিতে সবসময় আমাকে অনুপ্রেরণা দিয়ে আমার পাশে ছিলেন। আমার এই সাফল্যের পেছনে তাদের ভূমিকা অনস্বীকার্য।
বিসিএস ক্যাডার হতে চায়, তাদের জন্য কী পরামর্শ দিতে চান?
নিজের লক্ষ্যে অটুট থাকতে হবে। বিসিএস একটা দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। এই লম্বা পথচলায় অনেক বাধা আসবে, অনেক প্রতিবন্ধকতা আসতে পারে; তবে কোনো কিছুর সামনেই হার মানা যাবে না। সবকিছুর পরেও নিজের স্বপ্নকে লালন করে সেটাকে বাস্তবায়িত করার জন্য পরিশ্রম করে যেতে হবে। পরিশ্রম করার বিকল্প কোনো কিছুই হতে পারে না।
বিসিএস ক্যাডার হওয়ারই কি স্বপ্ন ছিল?
হ্যাঁ। যেহেতু আমার দেশের বাইরে যাওয়ার কোনো পরিকল্পনা নেই, তাই আমার স্বপ্ন ছিল দেশে থাকলে আমি ক্যাডার সার্ভিসেই যোগদান করব। কারণ সামাজিক মর্যাদার দিক থেকে ক্যাডার সার্ভিসকে সবাই ওপরের দিকে রাখে।
প্রকৌশলী থেকে বিসিএস ক্যাডার যাত্রাটা কেমন ছিল?
প্রকৌশলী হওয়ার স্বপ্ন নিয়েই আমি হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের তড়িৎ প্রকৌশল বিভাগে ভর্তি হই। কিন্তু পরে আমার মনে হয়, সিভিল সার্ভিসে গেলে আমি দেশ ও জনগণের সেবায় আরো সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণের সুযোগ পাব। এছাড়া বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির যুগে আমি আমার ইঞ্জিনিয়ারিং জ্ঞান কাজে লাগিয়ে সিভিল সার্ভিসকে আরো দক্ষ, আধুনিক ও জনবান্ধব করে গড়ে তুলতে চাই।
একাডেমিক পড়ালেখায় কতটা ফোকাস করা উচিত?
একাডেমিক রেজাল্ট ভালো করা অনেক গুরুত্বপূর্ণ। এটি ভাইভাতে একটি পজিটিভ ইমপ্রেশন তৈরি করে। কারো একাডেমিক রেজাল্ট ভালো হলে এটি বার্তা দেয় যে, সে প্রতিটি ধাপেই অধ্যবসায়ী ও দায়িত্বশীল ছিল, অর্থাৎ ভবিষ্যৎ কর্মক্ষেত্রেও সে ভালো করবে। এছাড়া বিসিএসের প্রিলি ও লিখিত পরীক্ষায়ও একাডেমিক জ্ঞান কাজে লাগতে পারে। তাই অবশ্যই একাডেমিক পড়ালেখায় একটা মিনিমাম ফোকাস করা উচিত।
প্রস্তুতির সময় কেমন ছিল?
স্নাতক শেষ করার পর আমি ঠাকুরগাঁওয়ে নিজের বাসায় থেকেই পুরো প্রস্তুতি নিয়েছি। নিয়মিত পড়ালেখা করেছি, কারণ একবার পড়ার গতি হারিয়ে গেলে আবার মনোযোগ ফিরিয়ে আনা অনেক কষ্টসাধ্য। প্রস্তুতির সময় বিষয়গুলো নিজে পড়ে বোঝার চেষ্টা করতাম এবং নোট করে পড়তাম। অনেক জানতে হবে, অনেক শিখতে হবে, অনেক বুঝতে হবে—আমি এটিই বিশ্বাস করি। বাজারের প্রচলিত বইয়ের বাইরেও পত্রিকা ও ইন্টারনেট থেকেও অনেক তথ্য নিয়ে নোট করতাম। খাতায় গৎবাঁধা কিছু না লিখে একটু সুন্দরভাবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছি। এক্ষেত্রে নীল কালি, চিত্র, ছক—এগুলো ব্যবহার করেছি। ন্যূনতম কত ঘণ্টা পড়তে হবে, এটা ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হতে পারে। একজনের ঠিক তত সময় পড়া উচিত যতক্ষণ পর্যন্ত না পড়া পুরোপুরিভাবে না হয়। এজন্য কেউ পাঁচ ঘণ্টাও পড়তে পারে, আবার কারো ১০ ঘণ্টাও লাগতে পারে। আমি প্রতিদিনের পড়ার টার্গেট নির্ধারণ করে নিতাম এবং যতক্ষণ পর্যন্ত টার্গেট পূরণ না হয় ততক্ষণ পর্যন্ত পড়তাম।
যারা বিসিএস দিতে চান তাদের প্রতি পরামর্শ
প্রথমেই লক্ষ্য স্থির করতে হবে। বিসিএস অনেক লম্বা একটা জার্নি। এর জন্য মানসিকভাবে নিজেকে প্রস্তুত করতে হবে। নিয়মিত পড়াশোনা করা খুবই জরুরি। অগোছালো পড়ালেখা তেমন একটা কাজে আসে না। প্রচুর মডেল টেস্ট দিতে হবে, কারণ মডেল টেস্ট প্রস্তুতিকে শানিত করতে খুব সহায়তা করে। সর্বোপরি সৃষ্টিকর্তার ওপর বিশ্বাস রেখে নিয়মিত পরিশ্রম করে গেলে সাফল্য আসবেই। তবে বিসিএসকেই বর্তমান সময়ের একমাত্র লক্ষ্য না বানিয়ে সব চাকরির পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করা জরুরি। বিসিএসে সাফল্যের হার খুবই কম। সব চাকরির পরীক্ষার প্রস্তুতিই প্রায় কাছাকাছি। তাই বিসিএসের প্রস্তুতির পাশাপাশি অন্য চাকরির জন্যও চেষ্টা করা উচিত।
আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা?
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা জুড়ে থাকবে কীভাবে দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখতে পারি। এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন স্কিল ডেভেলপ করে রাজস্ব আদায়ের মাধ্যমে আমি দেশের অর্থনীতির উন্নয়নে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে চাই। প্রজাতন্ত্রের সেবায় নিজেকে পুরোপুরি নিয়োজিত করতে পারাই হবে আমার পূর্ণাঙ্গ সফলতা।